ধানের জিন পরিবর্তন করে ‘গোল্ডেন রাইস’

আপডেট : ০৬ ফেব্রুয়ারি ২০১৯, ২২:৩১

ভুট্টা ও মাটির এক ধরনের ব্যাকটেরিয়া থেকে নেয়া জিন ব্রিধান ২৯ এর জিনোমে প্রবেশ করিয়ে তৈরি করা হয়েছে ‘গোল্ডেন রাইস’ বা ‘সোনালি ধান’। সাধারণ ধানের রঙ সাদা হলেও এই ধরনের ধানের রঙ হবে সোনালি। বিটা ক্যারোটিন থাকায় এই ধানের রঙ এমন হয়। মানুষের ভিটামিনের চাহিদা পূরণের লক্ষ্যেই এ ধরনের ধান কৃষকদের মাঝে ছড়িয়ে দিতে চায় ধান গবেষণা ইনস্টিটিউট (ব্রি)। যদিও পরিবেশ রক্ষায় যারা আন্দোলন করছেন তারা এ ধান বাংলাদেশে আবাদের বিরোধিতা করছেন।

ব্রির একদল গবেষক এ ধরনের ধান নিয়ে গবেষণা করেছেন অন্তত ১৩ বছর ধরে। ইতোমধ্যে দেশের বিভিন্ন মাঠে পরীক্ষামূলক আবাদও করা হয়েছে। আর মানবদেহের জন্য ক্ষতিকর কিনা তাও যাচাই করা হয়েছে গবেষণাগারে। এখন ন্যাশনাল কমিটি অব বায়োসেফটি এবং নিরাপদ খাদ্য হিসেবে স্বীকৃতি পাওয়ার জন্য অপেক্ষা করছেন গবেষকরা। এই দুই ধাপের অনুমোদন পেলে শুরু হবে নতুন জাত হিসেবে স্বীকৃতি পাওয়ার কর্মযজ্ঞ। আর পরে যাবে মাঠপর্যায়ে কৃষকদের কাছে।

গবেষকরা বলছেন, বিটা ক্যারোটিন বা ভিটামিন-এ ঘাটতি রাতকানা রোগের প্রধান কারণ। তা ছাড়া ভিটামিন-এ ঘাটতি মানবদেহে রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা হ্রাস করে ফলে শিশুদের সংক্রামক ব্যাধিজনিত মৃত্যুঝুঁকি বৃদ্ধি পায়। যদি ধানে বিটা ক্যারোটিন যুক্ত করা যায় তাহলে মানুষের শরীরে ভিটামিন-এ এর অভাব অনেকটাই দূর করা সম্ভব। এ ধারণা থেকেই ধানের জিন পরিবর্তনের চিন্তা-ভাবনা। বিজ্ঞানীরা বলছেন, গোল্ডেন রাইস মূলত ব্রিধান, যার মধ্যে বিটা ক্যারোটিন আছে। বিটা ক্যারোটিন ‘ভিটামিন এ’ এর আগের ধাপ। যা খাওয়ার পর ‘ভিটামিন এ’ তে রূপান্তরিত হয়।

গোল্ডেন রাইস নিয়ে ২০০৬ সাল থেকে গবেষণা শুরু হলেও সাফল্য আসেনি। ২০১২ সালে নতুন করে গবেষণা শুরু হয়। গবেষকদের বিভিন্ন ধরনের প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়। গোল্ডেন রাইস বিষয়ে উচ্চশিক্ষার জন্য বিদেশেও পাঠানো হয় তাদের।

গোল্ডেন রাইস গবেষক ড. পার্থ সারথী বিশ্বাস বলেন, আমরা মাঠপর্যায়ে পরীক্ষা করেছি। এ ধানের মাধ্যমে পরিবেশ ক্ষতিগ্রস্ত হয় এমন কোনো প্রমাণ পাইনি। এ সংক্রান্ত যে তথ্য পেয়েছি তা ন্যাশনাল কমিটি অব বায়োসেফটির কাছে পাঠিয়েছি। এই প্রতিষ্ঠানটি পরিবেশগতভাবে গোল্ডেন রাইস ক্ষতিকর কীনা তা যাচাই করে সনদ দেবে। তিনি বলেন, এ ধানের পুষ্টিমানও পরীক্ষা করে দেখা হয়েছে। পুষ্টির কোনো ঘাটতি নেই। এখন মানুষকে খাওয়ানোর পর এটাকে নিরাপদ খাদ্য বলা যাবে। নিরাপদ খাদ্য হিসেবে সনদও লাগবে। তিনি জানান, সব প্রক্রিয়া শেষে কৃষকদের কাছে ২০২১ সালের মধ্যে এ ধান পৌঁছবে। এর আগে নতুন জাত হিসেবে অনুমোদন দেবে মন্ত্রণালয়। তিনি উল্লেখ করেন, ব্রিধান ২৯ এর মতো এই ধানের ফলনও ৭ টন। জীবনকালও একই।

আন্তর্জাতিক ধান গবেষণা ইনস্টিটিউটের (ইরি) কনসালটেন্ট ও ব্রির প্রাক্তন মহাপরিচালক ড. জীবন কৃষ্ণ বিশ্বাস বলেন, জেনিটিক্যালি মডিফাইড এ আমাদের যেতেই হবে। এর বিকল্প নেই। আমরা গবেষণায় দেখেছি, এ ধানে ক্ষতিকর কিছুই নেই। আমেরিকা, ফিলিপাইন, সুইজারল্যান্ডে এ ধান নিয়ে ব্যাপক গবেষণা হয়েছে। সেখানের রিপোর্ট ভালো, খারাপ কিছু মেলেনি। এসব তথ্য পরিবেশ মন্ত্রণালয়কে পাঠানো হয়েছে।

তবে পরিবেশ রক্ষা আন্দোলনকারীরা বলছেন, এ ধানের মাধ্যমে আমাদের নিজস্ব জাতের ধানের মালিকানা হারানোর আশঙ্কা যেমন আছে তেমনি এই জাতের কার্যকারিতা, জৈব প্রাপ্যতা এবং জৈব নিরাপত্তা এখনও নিশ্চিত নয়। বহুজাতিক এগ্রো করপোরেশনের দাবিকেই সত্য ধরে নিয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে চরম ভুল পদক্ষেপ। গোল্ডেন রাইসের জৈব প্রাপ্যতা, কার্যকারিতা এবং বায়োসেফটি বিষয়ে পর্যাপ্ত স্বাধীন গবেষণা না করে এই রাইস বাজারজাতকরণ করা ঠিক হবে না।