রাজধানীর বারিধারা ও মোহাম্মদপুরে পৃথক অভিযানে গ্রেফতারকৃত মডেল ফারিয়া মাহাবুব পিয়াসা ও মরিয়ম আক্তার মৌকে তিন দিনের রিমান্ডে নিয়েছে পুলিশ। গত রবিবার ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশ (ডিবি) বিশেষ অভিযান চালিয়ে তাদের আটক করে। অভিযানের সময় পুলিশ তাদের দুজনের বাসা থেকে বিপুল পরিমাণ মাদকদ্রব্য উদ্ধার করে। পরে আটক এই দুই মডেলের বিরুদ্ধে গতকাল সোমবার মোহাম্মদপুর ও গুলশান থানায় মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ আইনে পৃৃথক দুটি মামলা করা হয়। এ দুই মামলায় তাদের গ্রেফতার দেখিয়ে আদালতে হাজির করা হলে আদালত তাদের তিন দিন করে রিমান্ডে নিয়ে জিজ্ঞাসাবাদের অনুমতি দেয়। পুলিশ বলছে, এ দুই মডেলসহ আরো কয়েক জন একটি চক্রের সদস্য। ঐ চক্রের টার্গেট বিত্তশালী পরিবারের সন্তান। তারা বিভিন্ন সময়ে উচ্চবিত্ত পরিবারের সন্তানদের বাসায় আমন্ত্রণ জানিয়ে পরে আপত্তিকর ছবি তুলে ব্ল্যাকমেইল করত। তারা আপত্তিকর ছবি ও ভিডিও ধারণ করে সেসব দেখিয়ে হুমকি দিত। এভাবেই ঐ সব পরিবার থেকে লুটে নিত অর্থবিত্ত। এমন কয়েকটি অভিযোগের তদন্তের স্বার্থে তাদের বাসায় অভিযান চালায় পুলিশ। বাসায় মাদকদ্রব্য পাওয়ায় প্রথমে তাদের বিরুদ্ধে মাদক আইনে মামলা দায়ের হয়েছে। এছাড়া তাদের বিরুদ্ধে ব্ল্যাকমেইলিংয়ের অভিযোগ থাকায় আলাদা মামলা হবে বলে পুলিশ সূত্র জানিয়েছে।
ডিবি উত্তরের যুগ্ম-কমিশনার হারুন-অর রশীদ সাংবাদিকদের বলেন, ‘পিয়াসা ও মৌয়ের বিরুদ্ধে নানা অভিযোগ রয়েছে। পিয়াসা বারিধারার একটি ফ্ল্যাটে থাকেন। আর মৌ থাকেন মোহাম্মদপুরে। তারা দুজন একটি সংঘবদ্ধ প্রতারক চক্রের সদস্য। এ দুই মডেল হচ্ছেন রাতের রানি। তারা দিনের বেলায় ঘুমান এবং রাতে এসব কর্মকাণাড করেন। উচ্চবিত্ত পরিবারের সন্তানদের পার্টির নামে বাসায় ডেকে আনতেন তারা। বাসায় এলে তাদের সঙ্গে আপত্তিকর ছবি-ভিডিও ধারণ করে রাখতেন। পরে তারা সেসব ভিডিও ও ছবি ভিক্টিমদের পরিবারকে পাঠাবে বলে ব্ল্যাকমেইল করে বিপুল পরিমাণ টাকা হাতিয়ে নিতেন। এই অভিযোগের তদন্ত করতে গিয়ে তাদের বাসায় অভিযান চালানো হয়। দুজনের বাসায় বিদেশি মদ, ইয়াবা ও সিসা পাওয়া গেছে। মৌয়ের বাড়িতে মদের বারও ছিল। তাদের মাদক আইনে গ্রেফতার দেখানো হয়েছে। এসব মামলায় তাদের রিমান্ডে জিজ্ঞাসাবাদ করা হবে।’
