অবর্ণনীয় দুর্ভোগে যশোরের শ্রমজীবী মানুষ

আপডেট : ০২ আগস্ট ২০২১, ২১:০৬

আহমেদ সাঈদ বুলবুল, যশোর অফিস

করোনা ভাইরাসের থাবায় বিপর্যস্ত যশোরের শ্রমজীবী মানুষ অবর্ণনীয় দুর্ভোগে দিন কাটাচ্ছে। দিন আনা দিন খাওয়া এসব মানুষের দীর্ঘশ্বাস ক্রমেই ভারী হচ্ছে। লকডাউনে এসব সাধারণ মানুষ ভবিষ্যত্ কার্যত অনিশ্চত হয়ে গেছে।

নিম্ন আয়ের মানুষের জন্য ৩০ টাকা কেজি দরে চাল আর ১৮ টাকায় আটা বিক্রি হচ্ছে ওএমএস ডিলারের মাধ্যমে। জেলার ক শ্রেণির পাঁচটি পৌরসভার জন্য চার জন করে ডিলার এবং খ ও গ শ্রেণির তিনটি পৌরসভায় তিন জন ডিলারের মাধ্যমে প্রতিদিন এক টন করে চাল ও আটা বিক্রি করা হচ্ছে। যশোর শহরের চারখাম্বার মোড়ে ওএমএস ডিলার তোতা মিয়ার দোকানের সামনে চাল-আটা কিনতে আসা মানুষের লম্বা লাইনে কথা হয় লকডাউনে গৃহকর্মীর কাজ হারানো নাজির শংকরপুরের নাজমার সঙ্গে। দুটি বাসাবাড়িতে কাজ করে মাসে তার আয় হতো ৩ হাজার টাকা। প্লাস্টিক কারখানার কর্মী ছেলে সেলিম বাবুর উপার্জনও বন্ধ। ছেলের বউসহ তিন জনের সংসারে এখন চরম বিপর্যয়। তিনি বললেন, ‘যেসব বাসায় কাজ করতাম তাদের নিজেদেরই চলে না। তাই রোজার মাস থেকে বাদ দিয়ে দিছে।’ রোজা আর কোরবানির ঈদে কিছু সাহায্য পেয়েছিলাম, তাই দিয়ে কোনোমতে চলছি। এর মধ্যে অনেক টাকা দেনা হয়ে গেছে। কাপুড়িয়া পট্টির কাপড়ের দোকানের কর্মী রতন দত্ত জানান, লকডাউনের কারণে তার দোকান বন্ধ বলে বেতনও বন্ধ। নিজে ডায়াবেটিক রোগী। রুটির জন্য সস্তায় আটা কিনতে লাইনে দাঁড়িয়েছেন। স্কুল শিক্ষিকা মেয়ের বেতনের ওপরই ভরসা তিন সদস্যের পরিবারের।

বাস ও ট্রাকের বডি তৈরি এবং ইঞ্জিন পার্টস ও অটোমোবাইল, ডেন্টিং-পেন্টিং ও লাইটিং কাজের প্রধান কেন্দ্রে পরিণত হয়েছে যশোর। শহরের বকচরে গড়ে উঠেছে পাঁচ শতাধিক ওয়ার্কসপ। এখানে কয়েক হাজার শ্রমিক কাজ করেন। কিন্তু লকডাউনে যানবাহন চলাচল বন্ধ থাকায় বন্ধ এখানকার মোটরগাড়ি ওয়ার্কসপগুলো। এখানকার একটি কারখানায় ১৮ বছর কাজ করছেন মো. রোকন। কিন্তু এমন দুরবস্থায় পড়তে হয়নি কখনো। কাজ হারিয়ে তিনি এখন পুরোপুরি বেকার।

