মুহাম্মদ নিজাম উদ্দিন, চট্টগ্রাম অফিস
চট্টগ্রামে যে পরিমাণ পশু কোরবানি হয়েছে তার অর্ধেক চামড়াও সংগ্রহ হয়নি। অনেক কোরবানিদাতাই চামড়া বিক্রি করতে পারেনি। বিক্রি করতে না পেরে কেউ কেউ কাঁচা চামড়া খালে ও মাটির নিচে পুঁতে ফেলেছেন। আর যারা বিক্রি করেছেন তারা প্রতি চামড়া থেকে ৫০/ ১০০ টাকার বেশি কেউ পায়নি। মূলত মধ্যস্বত্বভোগী ও আড়তদার ব্যবসায়ীদের কারসাজিতে কোরবানিদাতারা চামড়ার মূল্য পায়নি। তারাই চামড়ার টাকা ভাগভাটোয়ারা করে নিয়েছে। প্রাণিসম্পদ কার্যালয় জানায়, চট্টগ্রাম জেলায় ৭ লাখ ৪২ হাজার পশু কোরবানি হয়েছে। এরমধ্যে আড়তদার ও ফড়িয়ারা ৩ লাখ দেড় হাজার কাঁচা চামড়া সংগ্রহ করেছে। বাকি চামড়া কোথায় গেল তার হিসাব পাওয়া যাচ্ছে না।
কাঁচা চামড়ার মূল্যনির্ধারণ করে দেওয়া হলেও তা মানা হয়নি। বর্গফুট হিসাবে কোনো চামড়া বিক্রি হয়নি। চামড়া যত বড়ই হোক গড় মূল্যে বিক্রি হয়েছে। গ্রামাঞ্চলে কাঁচা চামড়া কেনার কোনো লোক দেখা যায়নি। তাই চামড়া বিক্রি করতে না পারায় অনেকেই গর্ত করে মাটির নিচে পুঁতে ফেলেছে ও খালে ফেলে দিয়েছে। এতে হতদরিদ্র গরিব মানুষ চামড়ার টাকা থেকে বঞ্চিত হয়েছে। বঞ্চিত হয়েছে ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান। ফলে মৌসুমী চামড়া ব্যবসায়ী ও আড়তদারদের কারসাজিতে গরিব মানুষ তাদের হকের টাকা থেকে বঞ্চিত হয়েছে।
বাঁশখালী পুকুরিয়া এলাকার বাসিন্দা দিদারুল হক জানান, তাদের এলাকায় চামড়ার কেনার কোনো লোক দেখা যায়নি। স্থানীয় একজন বিক্রি করতে পারলে টাকা দেবে বলে সব চামড়া নিয়ে গেছে। অনেকেই বিক্রি না হওয়ায় মাটির নিচে পুঁতে ফেলেছে বলে জানান তিনি। সাতকানিয়া উপজেলার আমিলাইশ এলাকার বাসিন্দা নুরুল কবির বলেন, ১ লাখ ১০ হাজার টাকা দিয়ে কেনা কোরবানির গরুর চামড়া বিক্রি করতে পারিনি। ক্ষোভে মাটির নিচে পুঁতে ফেলেছি। আশপাশের কারো গরুর চামড়া বিক্রি হয়নি। দেখা গেছে জেলার বিভিন্ন এলাকা থেকে কারসাজির মাধ্যমে কাঁচা চামড়া সংগ্রহ করেছে আড়তদার ব্যবসায়ীরা। কোরবানিদাতা টাকা না পেলেও কয়েক দফায় হাতবদল হয়ে আড়তদার ও ট্যানারির কাছে কাঁচা চামড়া পৌঁছেছে।
চট্টগ্রামে আতুরার ডিপো এলাকায় প্রায় শতাধিক আড়তদার ব্যবসায়ী রয়েছে। তারা জেলার বিভিন্ন স্থান থেকে কাঁচা চামড়া সংগ্রহ করে আড়তে লবণ দিয়ে মজুদ করেন। এসব আড়তদারদের সঙ্গে রয়েছে মৌসুমী চামড়া ব্যবসায়ীদের যোগসাজস। গত কয়েক বছর ধরে চামড়ার দরপতনের কথা বলে কারসাজি করে কোরবানির পশুর চামড়া সংগ্রহ করছে। কোরবানির আগে আড়তদার ব্যবসায়ীরা ট্যানারির কাছে বাকিতে চামড়া বিক্রি করতে হয়, চামড়ার চাহিদা নেই এসব অজুহাত তৈরি করে কোরবানির দিন চামড়ার বাজারে অচলাবস্থা সৃষ্টি করছে। এর ফলে কোরবানি দাতারা চামড়া বিক্রি করতে পারছে না।
কদম মোবারক মুসলিম এতিমখানার তত্ত্বাবধায়ক আবুল কাসেম বলেন, ১৬০টি গরুর চামড়া পেয়েছিলাম। সাত/আটটি চামড়া বিক্রি করতে না পেরে ফেলে দিয়েছি। অন্যগুলো ১০০ থেকে ১৫০ টাকা দরে বিক্রি করেছি। ছাগলের চামড়া একটিও বিক্রি করতে পারেনি। ফেলে দিয়েছি। বাওয়া চিল্ডেন হোমের তত্ত্বাবধায়ক মাওলানা আবদুল কাদের বলেন ৫০টি চামড়া বিক্রি করেছি। দাম পেয়েছি প্রতিটির ১৫০ থেকে ২০০ টাকা। অনেক চামড়া কোরবানিদাতারা আমাদের প্রতিষ্ঠানের সামনে রাস্তায় রেখে গিয়েছিলেন। পরে সেগুলো সিটি করপোরেশনের ময়লার গাড়ি নিয়ে গেছে।
আড়তদার ব্যবসায়ীরা জানান, তিন দফায় হাতবদল হয়ে তাদের হাতে চামড়া পৌঁছে। প্রথমত এলাকার কিছু লোক কোরবানিদাতাদের কাছ থেকে কৌশলে চামড়া নিয়ে নেয়। পরে তারা নির্দিষ্ট স্থানে এনে মৌসুমী ব্যাপারীদের কাছে বিক্রি করে। ব্যাপারীরা শহরে এনে আরেক দফায় বিক্রি করে। পরে এসব কাঁচা চামড়া আড়তদারদের হাতে পৌঁছে। চট্টগ্রাম কাঁচা চামড়া আড়তদার ব্যবসায়ী সমবায় সমিতির সভাপতি মো. মুসলিম উদ্দিন বলেন, কোরবানিদাতাদের কাছ থেকে তিন/চার দফায় হাত বদল হয়ে আমাদের আড়তে পৌঁছে। আমাদের প্রতিটি চামড়া ২৫০ থেকে ৫০০ টাকায় কিনতে হয়। এবার জেলায় কোরবানি কম হয়েছে। এই পর্যন্ত জেলায় ৩ লাখ দেড় হাজার কোরবানির পশু চামড়া সংগ্রহ হয়েছে। সব চামড়া এখনো আড়তে পৌঁছেনি। মৌসুমী ব্যবসায়ীদের কাছে লবণযুক্ত প্রায় দেড় লাখ চামড়া মজুদ রয়েছে।
জেলার ভারপ্রাপ্ত প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তা ডা. সেতু ভূষণ দাশ বলেন, অনেক কোরবানিদাতা চামড়া বিক্রি করতে না পেরে মাটির নিচে পুঁতে ফেলেছে। আবার কাঁচা চামড়ার উপরের পশম ফেলে নিয়ে অনেকেই চামড়া রান্না করে খাচ্ছে। চামড়া হিসাব আমরা সংরক্ষণ করি না।
