সমস্যার স্তূপের উপর বসিয়া থাকা যাইবে না

আপডেট : ০২ আগস্ট ২০২১, ২১:০৯

জগতে চিরকালই সমস্যা ছিল, আছে, ভবিষ্যতেও নূতন নূতন সমস্যা আসিবে। কিন্তু সেই সমস্যাটিকে যদি সঠিক ও সর্বোচ্চ সুষ্ঠু ব্যবস্থাপনায় সমাধান করা সম্ভব না হয়, তাহা হইলে তো ঘোরতর বিপদ ঘনাইবে! সম্প্রতি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সাড়ে ৬৫ লক্ষ বাসভবনের প্রায় দেড় কোটি মানুষ মহাবিপদে পড়িয়াছেন। তাহারা যেই বাড়ি ভাড়া করিয়া বসবাস করিতেছেন, সেই বাড়ির ভাড়া প্রদানের মতো ডলার তাহাদের হাতে নাই। নাই মানে কয়েক মাসের জন্য নাই, তাহা নহে—মাসের পর মাস ধরিয়া নাই। বলা যায়, করোনার প্রকোপ বৃদ্ধির পর হইতেই বাড়িভাড়া বকেয়া রহিয়াছে। এমনিতেই বিশ্বের সবচাইতে বড় পরাশক্তি হইয়াও যুক্তরাষ্ট্র গত বত্সর এক বত্সরে করোনার নিকট বারংবার ধরাশায়ী হইয়াছে। এই অবস্থায় দেশটির লক্ষ লক্ষ মানুষের আয় কমিয়া গিয়াছে। বাড়িভাড়া দিতে পারিতেছেন না।

কংগ্রেস ইতিমধ্যে ভাড়াটিয়াদের বাড়িভাড়া পরিশোধ করিবার জন্য ৪৭ বিলিয়ন ডলারের অনুমোদন দিয়াছে। এই অবস্থায় এই বত্সর ৭ জানুয়ারি প্রথম দফায় ২৫ বিলিয়ন ডলার বিতরণও করা হইয়াছে। ইহার মধ্যে এখন অবধি মাত্র তিন বিলিয়ন ডলার সরাসরি ভাড়াটিয়া বা বাড়ির মালিকের নিকট পৌঁছাইয়াছে। স্বাভাবিকভাবেই বাড়িভাড়া না পাইয়া বাড়িওয়ালাদের একটি অংশ তাহাদের বন্ধকির কিস্তি, কর ও বিমার অর্থ পরিশোধ করিতে হিমশিম খাইতেছেন। ঋণ লইয়া পুঁজি বিনিয়োগ করিয়া বাড়ি বানাইয়া তাহারা তো অপরাধ করেন নাই। প্রকৃত অর্থে, ‘মহান গণতন্ত্রের দেশ’ আমেরিকার জন্য এই ঘটনাটি বেশ অস্বস্তিকর। অনেকেই মনে করেন, ভাড়াটিয়াদের রক্ষা করা সম্ভব না হইলে তাহা হইবে প্রেসিডেন্ট জো বাইডেনের জন্য বড় ধরনের ধাক্কা। এই জন্য গত বৃহস্পতিবারই তিনি মহামারির কারণে ভাড়াটিয়া উচ্ছেদ স্থগিতাদেশের মেয়াদ বৃদ্ধির আহ্বান জানাইয়াছিলেন। যদিও শুক্রবার মার্কিন প্রতিনিধি পরিষদ কোনো ধরনের সিদ্ধান্ত ছাড়াই সভা মুলতুবি হইয়া যায়। মার্কিন সিনেটও শনিবার জরুরি অধিবেশনে বসে। কিন্তু সেইখানেও বিষয়টির কোনো সুরাহা হয় নাই। প্রকৃতপক্ষে হোয়াইট হাউজ এই বিষয়ে এককভাবে এখন সিদ্ধান্ত লইতেও পারিবে না। কারণ এই বিষয়ে সুপ্রিম কোর্টের নির্দেশনা রহিয়াছে।

ইহা সত্য যে, সারা বিশ্বেই করোনার কারণে এক ভয়াবহ মন্দার সৃষ্টি হইয়াছে। চেইন রিঅ্যাকশনের মতো ইহারই হাত ধরিয়া দেখা দিতেছে নূতন নূতন সমস্যাও। কিন্তু সমস্যা তো আসিতেই পারে। কিন্তু সমস্যা জিইয়া রাখা উন্নত পুঁজিবাদী রাষ্ট্রের জন্য অত্যন্ত বিপজ্জনক। তৃতীয় বিশ্বের দেশগুলিতে সমস্যার সঠিক সমাধান করা হয় বলিয়াই দেশগুলিতে যত অসহিষ্ণুতা, অস্থিরতা দেখা যায়। পুঁজিবাদের একটি বিশেষ নিয়ম রহিয়াছে। ১৭৭৬ সালে স্কটিশ অর্থনীতিবিদ অ্যাডাম স্মিথ ‘দ্য ওয়েলথ ন্যাশনস’ নামে অর্থনীতির যুগান্তকারী গ্রন্থে বলিয়াছেন, যখন একজন জমিদার, অথবা কোনো তাঁতি, কিংবা মুচি তাহার নিজের পরিবারের চাহিদার চাইতেও অধিক টাকা আয় করেন, তখন তিনি ঐ অতিরিক্ত টাকা দিয়া সহকারী নিয়োগ করিয়া আরো বেশি টাকা আয় করিতে পারেন। যত বেশি টাকা আয় হইবে, তত বেশি সহকারী ঐ কাজে নিযুক্ত হইবে। তাহা হইলে দেখা যাইতেছে যে, কোনো পেশাজীবীর ব্যক্তিগত লাভ যত বেশি হইবে, সমাজের মোট সম্পদ ও উন্নয়নও ততই বাড়িবে। স্মিথ বলেন যে, আমি ধনী হইলে আসলে আমার একার নহে, সবারই কোনো না কোনোভাবে উপকার হয়। অর্থাত্ স্বার্থপরতার মধ্যেই রহিয়াছে এক বিস্ময়কর পরার্থপরতা।

সুতরাং শর্টকাট জনমোহিনী উপায়ে কেবল গণতন্ত্রের লেবাস দিয়া উহার আবেগি সমাধান অনেক ক্ষেত্রেই বিপজ্জনক। কিংবদন্তি মার্কিন প্রেসিডেন্ট আব্রাহাম লিংকন বলিয়াছেন বটে—গণতান্ত্রিক সরকার হইল অব দ্য পিপল, বাই দি পিপল, ফর দি পিপল। কিন্তু অ্যারিস্টটল, কার্লাইল, হেনরি মেইনের মতো অনেক পণ্ডিত মনে করিতেন, গণতন্ত্র হইল অশিক্ষিতদের শাসন। এই ক্ষেত্রে বরং সহজ করিয়া আমরা বলিতে পারি—গণতন্ত্র হইল স্টেট অব মাইন্ড। সুতরাং গণতন্ত্রের নামে সমস্যার উপর বসিয়া থাকা আর আগ্নেয়গিরির উপর বসিয়া থাকা সমান কথা।