সবকিছু স্থবির থাকায় চরম সংকটে পড়েছে প্রায় প্রতিটি দিনমজুরের পরিবার। শহরের লালদীঘির পাড়ে সকাল হলেই জড়ো হন কয়েক শত দিনমজুর। কিন্তু কে দেবে তাদের কাজ! পুরো দেশটাই যে করোনা এলোমেলো করে দিয়েছে। এখানে কথা হলো আরবপুরের দিনমজুর চান্নু দাসের সঙ্গে। বললেন, ঘর থেকে বের হলেই পুলিশ ঝামেলা করে। ধরা গলায় বললেন, বাচ্চাদের মুখে খাবার দিতে পারছেন না। এভাবে আর কতদিন! ষষ্ঠীতলাপাড়ার দিনমজুর রবিউল জানান, দিনে ৫০০ টাকা হাজিরায় কাজ করেন তিনি। কিন্তু এক মাসে তার আয় হয়েছে মাত্র ৩ হাজার টাকা। এমন হাহাকার প্রতিটি দিনমজুর পরিবারে।

নিম্ন আয়ের কিছুটা ওপরে যাদের অবস্থান, সেই নিম্ন মধ্যবিত্তরাও রয়েছেন গভীর সংকটে। তারা না পারছেন আয়ের ধারাকে সচল রাখতে। না পারছেন হাত পাততে। এরকমই একজন যশোর শিক্ষা বোর্ড ডিজিটাল পোস্ট অফিসের উদ্যোক্তা সুজয় দত্তের মাসে আয় ছিল ১০-১২ হাজার টাকা। শিক্ষা বোর্ডকেন্দ্রিক অনলাইন সেবা দিতেন তিনি। তার রোজগারের ওপর নির্ভরশীল তিনটি মুখ। কিন্তু তার চোখেমুখে এখন শুধুই হতাশা। শিক্ষা বোর্ড, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান সবই বন্ধ। সেবাগ্রহীতাদের আসারও প্রয়োজন এখন আর নেই। কষ্ট চেপে জানালেন তার রোজগার এখন মাসে ১ হাজার টাকায় নেমে এসেছে। রেলগেট মুজিব সড়ক এলাকার মোটরসাইকেল গ্যারেজ মিস্ত্রি ফজলুর রহমানের আয় ৩০ হাজার টাকার ওপরে ছিল। এখন তা ১০ হাজারেরও কম। বাসা আর দোকান ভাড়াতেই তা ব্যয় হয়। রেলরোডের গ্যারেজ মালিক কামাল বললেন, দোকানের চার জন কর্মীর বেতন, ঘরভাড়া, ভ্যাটের টাকা সবই দিতে হচ্ছে। কিন্তু আমার তো আয় নেই। হাতও পাততে পারছি না। করোনা ভাইরাসের গ্রাসে বিপর্যস্ত অভাবী মানুষের মিছিল যে দীর্ঘ সেটা প্রশাসনও স্বীকার করে। এজন্য নানা মানবিক সহায়তা কার্যক্রম নিয়ে তত্পর রয়েছে জেলা, পুলিশ প্রশাসন ও পৌরসভা কর্তৃপক্ষ। অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (সার্বিক) মো. রফিকুল ইসলাম ইত্তেফাককে জানান, কঠোর বিধিনিষেধে মানুষের পাশে প্রশাসন রয়েছে। সাধারণ মানুষের যেন খাবারের অভাব না হয়, এজন্য গত এক মাসে সরকার ২ কোটি ৩ লাখ টাকা বরাদ্দ দিয়েছে। এর মধ্যে ৯০ লাখ টাকা উপজেলা পর্যায়ে পাঠানো হয়েছে। ৩৩৩ নম্বরে কল করলেই মিলছে খাদ্যসহায়তা। এছাড়া জেলার ৮টি পৌরসভায় ১৬৮ টন চাল ও নগদ ১৯ লাখ টাকা এবং আটটি উপজেলায় ৩৪০ টন চাল এবং সোয়া চার ৪ লাখ টাকা বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে।