আওয়ামী লীগের মহিলা বিষয়ক উপকমিটি থেকে বহিষ্কৃত ও এফবিসিআইর পরিচালক হেলেনা জাহাঙ্গীরের বিরুদ্ধে গুলশান থানায় শুক্রবার র্যাব তিনটি মামলা দায়ের করেছে। এর আগে বৃহস্পতিবার রাত সাড়ে ১২টার দিকে গুলশানের বাসা থেকে হেলেনা জাহাঙ্গীরকে গ্রেফতার করার পর শুক্রবার বিকাল সাড়ে ৫টার দিকে তাকে গুলশান থানায় হস্তান্তর করে র্যাব।
ডিজিটাল প্ল্যাটফরম ব্যবহার করে মিথ্যাচার, অপপ্রচার ও বিভ্রান্তিকর তথ্য ছড়ানো এবং রাষ্ট্রবিরোধী কার্যকলাপের অভিযোগে ডিজিটাল সিকিউরিটি আইনে গুলশান থানায় তার বিরুদ্ধে একটি মামলা দায়ের করা হয়েছে। এই মামলায় পুলিশ তাকে পাঁচ দিনের রিমান্ডের আবেদন জানিয়ে শুক্রবার রাত ৮টার দিকে ঢাকা মুখ্য মহানগর হাকিম আদালতে পুলিশ হাজির করে। আদালত শুনানি শেষে তার তিন দিনের রিমান্ড মঞ্জুর করে। এছাড়া বন্য পশুর চামড়া, মাদক, ক্যাসিনো-সামগ্রী ও আরো বেশকিছু অবৈধ পণ্য পাওয়ার অভিযোগে গুলশান থানায় একটি মামলা দায়ের করেছে র্যাব। একই সময় মিরপুরে জয়যাত্রা টেলিভিশন কার্যালয়ে অবৈধ সরঞ্জমাদি উদ্ধারের ঘটনায় পল্লবী থানায় র্যাব আরো একটি মামলা দায়ের করে।
বৃহস্পতিবার রাত সাড়ে ১২টার দিকে রাজধানীর গুলশান-২ এলাকার ‘জেনেটিক রিচমন্ড’ অ্যাপার্টমেন্ট থেকে র্যাব হেলেনা জাহাঙ্গীরকে গ্রেফতার করে। এ সময় র্যাব তার বাসা থেকে ১৯ বোতল বিদেশি মদ, একটি ক্যাঙারুর চামড়া, একটি হরিণের চামড়া, দুইটি মোবাইল ফোন, ১৯টি চেক বই ও বিদেশি মুদ্রা, দুইটি ওয়াকিটকি সেট এবং ক্যাসিনো খেলার ৪৫৬টি চিপস জব্দ করে।
পরে বৃহস্পতিবার মধ্যরাতে মিরপুর-১১ নম্বরের এ ব্লকের ৩ নম্বর রোডে জয়যাত্রা টিভি কার্যালয়ে অভিযান চালায় র্যাব। সেখান থেকে আইপি টিভি চালানোর সরঞ্জামাদি জব্দ করা হয়। অভিযান শেষে র?্যাব সদর দপ্তরের নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট নাদির শাহ বলেন, জয়যাত্রা টিভি চ্যানেলটির কোনো বৈধ কাগজপত্র ছিল না। যদিও সম্প্রচারের জন্য চ্যানেলের যে সেটআপ থাকা দরকার, তার সবকিছুই রয়েছে।
তিনি বলেন, হেলেনা জাহাঙ্গীর তার জয়যাত্রা টেলিভিশনের জন্য সারা দেশে প্রতিনিধি নিয়োগ করেছিলেন। প্রবাসী প্রতিনিধি নিয়োগের নামে তিনি অর্থ হাতিয়ে নিয়েছেন। বৈধ কাগজপত্র না পাওয়ায় তদন্ত করে ব্যবস্থা নেওয়া হবে। এছাড়াও এখানে জয়যাত্রা ফাউন্ডেশনের অফিস পেয়েছি। এ বিষয়েও তদন্ত করা হবে।
সূত্র জানায়, নিট কনসার্ন প্রিন্টিং ইউনিট, জয় অটো গার্মেন্টস লিমিটেড, জেসি এমব্রয়ডারি অ্যান্ড প্রিন্টিং এবং হুমায়রা স্টিকার লিমিটেড দিয়ে হেলেন জাহাঙ্গীরের ব্যাবসায়িক কার্যক্রম শুরু হয়। এরপর তিনি কয়েকটি প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলেন যেগুলো ছিল নামসর্বস্ব। প্রতিষ্ঠানগুলো হলো—হেলেনা ফাউন্ডেশন, হেলেনা শিশু কল্যাণ সংঘ, হেলেনা সেবা সংঘ, হেলেনা আলোর দিশারী ফুটবল ক্লাব, হেলেনা সারগাম একাডেমি, হেলেনা চক্ষু হাসপাতাল ও জয়যাত্রা অনলাইন নিউজ পোর্টাল।
প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদের বরাত দিয়ে র্যাবের একজন কর্মকর্তা জানান, তিনি উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ব্যবহার করে রাষ্ট্রীয় গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিদের মানহানি ও সুনাম নষ্ট করেছেন। এছাড়া তিনি মিথ্যা ও বানোয়াট তথ্য প্রচার করে জনমনে বিভ্রান্তির সৃষ্টি করেছেন। বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তির সঙ্গে ছবি তুলে তা সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ছড়িয়ে দিয়ে সম্মানিত ব্যক্তিদের বিব্রত করতেন।
গুলশান থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) আবুল হাসান জানান, শুক্রবার বিকাল সাড়ে ৫টার দিকে তাকে গুলশান থানায় হস্তান্তর করে র্যাব। থানায় ডিজিটাল সিকিউরিটি আইনে মামলা দায়েরের পর তাকে ঐ মামলায় পাঁচ দিনের রিমান্ডের আবেদন জানিয়ে ঢাকার চিফ মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট আদালতে হাজির করা হয়। আদালত তিন দিনের রিমান্ড মঞ্জুর করেন।
কে এই হেলেনা জাহাঙ্গীর
হেলেনা জাহাঙ্গীর যখন যে সরকার ক্ষমতায় এসেছে তিনি নানা ছুতোয় সরকারের উচ্চ পর্যায়ের লোকদের সঙ্গে নানা কায়দায় সম্পর্ক গড়ে বিভিন্ন সুযোগ-সুবিধা আদায় করেছেন। এতে তিনি অনেকের কাছে সুবিধাবাদী হিসেবে পরিচিতি পান। ক্ষমতাসীন সরকারের দুই বড় নেতার সঙ্গে সম্পর্ক গড়ে তিনি নানা সুযোগ-সুবিধা আদায় করেছেন। হেলেনার কিছু প্রতিষ্ঠান আছে যেগুলো নামসর্বস্ব। শুধুই খাতা-কলমে আছে। সেগুলোর কোনো কার্যালয় ছিল না। অভিযানে তার বাসা থেকে বিভিন্ন নথিপত্র উদ্ধার করেছে র্যাব। সেখানে ১৪টি প্রতিষ্ঠানের প্যাড পাওয়া গেছে। কিন্তু সেগুলো হচ্ছে খাতা-কলমে।
সূত্র জানায়, হেলেনার সচিবালয় ও গণপূর্ত অধিদপ্তরে যাতায়াত ছিল অবাধে। সেখানকার ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের সঙ্গে দহরমমহরম সম্পর্ক থাকার কারণে তাকে অনেকেই সমীহ করে চলতেন। একেক মন্ত্রণালয়ের যাতায়াত করতে তার সচিবালয়ের পাশ পাওয়ার ব্যাপারে কোনো অসুবিধা হতো না। বিশেষ করে গণপূর্ত অধিদপ্তরের এক ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তার সঙ্গে তার বিশেষ সম্পর্ক ছিল।
সূত্র জানায়, প্রতারণার জাল গভীরভাবে বিস্তার করার জন্য হেলেনা খুলে বসেন জয়যাত্রা নামে একটি আইপি টেলিভিশন। ঐ টেলিভিশনের কোনো অনুমতি ছিল না বলে র্যাব জানিয়েছে। ঢাকাসহ সারা দেশে ঐভুয়া আইপি টিভির জন্য তিনি ৮০০ সাংবাদিক নিয়োগ দিয়েছেন। শুধু ঢাকা শহরে তার সাংবাদিকের সংখ্যা ২০০ জন। বিভাগীয় শহরগুলোতে ২৫ জন করে ঐ টিভির সাংবাদিক তিনি নিয়োগ দিয়েছেন। এছাড়াও জেলা ও থানাকেন্দ্রিক ঐ টিভির সাংবাদিক তিনি নিয়োগ দিয়েছিলেন। র্যাবের প্রাথমিকভাবে জিজ্ঞাসাবাদে স্বীকার করেছেন যে, জেলাকেন্দ্রিক সাংবাদিক নিয়োগে তিনি ১ লাখ টাকা করে নিয়েছেন।
হেলেনা জাহাঙ্গীরের জন্ম কুমিল্লা জেলায়। বাবা মরহুম আবদুল হক শরীফ ছিলেন জাহাজের ক্যাপ্টেন। সেই সুবাদে তিনি বেড়ে উঠেছেন চট্টগ্রামের হালিশহরের মাদারবাড়ী সদরঘাট এলাকায়। চাকরিসূত্রে তার বাবা রাশিয়ায় চলে গেলে মায়ের সঙ্গে গ্রামে ফিরে যান হেলেনা। ১৯৯০ সালে বিয়ে করেন ব্যবসায়ী জাহাঙ্গীর আলমকে। তার পর থেকে তার নামের পাশে যুক্ত হয় জাহাঙ্গীর। বর্তমানে তিনি হেলেনা জাহাঙ্গীর নামেই পরিচিত।
