রেশন প্রদানে নতুন ও পুরোনো রোহিঙ্গাদের সমান মূল্যায়ন করায় মর্যাদাহানি হয়েছে দাবি করে বিক্ষোভ করেছে কক্সবাজারের টেকনাফের নয়াপাড়া রেজিস্ট্রার্ড (নিবন্ধিত) ক্যাম্পের পুরোনো রোহিঙ্গারা। গতকাল রবিবার ভোরে শুরু হওয়া বিক্ষোভ চলতে থাকে দুপুর পর্যন্ত। এসময় এপিবিএন সদস্যরা ধৈর্যসহকারে রোহিঙ্গাদের অভিযোগ শুনে ও তাদের শান্ত করার চেষ্টা করে। কিন্তু রোহিঙ্গারা একপর্যায়ে পুলিশকে লক্ষ্য করে ইটপাটকেল ছুড়তে থাকে। এতে এপিবিএনের ১০-১২ জন সদস্য আহত হয়েছেন। পরিস্থিতি সামলাতে ফাঁকা গুলি চালিয়েছে এপিবিএন সদস্যরা। এতে আহত হয়েছেন কয়েক জন রোহিঙ্গাও। তবে, তাদের নাম-পরিচয় বিস্তারিত জানা যায়নি।
জানা গেছে, ২০১৭ সালে আসা রোহিঙ্গাদের জন্য ইস্যু করা ফুড কার্ড ও পুরোনো রোহিঙ্গাদের জন্য তৈরি ফুড কার্ডের ধরন একই হওয়ায় এতে মর্যাদাহানি হয়েছে বলে দাবি করে পুরোনো রোহিঙ্গারা রেশন নেওয়া বন্ধ রেখেছে। সূত্র জানায়, ১৯৯১-৯২ সালে আসা রোহিঙ্গাদের মধ্যে কয়েক লাখ নিজ দেশে ফিরে যায়। কিন্তু হঠাত্ স্থগিত হওয়া প্রত্যাবাসনে প্রায় ৩৪ হাজার রোহিঙ্গা বাংলাদেশে আটকা পড়ে। পরে নিবন্ধিত এসব রোহিঙ্গার মাঝে ২২ হাজার জনকে টেকনাফের নয়াপাড়া ও বাকি ১২ হাজার জনকে কুতুপালং ক্যাম্পে রাখা হয়। এরা তখন থেকে ইউএনএইচসিআর-এর তত্ত্বাবধানে সব সুযোগ-সুবিধা পেয়ে আসছে।
কিন্তু ২০১৭ সঙ্গে নিপীড়নের শিকার হয়ে প্রায় ৮ লাখ রোহিঙ্গা নতুন করে বাংলাদেশে আশ্রয় নেয়। এর আগে বিছিন্নভাবে আরো কয়েক লাখ রোহিঙ্গা বাংলাদেশে অনুপ্রবেশ করে উখিয়া-টেকনাফ এবং পুরো জেলায় অবস্থান নেয়। সবাইকে নিবন্ধনের আওতায় এনে প্রায় ১১ লাখ রোহিঙ্গাকে উখিয়া-টেকনাফে ৩৩টি ক্যাম্প করে রাখা হয়েছে। তাদের জীবিকায়নে ইউএনএইচসিআর ফুড কার্ড তৈরি করে। এ কার্ডের বিপরীতে রোহিঙ্গারা জনপ্রতি ৯০০ টাকা ও অন্যান্য আহার্য পণ্য পেয়ে থাকেন।
কিন্তু সম্প্রতি পুরোনো নিবন্ধিত রোহিঙ্গারা জানতে পারেন, তাদের ও নতুন রোহিঙ্গাদের জন্য তৈরি ফুড কার্ডের রং ও ধরন একই। এতে মর্যাদাহানি হয়েছে বলে মনে করে জুলাই মাসের রেশন তুলেনি পুরোনো রোহিঙ্গারা।
ক্যাম্পের রোহিঙ্গা নেতা মোহাম্মদ ইসলাম বলেন, নতুন রোহিঙ্গাদের ফুডকার্ড এবং পুরোনো রোহিঙ্গাদের ফুডকার্ড একই রকম হওয়াতে পুরোনো রোহিঙ্গাদের মর্যাদাহানি হয়েছে। এটি কোনোভাবেই মেনে নেওয়া যায় না।
কিন্তু শরণার্থী ত্রাণ ও প্রত্যাবাসন কমিশন (আরআরআরসি) এবং জাতিসংঘ শরণার্থী সংস্থা কর্তৃপক্ষ ফুডকার্ড ইস্যুতে গৃহীত সিদ্ধান্তে অটল রয়েছে।
একটি সূত্র মতে, ২০১৭ সালে আসা রোহিঙ্গাদেরকে পুরোনোদের সঙ্গে রাখা শুরু হওয়ার পর থেকে পুরোনো রোহিঙ্গাদের মধ্যে মনস্তাত্ত্বিক দ্বন্দ্ব শুরু হয়। পুরোনো রোহিঙ্গারা শরণার্থী মর্যাদায় বাংলাদেশে বসবাস করছে মনে করে। তাদের ধারণা ছিল সংখ্যা কম ও দীর্ঘদিন ধরে অবস্থান করায় বাংলাদেশ এদের নাগরিকত্ব দিয়ে রাখতে পারে। কিন্তু ২০১৭ সালে নতুন রোহিঙ্গাদের ঢল নামায় তাদের সেই স্বপ্ন তছনছ হয়ে যায়।
টেকনাফ নয়াপাড়া রেজিস্ট্রার্ড (ক্যাম্প-২৫) ক্যাম্পের ইনচার্জ (সিআইসি) উপ-সচিব মো. আবদুল হান্নান জানান, আমরা পুরোনো রোহিঙ্গাদের সঙ্গে আলোচনা চালিয়ে যাচ্ছি। আশা করছি তারা রেশন নেওয়া শুরু করবে। কক্সবাজার ১৬ এপিবিএন অধিনায়ক এসপি তারিকুল ইসলাম তারিক জানান, ফুডকার্ডকে কেন্দ্র করে গতকাল ভোরে নয়াপাড়া ক্যাম্পের বিভিন্ন স্থানে রোহিঙ্গা নারীরা জড়ো হতে থাকে। এপিবিএন সদস্যরা সর্বোচ্চ ধৈর্যসহ রোহিঙ্গা নারীদের শান্ত করার চেষ্টা করে। রোহিঙ্গা নারীরা সংঘবদ্ধ হয়ে পুলিশের ওপর ইটপাটকেল নিক্ষেপ ও পুলিশের সঙ্গে ধস্তাধস্তি শুরু করে এবং অস্ত্র ধরে টানাটানি করতে থাকে। এসময় পুলিশ জানমাল রক্ষায় ও পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে ৫ রাউন্ড ফাঁকা গুলি করে। এতে রোহিঙ্গা নারীরা পালিয়ে যায়। ইটপাটকেলের আঘাতে এপিবিএনের ১০-১২ জন সদস্য আহত হন। চলমান পরিস্থিতি নিয়ে সোমবার আরআরআরসি, ইউএনএইচসিআর ও রোহিঙ্গা প্রতিনিধিদের মধ্যে বৈঠক হওয়ার কথা।
