তানভীর তারেক
এক অদ্ভুত সামাজিক ও সাংস্কৃতিক সমাজ তৈরি হয়েছে এই যুগে। ‘সামাজিক মাধ্যম’ বলতে যে যে অ্যাপসগুলোর ব্যবহার বুঝায় এখন বরং সেখানেই চলছে সর্বাধিক অসামাজিক কার্যকলাপ। ফেসবুক, ইউটিউব, টিকটকের এই যুগে মননশীল কোনোকিছু খুঁজে পাওয়া মুশকিল। সেখানে বিভিন্ন ফিকশন নির্মাতাদের কাজের ব্যাপারে নৈতিকতা বা সামাজিক দায়ের প্রশ্ন করলে উল্টো জবাবে বলেন, ‘বিনোদন নিতে নাটক, অনুষ্ঠান দেখতে এসে মেসেজ খোঁজেন ক্যান ভাই?’ তাই এ সকল নির্মাতাদের অন্তঃসার শূন্য ভাঁড়ামিতেই সম্প্রতি বেশ কিছু নাটকেও জনপ্রিয় তারকাদের অভিনয়ে সমাজে ভুল মেসেজ চলে গেছে! এত এত অবক্ষয়ের ইন্ডাস্ট্রিতে স্বস্তির নাম ‘ইত্যাদি’।
হানিফ সংকেতের ‘ইত্যাদি’র ট্যাগলাইনে লেখা থাকে ‘শিক্ষা ও বিনোদনমূলক অনুষ্ঠান’। যে অনুষ্ঠানটি গত কয়েক যুগ ধরে বিনোদনের শ্রেষ্ঠ সম্ভার হিসেবে সমাজে দিক-নির্দেশনা দিয়ে আসছে। অথচ নৈতিকতার প্রশ্নে এক চুল পরিমাণ ছাড় দিতে হয়নি। দর্শক কী খাবে? কী খাবে না? সেই প্রশ্ন তার চিন্তায় রাখতে হয়নি। ঠিক একইভাবে সমসাময়িক থাকার যে অনবদ্য প্রচেষ্টা সেটিও দেখিয়েছে এই অনুষ্ঠান।
ইত্যাদিই প্রথম কোনো অনুষ্ঠান, যার মাধ্যমে এমন বড়মাপের আয়োজন স্টুডিওর বাইরে সেট ফেলে করার প্রচলন শুরু হয়। এরপর থেকে বেশ ক’টি চ্যানেল তাদের নিজস্ব ইভেন্ট বা অনুষ্ঠানেও এর অনুকরণ শুরু করে। আফসোস! চেষ্টা করেও কেউ ইত্যাদি’কে ঠিকঠাক নকল করতে পারলো না! এবারের ইত্যাদি ছিল উত্তরায় প্রতিষ্ঠিত মেট্রোরেল স্টেশনের সামনে সুসজ্জিত সেটে ধারণকৃত। সামনের চেয়ারগুলো ছিল ফাঁকা। অথচ বিভিন্ন সেগমেন্টের পর যে দর্শকদের করতালিতে সমস্বরিত হয়, সেই শব্দও ছিল অনুষ্ঠানে। হানিফ সংকেত বলেন, ‘এই করতালি আপনাদের মনের ভেতরে যা বেজে ওঠে তারই প্রতিফলন।’ সত্যিই তাই! সামনে পুরো গ্যালারি জুড়ে ফাঁকা চেয়ার রেখে অনুষ্ঠান তৈরির এই কনসেপ্ট সত্যিকার অর্থেই দারুণ। এবারের ইত্যাদির সেরা সেগমেন্ট ছিল ‘থাপড়া’ নামের এক মেয়ের বিয়ের দৃশ্য। দুটো পরিবারের বিয়ের চিরচেনা দৃশ্যের যে বদল হয়েছে, যে অবক্ষয় চলছে সেটিই এমনভাবে দেখিয়েছেন। যে কেউ মেসেজটাও পাবেন, আবার হাসতে হাসতে পেটে খিলও ধরবে। এ সব স্যাটায়ারে অনবদ্য এক নাম হানিফ সংকেত।
টিকটক, ভাইরাল এই বিষয়গুলো এমনভাবে গ্রাস করেছে যে, সেই বিকৃতি দেখিয়েছেন বেশকিছু সেগমেন্টে। আরো নান্দনিক ও তথ্য নির্ভর ছিল মেট্রোরেল বিষয়ক প্রতিবেদনটি। দীর্ঘ প্রতিবেদনটি ছিল দারুণ সব ভিজ্যুয়াল আর তথ্যে ঠাসা। মেট্রোরেল নিয়ে প্রতিবেদনটি অনুষ্ঠানের মাঝে মাঝে কয়েক ভাগে দেখিয়েছেন, যাতে ইত্যাদির দুরন্তপনা সেগমেন্টের চলনে যেন ব্যত্যয় না ঘটে। এখানেই যেন একজন হানিফ সংকেতের মুন্সিয়ানা। অন্যেরা হয়তো একটানা মেট্রোরেলের তথ্যচিত্র দিয়ে অনুষ্ঠানের মেজাজ অন্যদিকে নিয়ে যেত। কিন্তু ইত্যাদির চৌকষ ব্যাপার হলো রিমোট হাতে আপনি একটানা না দেখে উঠতে পারবেন না। একইভাবে দর্শক পর্ব গ্যালারি শূন্য থাকা স্বত্ত্বেও দারুণভাবে উপস্থাপন করলেন সেটি। বারবার মনে হবে, এভাবেও তো অনুষ্ঠান করা যায় নিয়মিত! পুরো অনুষ্ঠানটি দেখে মনেই হলো না কোনো দর্শকবিহীন একটু অন্যরকম ইত্যাদি দেখছি। তবে জামিল ও কাশেম টিভির প্রতিবেদনটিতে বিভিন্ন শহুরে রিসোর্টে গ্রামীণ পরিবেশের যে বিষয়টি বোঝাতে চেয়েছেন তার একটা ভিজ্যুয়াল খুব প্রয়োজন ছিল স্পষ্টতার জন্য। হয়তো করোনাকালীন এই সংকটের কারণেই একটি ঘরেই সেটি সারতে হয়েছে। মামা ভাগ্নে সেগমেন্টে খুব করে মিস করেছি আব্দুল কাদেরকে! গানের ক্ষেত্রে সাম্প্রতিক তুমুল জনপ্রিয় রিমেক ‘দামান’ গানটি নিয়ে দারুণ এক তথ্য দিলো ইত্যাদি। একইসঙ্গে সেই ভাইরাল হওয়া ত্রয়ী ডাক্তারদেরও সেটে এনে সম্মান জানালেন। মূল শিল্পীকে দিয়ে আরো একটি গানের চিত্রায়ণও ছিল বোনাস প্রাপ্তি। আর ইত্যাদির গানের ক্ষেত্রে ড্যান্সট্রুপ হিসেবে যারা এ যাবত্ কাজ করেছে তারা এই প্লাটফর্ম থেকেই অনেকে বিখ্যাত হয়ে পরবর্তীতে প্রাতিষ্ঠানিক সাফল্য দেখিয়েছেন। এমন উদাহরণ অনেক।
হানিফ সংকেতের মতো এক দারুণ জহুরি চোখে নির্মাণ একটি ম্যাগাজিন অনুষ্ঠান তাই শুধু একটি অনুষ্ঠানের ব্র্যাকেটে আটকে থাকে না। প্রতিটি সেগমেন্টে কিছু না কিছু মেসেজ দিয়ে যায়। তার জন্য যে মেধা খরচ করে গবেষণাপ্রসূত প্রক্ষেপণ প্রয়োজন। এই কাজটিই এখন অন্য অনেক অনুষ্ঠানে নেই। এ কারণেই দ্বিতীয় কোনো অনুষ্ঠান আর হয়ে উঠল না দেশে এমন নান্দনিক। হয়তো ইত্যাদির দেখাদেখি আরো দ্বিগুণ বাজেটের সেট, আলোকসজ্জা দিয়ে কেউ ইভেন্ট সাজিয়েছে, কিন্তু মেধার প্রয়োগ, বিনোদনের পাশাপাশি সামাজিক দায়বোধের জায়গাটা যে প্রতিটি ক্ষেত্রে জরুরি, এই মূর্খতার কাছেই হেরে যায় সবাই একজন হানিফ সংকেতের কাছে।
গ্রিস ভ্রমণের ধারাবাহিক প্রতিবেদন প্রকাশ পাচ্ছে ইত্যাদিতে। তবে এবারের অলিম্পিক ও গ্রিস নিয়ে যে প্রতিবেদনটি তিনি দেখালেন তা দেখে বিষ্মিত চোখের পাতার দূরত্ব ক্রমশ বেড়ে যায়! এ সময় যে সকল তরুণ ভ্লগ নির্মাণের যথেচ্ছাচার করেন, অ্যারোপ্লেনের ভেতরে খাবার দেখাতে দেখাতে অর্ধেক সময় পার করেন, তারা এসব দেখে শিক্ষা নিতে পারেন যে কীভাবে ভ্লগ নির্মাণ করতে হয়! হানিফ সংকেত শেষটা করেছেন দেশের সবচেয়ে সুকণ্ঠিকে দিয়ে। সাবিনা ইয়াসমিনের মতো বরেণ্য শিল্পীর গান ও তার পরিবেশনাটা ছিল যেন ভরপুর বিরিয়ানী খাবার পর সুস্বাদু ডেজার্ট। প্রতিবারই ইত্যাদি নিয়ে একটা শঙ্কার কথা লিখতে চাই আমি। তা হলো-এই যে, কোনো উত্তরসুরি নেই। অনুকরণশীল সমাজে ভালো কিছুকে নকল করতে গিয়েও লেজে গোবরে করে দিচ্ছি আমরা, সেখানে সত্যিকার অর্থেই টিভি, সিনেমা, ইউটিউব, ওটিটি, টিকটকসহ যত মাধ্যম আছে সেখানে ইত্যাদির মতো মননশীল কাজের ধারাবাহিকতা আর কেউ ধরে রাখতে পারলো না। এটা আমাদের সাংস্কৃতিক কর্মীদের ভাবনায় রাখা উচিত। বিনোদন বা সৃজনশীল মেধায় আপনি যা-ই করেন, সেখানে আপনার অন্তর্নিহিত মেসেজ থাকতে হবে। এর কোনো অন্য যুক্তি হতে পারে না। ধন্যবাদ হানিফ সংকেত। ধন্যবাদ টিম ইত্যাদি।
