দেশে করোনা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে চলমান কঠোর বিধিনিষেধের মেয়াদ আরেক দফা বাড়ানো হয়েছে। আগামী ১০ আগস্ট পর্যন্ত বিধিনিষেধ চলমান থাকবে। কিন্তু বিধিনিষেধ বাড়ানো হলেও রাজধানী ফিরছে সেই চেনা রূপে। জনসাধারণ প্রয়োজনে যেমন ঘর থেকে বের হচ্ছে, তেমনি বিনা কারণেও বের হচ্ছে। প্রধান সড়কগুলোতে গণপরিবহন না চললেও অবাধে চলাচল করছে ব্যক্তিগত গাড়ি মোটরসাইকেল, রিকশা। অন্যদিকে কঠোর বিধিনিষেধের শুরুতে কড়াকড়ি ছিল পুলিশের চেকপোস্টগুলোতে, তবে এখন তা দেখা যাচ্ছে না। গতকাল রাজধানীর বিভিন্ন অঞ্চল ঘুরে লকডাউনের এমন চিত্র দেখা গেছে।
তেজগাঁও শিল্পাঞ্চল থেকে রিকশায় মতিঝিলে অফিসে এসেছেন আশিকুর রহমান। তিনি বলেন, ‘তেজগাঁও থেকে মতিঝিলে আসতে ২০০ টাকা রিকশা ভাড়া দিতে হয়েছে। মোটরসাইকেলে এলে খরচ আরো কম হতো। তবে চেকপোস্টে মাঝেমধ্যে মোটরসাইকেল দাঁড় করিয়ে চেক করে পুলিশ। রিকশায় এলে এই ঝামেলায় পড়তে হয় না। তাই বাড়তি ভাড়া দিয়ে রিকশায় এসেছি।’
রাজধানীর কাঁঠালবাগান থেকে মোটরসাইকেলে দিলকুশায় অফিসে আসা জিনান মাহমুদ বলেন, ‘ব্যাংকে চাকরি করার কারণে নিয়মিত অফিসে আসতে হয়। শাহবাগ মোড়ে পুলিশের চেকপোস্ট আছে, তাই শাহবাগ মোড়ে না গিয়ে ভেতর দিয়ে আসি। এখনো কোথাও কোনো সমস্যায় পড়িনি।’
তিনি আরো বলেন, ‘চলমান লকডাউনের শুরুর দিকে রাস্তায় মানুষের চলাচল তুলনামূলক অনেক কম ছিল। কিন্তু দিন যত যাচ্ছে, মানুষের চলাচল তত বাড়ছে। তবে বাস না চলায় রাস্তায় তেমন যানজট নেই। অল্প সময়ের মধ্যেই অফিসে চলে আসতে পারি এবং বাসায় ফিরতে পারি।’
তেজগাঁও শিল্পাঞ্চল এলাকার রিকশাচালক আবুল হোসেন বলেন, ‘চলমান লকডাউনের প্রথম দিকে মাঝেমধ্যে পুলিশ হয়রানি করত। ভয়ে ভয়ে রিকশা চালাতাম। গত কয়েক দিন ধরে পুলিশ কিছু বলে না। যাত্রী নিয়ে সহজেই রাস্তায় চলাচল করতে পারছি। আগের তুলনায় রাস্তায় মানুষের চলাচল অনেক বেড়েছে।’
মগবাজার এলাকায় ট্রাফিকে দায়িত্ব পালন করা এক পুলিশ সদস্য বলেন, এক সপ্তাহ আগের তুলনায় এখন রাস্তায় মানুষের চলাচল বেড়েছে, এটা সহজেই বোঝা যাচ্ছে। ব্যাংক, বিমা, আর্থিক প্রতিষ্ঠানের পাশাপাশি এখন গার্মেন্টস কারখানা খুলে দেওয়া হয়েছে। এতে স্বাভাবিকভাবে মানুষের চলাচল বেড়েছে। স্বাভাবিক সময়ের মতো যানজট নিয়ন্ত্রণে আমাদের হয়তো অত বেগ পেতে হয় না, কিন্তু নিয়মিত ট্রাফিকের দায়িত্ব পালন করতে হয়। কারণ এই মোড়ের সব রাস্তায়ই গাড়ি চলাচল করছে।
রাজধানীর বাজারগুলোতে দেখা গেছে মানুষের ভিড়। তবে তাদের বেশির ভাগকে স্বাস্থ্যবিধি মানতে দেখা যায়নি। সেগুনবাগিচার ভেতরে প্রতিদিন খোলা রাস্তার ওপর বসে তেমনি একটি কাঁচাবাজার।
মোহাম্মদপুরের শিয়া মসজিদ এলাকার একটি জেনারেল স্টোরের কর্মচারী মো. আতিক বললেন, ‘এখন কি লকডাউন আছে? পুলিশের গাড়ি মাঝে মাঝে সাইরেন বাজায়। তখন সামনের শাটার বন্ধ করি। পাশেরগুলা খোলাই থাকে। রাস্তায় সিএনজি আর বাস কম বলে একটু ফাঁকা লাগছে। আর কোনোভাবে লকডাইন আছে বলে মনে হয়?’ পাশের দোকানমালিক বেলালও প্রায় একই কথা জানালেন। তিনি উলটো প্রশ্ন করলেন, ‘কোথায় লকডাউন? সব তো খোলা। মানুষ তো অফিসে যাচ্ছে। তাই আমার কাছে কাপড় আসছে ধোয়া কিংবা ইস্ত্রি করার জন্য। দোকান তো এখন খোলা রাখতেই হবে।’ মিরপুরের রূপনগর, পল্লবী, আরামবাগসহ বিভিন্ন এলাকা ঘুরে দেখা গেছে, শিল্পকারখানা খুলে দেওয়ায় সাধারণ মানুষের চলাফেরা প্রায় স্বাভাবিক সময়ের পর্যায়ে এসে গেছে। নিত্যপণ্যের দোকান, হোটেল-রেস্তোরাঁসহ অন্যান্য দোকান পুরো শাটার খুলে দিয়ে বেচাকেনা করছে। এই এলাকায় বইয়ের দোকান থেকে হার্ডওয়্যারসহ প্রায় সব ধরনের দোকান খোলা রয়েছে।
যে যেভাবে পারছে রাজধানীতে ঢুকছে
কঠোর বিধিনিষেধেও আটকানো যাচ্ছে না রাজধানীতে মানুষের প্রবেশ। দেশের বিভিন্ন জেলা থেকে ট্রাক, পিকআপ ও প্রাইভেট কারে করে আমিনবাজারে আসছে মানুষ। সেখান থেকে হেঁটে গাবতলী ব্রিজ পার হয়ে তারা রাজধানীতে প্রবেশ করছে। হেঁটে এলে কোনো ধরনের বাধার সম্মুখীন হচ্ছে না কেউ। তবে মুখে মাস্ক না থাকলে আটকানো হচ্ছে পুলিশের চেকপোস্টে। গতকাল বুধবার আমিনবাজার ও গাবতলী এলাকা ঘুরে এমন চিত্র দেখা গেছে।
সরেজমিনে দেখা যায়, কর্মস্থলে যোগ দিতে যে যেভাবে পাড়ছে রাজধানীতে ঢুকছে। তবে পরিবহন বন্ধ থাকায় ভোগান্তিতে পড়তে হচ্ছে সাধারণ মানুষকে। কেউ রিকশা-ভ্যানে, আবার কেউ হেঁটেই গন্তব্যে ছুটছে।
ফরিদপুর থেকে আসা রাতুল একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে চাকরি করেন। তিনি বলেন, ‘এত দিন অফিস বন্ধ ছিল। অফিস থেকে ফোন দিয়ে দ্রুত ঢাকায় আসতে বলা হয়েছে। এজন্য ভেঙে ভেঙে চলে এসেছি। গাড়ি না চলায় অতিরিক্ত ভাড়া দিয়ে আসতে হয়েছে।’
গাবতলী ব্রিজে দায়িত্বরত পুলিশের এক কর্মকর্তা বলেন, ‘আজ (গতকাল) গাড়ির চাপ কম, তবে সাধারণ মানুষ বেশি। যারা হেঁটে আসছেন, তাদের আমরা সেভাবে কিছু বলছি না। তবে মাস্ক না পরলে আটকানো হচ্ছে। এর বাইরে প্রতিটি গাড়ি রাজধানীতে ঢোকার যথাযথ কারণ জানতে চাইছি। জরুরি প্রয়োজন ছাড়া বের হলেই মামলা দেওয়া হচ্ছে।
