প্লাস্টিক-পলিথিনের গ্রাস!

আপডেট : ০৩ আগস্ট ২০২১, ২১:১১

জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিবেশবিজ্ঞান বিভাগের এক গবেষণায় ১৫ প্রজাতির দেশি মাছে মাইক্রোপ্লাস্টিক বা প্লাস্টিকের ক্ষুদ্র কণার সন্ধান পাওয়া গিয়াছে। এই সকল প্রজাতির মাছের মধ্যে রহিয়াছে—কালিবাউশ, বেলে, ট্যাংরা, কই, বাটা, রুই, তেলাপিয়া, কমন কার্প, পাবদা, পুঁটি, রয়না, শিলং, বাইন, টাটকিনি ও বাছা। এই সকল মাছ সাধারণত কৃত্রিম উপায়ে মিষ্টি পানির জলাধারে চাষ করা হয়। পরীক্ষাকৃত মাছের ৭৩ দশমিক ৩ শতাংশে প্লাস্টিকের কণা পাওয়া গিয়াছে। এই সকল মাছের মধ্যে ট্যাংরা, টাটকিনি ও রয়না মাছে প্লাস্টিকের পরিমাণ অধিক। এই সকল মাছে পাওয়া গিয়াছে প্লাস্টিক পলিমার হাই ডেনসিটি পলিথিলিন, পলিপ্রপিলিন পলিথিলিন কপোলিমার ও ইথিলিন ভিনাইল অ্যাসিটেটের উপস্থিতি। এই সকল প্লাস্টিক পলিমার দৈনন্দিন ব্যবহূত প্লাস্টিকের বোতল, জুস, শ্যাম্পুর বোতল, প্লাস্টিকের ব্যাগ, কনটেইনার, প্লাস্টিক ও ফোমের জুতা, মোড়ক ইত্যাদি হইতে পরিবেশে প্রবেশ করে। বিশেষত প্লাস্টিক-দূষণের শিকার নদী বা সমুদ্রের মাছ ভক্ষণ করিলে মানবদেহে নানা স্বাস্থ্যঝুঁকি তৈরি করে। সম্প্রতি বঙ্গোপসাগরের সৈকতে মৃত তিমি মাছ ভাসিয়া উঠিতে দেখা যায়। সেই মাছের পরীক্ষানিরীক্ষায়ও প্লাস্টিক কণার উপস্থিতি ধরা পড়িয়াছে।

বর্তমানে নদী বা সমুদ্রের প্লাস্টিক-দূষণ এক ভয়াবহ সমস্যা; কিন্তু এই সমস্যার গভীরতা আমরা সঠিকভাবে উপলব্ধি করিতে পারিতেছি না। কর্ণফুলী নদী চ্যানেলে ক্যাপিটাল ড্রেজিংয়ের সময় সাত মিটার প্লাস্টিক বর্জ্যের স্তর দেখা যায়। ঢাকা শহরের জলাবদ্ধতার মূল কারণ স্যুয়ারেজ লাইনগুলিতে অতিরিক্ত পলিথিন ও প্লাস্টিক বর্জ্যের জট। স্যুয়ারেজ লাইন, নদী ও সমুদ্রসৈকতে প্লাস্টিক বর্জ্য ফেলিবার নাগরিক বদভ্যাস আমাদের যথাসম্ভব দ্রুত পরিহার করা বাঞ্ছনীয়। প্লাস্টিক বর্জ্যের পাশাপাশি কলকারখানা হইতে নির্গত রাসায়নিক তরল ও ভারী বর্জ্য অপরিশোধিত অবস্থায় সরাসরি নদী বা সমুদ্রে ফেলিবার বেপরোয়া মনোভাবও বন্ধ করিতে হইবে। জানা মতে, বাংলাদেশ এক বত্সরে ৮ লক্ষ টন প্লাস্টিক বর্জ্য সৃষ্টি করে। প্রায় ৭৩ হাজার টন প্লাস্টিক বর্জ্য প্রতিদিন সমুদ্রে মিশে পদ্মা, মেঘনা ও যমুনা নদীর মাধ্যমে। আমাদের দেশে গত ২০ বত্সরে প্লাস্টিকের ব্যবহার বাড়িয়াছে ২০ গুণ। শুধু বাংলাদেশ নহে, সারা বিশ্বে প্লাস্টিকের ব্যবহার বাড়িতেছে নাটকীয়ভাবে। বিশ্বের সাগর-মহাসাগরে প্রতি বত্সর প্রায় ৮০ লক্ষ টন প্লাস্টিক বর্জ্য জমিতেছে। এখন কার্টুনে দেখা যায়, খাবার প্লেটে আমরা মাছ না খাইয়া খাইতেছি প্লাস্টিক! ব্লু-ইকোনমিকে আমরা গুরুত্ব দিতেছি; কিন্তু সমুদ্রদূষণ লইয়া আমাদের তেমন মাথাব্যথা নাই।

আমাদের জীবনযাত্রায় প্লাস্টিকের পণ্য আজ অবিচ্ছেদ্য অংশ হইয়া গিয়াছে, যাহা খুবই বিপজ্জনক। যেহেতু প্লাস্টিকের বর্জ্য নদীর মাধ্যমে সাগরের মোহনায় জমা হয় এবং সমুদ্রের স্রোত এই বর্জ্য বিভিন্ন দেশের দূরদূরান্তে লইয়া যায়, তাই প্লাস্টিক পণ্যের ব্যবহার কমাইতে পূর্বে বিশ্বনেতৃবৃন্দকে কার্যকর উদ্যোগ লইতে হইবে। জাতিসংঘের মতে, বিশ্বব্যাপী কমপক্ষে ৮০০ প্রজাতি সামুদ্রিক ধ্বংসাবশেষ দ্বারা ক্ষতিগ্রস্ত হইয়াছে যাহার ৮০ শতাংশই প্লাস্টিকের। এমন দূষণ রোধের জন্য ২০০৬ সালের ২৪ মার্চ বিভিন্ন দেশ লন্ডন প্রটোকলে স্বাক্ষর করে। ইউরোপীয় ইউনিয়নভুক্ত দেশসমূহে এই বত্সর হইতে প্লাস্টিক দিয়া তৈরি পণ্য ও একবার ব্যবহারযোগ্য প্লেট, গ্লাস, কাপ, বেলুন স্টিক, কটনবাড ইত্যাদি ব্যবহার নিষিদ্ধ ঘোষণা করা হইয়াছে। বাংলাদেশে ২০০২ সালে পরিবেশ সংরক্ষণ আইন সংশোধনপূর্বক পলিথিনের উত্পাদন ও বাজারজাত নিষিদ্ধ করা হইয়াছে; কিন্তু তাহা কতটা বাস্তবায়িত হইতেছে তাহাই বড় প্রশ্ন। প্লাস্টিক ও পলিথিনের ব্যবহার বন্ধে নগর কর্তৃপক্ষ, শিল্প ও পরিবেশ অধিদপ্তরসহ সংশ্লিষ্ট সকল পক্ষকে জিরো টলারেন্স নীতি গ্রহণ করিতে হইবে। প্লাস্টিক পণ্য ও পলিথিন উত্পাদন, ব্যবহার, বিপণন ও রিসাইক্লিং প্রক্রিয়া সম্পর্কে আরো অধিক সরকারি নজরদারি ও নিয়ন্ত্রণ আরোপের সিদ্ধান্ত লইতে হইবে।