গোয়েন্দা কর্মকর্তারা জানান, রবিবার রাত ১০টার দিকে গুলশান থানার বারিধারার ৯ নম্বর রোড এলাকায় মডেল পিয়াসার বাসায় অভিযান চালিয়ে বিপুল পরিমাণ বিদেশি মদ, ইয়াবা, সিসাসহ তাকে আটক করা হয়। পরে মোহাম্মদপুরের বাবর রোডে মডেল মৌয়ের বাসায় অভিযান চালায় পুলিশ। সেখান থেকে অন্তত এক ডজন বোতল বিদেশি মদ, পাঁচ প্যাকেট ইয়াবাসহ মৌকে আটক করা হয়। গণমাধ্যমকর্মীদের উপস্থিতিতে ঐ বাসায় পুলিশের অভিযান চলে। তবে আটকের পর মডেল মৌ সাংবাদিকদের কাছে অভিযোগ করে বলেন, ‘ষড়যন্ত্র করে আমাকে ফাঁসানো হচ্ছে। আমার বাসায় এসব মদ আর ইয়াবা আগে থেকে ছিল না।’
গতকাল বিকেলে মডেল মরিয়ম আক্তার মৌকে মোহাম্মদপুর থানায় দায়েরকৃত মামলার আসামি হিসেবে ঢাকা মহানগর হাকিম মো. আশেক ইমামের আদালতে হাজির করে পুলিশ। আর মডেল পিয়াসাকে গুলশান থানায় দায়ের করা মামলায় অতিরিক্ত মুখ্য মহানগর হাকিম শহীদুল ইসলামের আদালতে হাজির করা হয়।
পুলিশের আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে মরিয়ম আক্তার মৌয়ের তিন দিনের রিমান্ড মঞ্জুর করেন ঢাকা মহানগর হাকিম মো. আশেক ইমাম। একইভাবে পিয়াসাকে তিন দিনের রিমান্ডের আদেশ দেন অতিরিক্ত মুখ্য মহানগর হাকিম শহীদুল ইসলাম।
আদালতে পিয়াসার পক্ষে আইনজীবী আসিফ ও মৌয়ের পক্ষের আইনজীবী শহীদুল ইসলাম সিদ্দিকী রিমান্ড না-মঞ্জুর করে জামিনের আবেদন করেন। তারা দুজনেই তাদের মোয়াক্কেলকে সাজানো মামলায় ফাঁসানো হয়েছে বলে দাবি করেন। অপর দিকে মহানগর দায়রা জজ আদালতের রাষ্ট্রপক্ষের প্রধান কৌঁসুলি আবদুল্লাহ আবু ও অন্যরা তাদের আবেদন ও বক্তব্যের বিরোধিতা করেন।
উল্লেখ্য, আপন জুয়েলার্সের কর্ণধার দিলদার আহমেদের ছেলে সাফাত আহমেদের সাবেক স্ত্রী এই পিয়াসা। রেইনট্রি হোটেলে ধর্ষণের ঐ ঘটনার কিছুদিন আগেই সাফাতের সঙ্গে তার ডিভোর্স হয়েছিল। বিভিন্ন সময়ে নানা ঘটনায় আলোচনায় আসেন পিয়াসা। ২০১৭ সালের মে মাসে বনানীর রেইনট্রি হোটেলে বিশ্ববিদ্যালয়ের দুই ছাত্রী ধর্ষণের শিকার হয়েছিলেন। এ ঘটনায় দায়ের হওয়া মামলার এজাহারে নাম ছিল ফারিয়া মাহাবুব পিয়াসার। সর্বশেষ গুলশানের অভিজাত ফ্ল্যাট থেকে মোসারাত জাহান মুনিয়া নামে এক তরুণীর লাশ উদ্ধারের পর যে মামলা হয়েছিল, তাতেও পিয়াসার নাম ছিল।
