হিমালয়ের কোল ঘেঁষে দাঁড়িয়ে থাকা শৈল শহরের রানি দার্জিলিংয়ের কালিম্পং—রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর ভ্রমণ করেছেন এবং অনেক সময় কাটিয়েছেন; কবিতা লিখেছেন।
দার্জিলিংয়ের ৫০ কিলোমিটার পূর্বে কালিম্পং, ছোট্ট শহর। ১২০০ মিটার উচ্চতায় অবস্থিত। কালিম্পং শব্দের মধ্যেই এর ইতিহাস লুকিয়ে আছে। এই শহরে এক সময় ভুটানের রাজ্যপালের কেন্দ্রীয় দফতর ছিল। ‘কালিম’ শব্দের অর্থ ‘রাজার মন্ত্রী’ এবং ‘পং’ শব্দের অর্থ ‘ক্ষমতার কেন্দ্র’। শৈবালদামের ওপর পা ফেলে সোনালি ওক গাছের ঘন অরণ্যের মধ্য দিয়ে হেঁটে যাওয়া কালিম্পংয়ের অন্যতম আকর্ষণ।
দার্জিলিং সমতল ভূমি থেকে ৭১০০ ফিট ওপরে, সুন্দর ও স্বাস্থ্যকর শহর। ১৯০৫ সালের প্রতিষ্ঠিত সেন্ট্রাল হেরিটেজ রির্সোট অ্যান্ড স্পা-তে রাতে থাকার ব্যবস্থা হলো। অক্টোবর মাস। তবু তীব্র শীত। সকালেই বের হই। জিপের চালক পাহাড়ি। বাংলা, ইংরেজি, হিন্দি সব ভাষায় পারদর্শী। সাবধানে গাড়ি চালিয়ে জিগজাগ রাস্তা পার হচ্ছে। সারি সারি পাইন, ওক গাছ, ফুলের বাগান, সুন্দর সাজানো বাড়িঘর মাঝে মাঝে সেনানিবাস ছাড়িয়ে কালিম্পং পৌঁছলাম। যাব রবীন্দ্রনাথের স্মৃতিবিজড়িত গৌরিপুর হাউজে। কবি যখন ‘মংপো’ (দার্জিলিংয়ের রবীন্দ্র স্মৃতিমাখা জায়গা)-তে যেতেন, সেই সময় এই গৌরিপুর হাউজে অবস্থান করতেন। বাংলোটি কবির খুব প্রিয় ছিল। বাংলোর ঝুলবারান্দায় বসে পাহাড় দেখতেন। তিনি ১৯৩৮ সালের ২৫ এপ্রিল প্রথমবার কালিম্পং যান। উঠেছিলেন গৌরীপুর হাউজে। ‘জন্মদিন’ ছাড়াও এখানে কবি আরো কয়েকটি কবিতা লেখেন। এই বাংলো থেকে ১৩৪৫ বঙ্গাব্দের ২৫ বৈশাখে তাঁর জন্মদিনে কবিতাটি আবৃত্তি করেছিলেন, যা কলকাতার আকাশবাণী থেকে সরাসরি সম্প্রচার হয়েছিল। এটা ছিল আকাশবাণীর প্রথম সরাসরি অনুষ্ঠান। সেই সময়ে নাকি কালিম্পং থেকে কলকাতার টেলিফোন লাইনের সূচনা হয়।
বাংলোতে পৌঁছাতে প্রধান সড়ক থেকে হেঁটে অনেক নিচে নামতে হয়। জীর্ণ হয়ে যাওয়া দেয়াল ঘেরা পুরোনো টিনের ছাউনিতে দুতলা বাড়ি। সুন্দর বারান্দা। সেই বারান্দায় বসে কবি লিখতেন। শ্বেত পাথরে লেখা রয়েছে—‘এই ভবনে কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর বাস করিতেন এবং ২৫শে বৈশাখ ১৩৪৫ সনে জন্মদিন কবিতা আকাশবাণীতে আবৃত্তি করিয়াছিলেন।’ সারা বাড়ি ঘুরে ঘুরে দেখলাম। বাইরে থেকে সব দরজায় তালা লাগানো। অনেক দিন মনে হয় খোলা হয় না। কেয়ারটেকার জানালেন, অনেকদিন ভবনটি অযত্ন-অবহেলায় পড়ে ছিল। দেখলাম বাড়ির সামনে উঠছে বহুতল ভবন, যার কারণে বারান্দায় বসে পাহাড় দেখা আর সম্ভব হবে না। স্থানীয় সচেতন মহলের অনুরোধে পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় এই গৌরিপুর হাউজের সামনে নির্মীয়মান বহুতল ভবনের কাজ থামিয়ে দিয়েছেন। শ্রীবর্ধনের কাজ শুরু হয়েছে। এটি হেরিটেজ কমিশনের আওতায় নেওয়া হয়েছে।
রবীন্দ্রনাথ চারবার কালিম্পংয়ে আসেন। শেষবার আসেন ১৯৪০ সালের ২৯ সেপ্টেম্বর। এ সময় তিনি অসুস্থ হয়ে পড়েন।
