দৈনন্দিন উত্পাদিত বিভিন্ন বর্জ্যের মধ্যে একটি উল্লেখযোগ্য অংশ হলো কাচজাতীয় বর্জ্য, যা পুনর্ব্যবহারযোগ্য। আমাদের প্রতিদিনের কর্মকাণ্ডে ব্যবহূত অসংখ্য কাচসামগ্রী অপরিকল্পিত ও অসচেতনভাবে যত্রতত্র ফেলে দেওয়া হয়। যথাযথভাবে এসব অব্যবহূত কাচ পুনরুদ্ধার না করা হলে তা পরিণত হয় বর্জ্যে। অব্যবস্থাপনার কারণে যে বিপুল পরিমাণ বর্জ্য পরিবেশে জমা হচ্ছে, তা অদূর ভবিষ্যতের জন্য অশনিসংকেত। এসব বর্জ্য পরিবেশ ও জনস্বাস্থ্যের জন্য হুমকিস্বরূপ। এ সমস্যার একটি আদর্শ সমাধান হতে পারে কাচের রিসাইক্লিং বা পুনর্ব্যবহার।
উত্পাদন প্রক্রিয়ায় ব্যবহূত ছয় টন পুনর্ব্যবহারযোগ্য কাচের জন্য এক টন কার্বন ডাই-অক্সাইড উত্পাদন হ্রাস পায়। পুনর্ব্যবহূত কাচের ব্যবহার তুলনামূলকভাবে বায়ুদূষণকে ২০ শতাংশ এবং পানিদূষণকে ৫০ শতাংশ হ্রাস করে। কাচের রিসাইক্লিংয়ের কারণে বায়ুমণ্ডলে ক্ষতিকর উপাদানের নির্গমন ৮ শতাংশ, সালফার অক্সাইড নির্গমন ১০ শতাংশ এবং নাইট্রোজেন অক্সাইড নির্গমন ৪ শতাংশ হ্রাস পায়। রিসাইক্লিং করার মাধ্যমে ল্যান্ডফিলের বর্জ্যের পরিমাণ কমে যায়, ফলে ল্যান্ডফিলের ধারণক্ষমতাও বৃদ্ধি পায়। বিভিন্ন উন্নত দেশের পাশাপাশি বাংলাদেশেও কাচ রিসাইক্লিং ব্যাপক হারে বৃদ্ধি পেয়েছে। কাচের বোতল ও পাত্রগুলো ১০০ শতাংশ পুনর্ব্যবহারযোগ্য এবং বিশুদ্ধতা বা মানের কোনো পরিবর্তন ছাড়াই অবিরাম পুনর্ব্যবহার করা যেতে পারে। একটি কাচের সামগ্রী ল্যান্ডফিলে পাঠানো হলে তা বিশ্লেষিত হতে ১ মিলিয়ন বছর সময় নিতে পারে। বিপরীতক্রমে পুনর্ব্যবহারের মাধ্যমে একটি নতুন কাচের পণ্য তৈরি করতে ৩০ দিনেরও কম সময় লাগে। শিল্প খাতে সব পুনর্ব্যবহূত কাচের ৮০ শতাংশই নতুন কাচের পাত্রে পরিণত হয়। কাচ পুনর্ব্যবহারের মাধ্যমে প্রাকৃতিক সম্পদের সর্বোত্তম ব্যবহার হয়। নতুন কাচ তৈরি করার জন্য ২ হাজার ৬০০ থেকে ২ হাজার ৮০০ ডিগ্রি ফারেনহাইট তাপমাত্রার প্রয়োজন হয়, যার জন্য প্রচুর শক্তির প্রয়োজন এবং এটি গ্রিনহাউজ গ্যাসসহ অনেক শিল্পদূষণ তৈরি করে। কাচ বর্জ্য পুনর্ব্যবহারের মাধ্যমে নতুন কাচ তৈরি করলে ৪০ শতাংশ তাপশক্তি ও দূষণ হ্রাস পায়।
বিশ্বব্যাংকের সমীক্ষা অনুযায়ী, বিশ্বে মোট কঠিন বর্জ্যের মধ্যে কাচজাত বর্জ্যের পরিমাণ ৫ শতাংশ। বর্তমানে বাংলাদেশে কাচের ব্যবহার বৃদ্ধি পাচ্ছে, সেই সঙ্গে বাড়ছে কাচজাতীয় বর্জ্যের পরিমাণ। এক পরিসংখ্যানে জানা যায়, বাংলাদেশে প্রতি বছর কাচের ব্যবহার বাড়ছে ১০ থেকে ১২ শতাংশ হারে। দেশে এখন প্রায় সরকারি-বেসরকারি ৯টি কাচ উত্পাদনকারী প্রতিষ্ঠান আছে। কিন্তু শিল্পপ্রতিষ্ঠানের তুলনায় কাচ উত্পাদনের জন্য বিশেষ সিলিকা বালু বাংলাদেশে অপ্রতুল। বাংলাদেশের শেরপুর জেলার বালিজুরিতে, হবিগঞ্জ জেলার তেলিপারা ও শাহজিবাজারে, কুমিল্লা জেলার চৌদ্দগ্রাম উপজেলায় এবং চট্টগ্রাম জেলার হাটহাজারী উপজেলায় কাচবালুর মজুত আছে। কিন্তু এর পরিমাণ মাত্র কয়েক মিলিয়ন টন। কাচ পুনর্ব্যবহারের মাধ্যমে কাঁচামালের ব্যবহার হ্রাস করা সম্ভব। পুনর্ব্যবহারযোগ্য কাচ ৯৫ শতাংশ পর্যন্ত কাঁচামাল ধারণ করে। আর এই পুনরুদ্ধারকৃত কাচ হতে পারে নতুন কাচের প্রাথমিক উপাদান। কাচ রিসাইক্লিং সামাজিক ও পরিবেশগত উন্নয়নের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ। তাই পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষায় কাচ রিসাইক্লিংয়ে আরো গতি আনতে হবে।
n লেখক :শিক্ষার্থী, দারুননাজাত সিদ্দিকীয়া কামিল মাদ্রাসা, ডেমরা, ঢাকা
