দেশের তরুণ-তরুণীদের মধ্যে প্রায় এক-তৃতীয়াংশই কোনো কাজ করিতেছেন না, আবার পড়াশোনাও করিতেছেন না। সেই কারণে এই শ্রেণির মধ্যে বেকারত্বের হার বেশি। বর্তমানে ১৫ হইতে ২৯ বত্সর বয়সী ২৯ দশমিক ৮ শতাংশ তরুণ-তরুণীর এমন অবস্থা। অর্থাত্ কাজেও নাই আবার পড়াশোনাও করিতেছেন না—এমন তরুণ-তরুণীর সংখ্যা বাড়িতেছে দিন দিন। অথচ টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্য (এসডিজি) অর্জনে ২০২০ সালের মধ্যে কাজ ও পড়াশোনা কোনোটিই করিতেছেন না—এমন তরুণ-তরুণীর হার ২২ শতাংশে নামাইয়া আনিবার লক্ষ্য নির্ধারণ করা হইয়াছিল। এই সকল তথ্য উঠিয়া আসিয়াছে টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্য (এসডিজি) বিষয়ক প্রথম পর্যালোচনা প্রতিবেদনে। এই প্রতিবেদন তৈরি করিয়াছে পরিকল্পনা কমিশনের সাধারণ অর্থনীতি বিভাগ (জিইডি)।
এই সমস্যা ইতিপূর্বে অনেকবার আলোচনায় আসিয়াছে যে, দেশে উচ্চশিক্ষা প্রদানকারী বিশ্ববিদ্যালয়ের সংখ্যা অনেক বৃদ্ধি পাইবার কারণে গ্রাজুয়েটের সংখ্যাও অনেকগুণ বৃদ্ধি পাইয়াছে। কিন্তু দুঃখের সহিত বলিতে হয়, গ্রাজুয়েটের সংখ্যার অনুপাতে ভালো মানের মানবসম্পদ তৈরি হইতেছে না। কেবল তাহাই নহে, স্বাধীনতার চার যুগ পরেও বাংলাদেশে কার্যত বহুজাতিক কোম্পানিগুলির ঊর্ধ্বতন পদগুলিতে বাংলাদেশি গ্রাজুয়েটরা নিজেদের খুব বেশি প্রতিষ্ঠিত করিতে পারেন নাই। এই সমস্যার একটি বড় কারণ হিসাবে মনে করা হয়, আমাদের গ্রাজুয়েটদের মধ্যে পেশাদারিত্বের অভাব রহিয়াছে। অথবা অন্যভাবে বলা যায় যে, তাহাদের আমরা পেশাদার বানাইতে ব্যর্থ হইতেছি। দেখা যায় যে, আমাদের গ্রাজুয়েটরা অধিকাংশ ক্ষেত্রেই বড় কোনো লক্ষ্যের দিকে ধাবিত না হইয়া কোনোমতে একটি চাকুরির পিছনে ছুটিয়া থাকেন। আর একটি চাকুরি হইয়া গেলে নিজেকে উন্নত করিবার জন্য তাহাদের আর চেষ্টা করিতে দেখা যায় না। অথচ বাংলাদেশ এখন তারুণ্যের স্বর্ণযুগে বসবাস করিতেছে। ইউএনডিপির আঞ্চলিক মানব উন্নয়ন প্রতিবেদনে ইতিপূর্বে বলা হইয়াছে যে, বাংলাদেশ বর্তমানে তরুণদের দেশ। দেশের ৪৯ শতাংশ মানুষের বয়স ২৪ বত্সর বা তাহার নীচে। আর, কর্মক্ষম মানুষ রহিয়াছেন সাড়ে ১০ কোটির বেশি—যাহা মোট জনসংখ্যার ৬৬ শতাংশ। জনসংখ্যাতাত্ত্বিক এই পরিস্থিতি বাংলাদেশের অর্থনৈতিক উন্নয়নের জন্য বড় সুযোগ আনিয়া দিয়াছে। কিন্তু আমরা কেন সুযোগ যথাযথভাবে কাজে লাগাইতে পারিতেছি না—ইহার বড় কারণ হিসাবে বিশ্লেষকরা মৌলিক শিক্ষার নিম্নমান এবং যুগোপযোগী কারিগরি শিক্ষার অভাবকেই দায়ী করিয়াছেন। অর্থাত্ দক্ষতা বিবেচনায় পিছাইয়া রহিয়াছে আমাদের তরুণ জনগোষ্ঠী।
ইহা কাহারোই অজানা নহে যে, বর্তমান বিশ্বে প্রযুক্তিগত অগ্রগতির সুফল পাইতে কর্মীদের সংশিষ্ট বিষয়ে সঠিক দক্ষতা উন্নয়ন প্রয়োজন। এই দক্ষতা নিশ্চিত করিতে পারে যথাযথ শিক্ষা কার্যক্রম ও দক্ষতা উন্নয়ন। চাকুরি হউক কিংবা সেলফ এমপ্লয়মেন্ট—কাজের উপযোগী হইবার জন্য আলাদা করিয়া বিশেষ দক্ষতা লাগিবেই। এই বিষয়টি নিশ্চিত করিতে আমাদের তরুণদের জন্য দক্ষতা উন্নয়নে সংশ্লিষ্ট সকল পক্ষকে আরো মনোযোগী হইতে হইবে। নচেত্ হেলায় নষ্ট হইবে আমাদের অমূল্য তারুণ্যশক্তির বৃহত্ একটি অংশ।
