পিনাক-৬ লঞ্চডুবি : দোষীদের বিচার হয়নি সাত বছরেও

আপডেট : ০৫ আগস্ট ২০২১, ০০:২২

পিনাক-৬ লঞ্চডুবির ঘটনায় সরকারি হিসেবে ৪৯ জন যাত্রীর লাশ উদ্ধার হয়। আর  নিখোঁজ রয়েছেন ৫৩ জন। সাত বছর আগের এই দুর্ঘটনার ক্ষত এখনো শুকায়নি স্বজনদের মন থেকে। এ দুর্ঘটনার জন্য দায়ীদের বিচার না হওয়ায় তারা ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন। এ ঘটনায় দায়ের করা দুটি মামলার আসামিরা রয়েছেন জামিনে।

লঞ্চে ওঠার আগে স্বর্ণা হিরাসহ তিন বোনের তোলা সেলফিটিই তাদের স্মৃতি মনে করার একমাত্র মাধ্যম। ফরহাদদের পরিবারের চার জন ছিল লঞ্চে; কিন্তু সেই চার জনের কারোরই লাশ পাওয়া যায়নি। নেই কোনো ছবিও। নিখোঁজ অর্ধ শতাধিক পরিবারের কাউকেই দেওয়া হয়নি কোনো অনুদান। আর অজ্ঞাত হিসেবে ২১ জনের লাশ দাফন হলেও ডিএনএ নমুনাই রয়ে গেছে। মেলেনি পরিচয়। আজও সন্ধান মেলেনি লঞ্চটিরও।

উদ্ধারকৃত ৪৯টি লাশের মধ্যে ২৮টি লাশ পরিবারকে বুঝিয়ে দেওয়া হয়। আর ২১ জনকে শিবচর পৌর কবরস্থানে বেওয়ারিশ হিসেবে দাফন করা হয়। রেখে দেওয়া হয় ঐ ২১ জনের ডিএনএ টেস্টের নমুনা।

২০১৪ সালে ঈদুল ফিতরের পর ৪ আগস্ট ধারণক্ষমতার অতিরিক্ত আড়াই শতাধিক যাত্রী নিয়ে শিবচরের কাওড়াকান্দি ঘাট থেকে ছেড়ে যাওয়া পিনাক-৬ লঞ্চটি পদ্মার উত্তাল ঢেউয়ের কবলে পড়ে মাওয়ার অংশে ডুবে যায়।

শিবচর পৌর এলাকার নুরুল হক মিয়ার ঢাকার শিকদার মেডিক্যালে পড়ুয়া মেয়ে নুসরাত জাহান হিরা ও রাজধানীর বীরশ্রেষ্ঠ নূর মোহাম্মদ কলেজের ছাত্রী ফাতেমাতুজ জোহরা স্বর্ণা এবং স্বর্ণার খালাতো বোন চীনের জইনুস মেডিক্যাল কলেজের ছাত্রী শরীয়তপুরে গঙ্গানগর এলাকার জান্নাতুল নাঈম লাখী দুর্ঘটনায় মারা যান। কিন্তু দুই বোনের লাশ উদ্ধার হলেও ফাতেমাতুজ জোহরা স্বর্ণার লাশ পাওয়া যায়নি।

এছাড়া শিবচর উপজেলার বন্দরখোলা গ্রামের বৃদ্ধা রিজিয়া বেগমের ছেলে মিজানুর রহমান, পুত্রবধূ রোকসানা বেগম, আড়াই বছর বয়সের নাতি মাহিন এবং এগার বছর বয়সের নাতনি মিলিসহ চার জন নিখোঁজ হন।

দুর্ঘটনার পরপরই মুন্সীগঞ্জের লৌহজং থানা ও মেরিন কোর্টে দুইটি মামলা হয়। আসামিরা গ্রেফতার হলেও আদালত থেকে জামিনে রয়েছেন।

নিহত হিরা ও স্বর্ণার বাবা ঐ লঞ্চের যাত্রী নূরুল ইসলাম মিয়া বলেন, লঞ্চের মালিকসহ ঘাটসংশ্লিষ্টদের দায়িত্বে অবহেলার কারণে লঞ্চটি ডুবে যায়। আমার মেয়েসহ অনেক যাত্রী নিহত ও নিখোঁজ হয়। এ ঘটনার সাত বছরেও দোষীদের কোনো বিচার হলো না। গ্রেফতার হলেও তারা জামিনে ঘুরে বেড়াচ্ছে। সরকার যদি দ্রুত দোষীদের বিচার সম্পন্ন না করে তাহলে এমন দুর্ঘটনা ঘটতেই থাকবে। আমরা এ ঘটনার দ্রুত বিচার চাই।

বিআইডব্লিউটিএর কাঁঠালবাড়ি ঘাট পরিদর্শক আক্তার হোসেন বলেন, পিনাক-৬ লঞ্চডুবির পর এ নৌরুটে ব্যাপক পরিবর্তন হয়েছে। আগে একজন পরিবহন পরিদর্শক তিনটি ঘাটের দায়িত্ব পালন করত। পিনাক দুর্ঘটনার পরে প্রতিটি ঘাটে একজন করে কর্মকর্তা নিয়োগ দেওয়াসহ অনেক ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে।

শিবচর পৌরসভার মেয়র আওলাদ হোসেন খান বলেন, অজ্ঞাত ২১ জনের লাশ পৌর কবরস্থানে দাফন করা হয়। এ লাশগুলোর ডিএনএ নমুনা সংরক্ষণ করা হয়েছে। কিন্তু পরে আর কেউ লাশ শনাক্তের জন্য আসেনি।

শিবচর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা আসাদুজ্জামান বলেন, পিনাক-৬ লঞ্চডুবিতে অনেকে প্রাণ হারিয়েছেন। অনেকে নিখোঁজ রয়েছেন। তবে এ দুর্ঘটনার পর থেকে এ নৌরুটে প্রশাসনের পক্ষ থেকে কঠোর নজরদারি রাখা হচ্ছে। এমন দুর্ঘটনা যাতে আর না ঘটে তাই লঞ্চের চালকদের জন্য প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করা হয়েছে। ঘাট ব্যবস্থাপনার উন্নয়ন করা হয়েছে। কোনোভাবেই লঞ্চে ধারণক্ষমতার অতিরিক্ত যাত্রী বহন করতে দেওয়া হচ্ছে না। কেউ আইন অমান্য করলে সঙ্গে সঙ্গে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে।