বদলে যাচ্ছে কাশ্মীরের জনজীবন

আপডেট : ০৫ আগস্ট ২০২১, ২১:৪৩

আখরোট, জাফরান, আপেল আর প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের সম্ভার ভারতের জম্মু-কাশ্মীর উপত্যকা জুড়ে। দেশ-বিদেশের পর্যটক ছুটে আসতেন প্রাকৃতিক সৌন্দর্য আর কারুপণ্যের টানে। জঙ্গি কার্যকলাপ, লাগাতার হরতাল আর বয়কটের জেরে কমতে শুরু করে পর্যটক।

শেষ বর্ষায় হিমালয়ের পাহাড়ঘেরা কাশ্মীরি উপত্যকায় ভাসে জাফরান ফুলের সুবাস। সেই সুবাসে হানা দেয় বারুদের গন্ধ। জঙ্গি কার্যকলাপ আর ভারতীয় সেনাবাহিনীর সঙ্গে দ্বন্দ্বে মাসের পর মাস, কখনো বছরভর হরতাল, অবরোধ চেনা ছবি হয়ে ওঠে। স্বাধীন দেশের স্বপ্ন দেখিয়ে অনেক তাজা তরুণকে দলে টেনে নিল জঙ্গিরা। বহু নারী হলেন বিধবা। কাশ্মীরি শালের পসরা নিয়ে ভারতের বিভিন্ন প্রান্তে যেতেন কাশ্মীরি তরুণেরা। লাগাতার হরতাল, বয়কটে সেই সব তরুণ কর্মহারা হতে শুরু করেন। কমতে থাকে আয়। সুযোগ নেয় বিচ্ছিন্নতাবাদীরা। গত কয়েক দশক এই ছিল কাশ্মীরের চেনা ছবি। পাশাপাশি একটি অভিজাত শ্রেণির হাত ধরে সাত দশক ধরে চলেছিল বৈষম্যমূলক নীতির রাজ্যপাঠ।

আকস্মিকভাবে একটি নির্ভুল পদ্ধতির মাধ্যমে ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি ও স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহের যুগলবন্দিতে জম্মু-কাশ্মীরের নাগরিকদের অধিকার প্রতিষ্ঠা পেয়েছে জম্মু-কাশ্মীরের বিশেষ মর্যাদা বিলুপ্তির মধ্য দিয়ে। নিশ্চিত হয়েছে বিভিন্ন সুযোগ-সুবিধা। প্রয়োগ হচ্ছে ভারতের ৮৯০টি কেন্দ্রীয় সরকারি আইন। সামাজিক-রাজনৈতিক সমতা, শিক্ষা, চাকরি, সংরক্ষণ—সব ক্ষেত্রেই সেখানকার বাসিন্দারা সুযোগ পাচ্ছে।

৩৭০ ধারার অবলুপ্তির দ্বিতীয় বর্ষ পূর্তিতে প্রশ্ন উঠেছে, জাতীয় কংগ্রেসসহ বাম, অন্যান্য প্রাদেশিক দলের নেতৃবৃন্দ কেন এই গুরুত্বপূর্ণ আইন অনুমোদন করেনি এবং একটি গোষ্ঠীকে এত দিন ধরে বঞ্চিত হতে হয়েছিল? লক্ষণীয় বিষয়, কাশ্মীরের এই বিশেষ মর্যাদার অবলুপ্তির সঙ্গে জম্মু-কাশ্মীরের মহিলাদের জন্য বৈষম্যমূলক আইনি বিধান, অর্থাত্ ঐ রাজ্যের বাইরে বিয়ে করলে তাদের সম্পত্তির অধিকার খর্ব করা হতো, সেই আইন বন্ধ করা হয়েছে। পৌরসভার ১০ হাজার সাফাই কর্মচারীর সঙ্গে লজ্জাজনক আচরণ করা হতো। তাদের নাগরিকত্ব, শিক্ষার সুযোগ, চাকরি থেকে বঞ্চিত করা হয়েছিল। এখন তারা সব সুবিধা ভোগ করছে। দলিত, অনগ্রসররাও প্রাপ্য অধিকার পেয়েছে। ৩০ বছর আগে কাশ্মীর উপত্যকা থেকে বিতাড়িত কাশ্মীরি পণ্ডিতদের পুনর্বাসন, পাকিস্তানের ২০ হাজারেরও বেশি শরণার্থীকে আবাসিক অধিকার এবং পরিবারপ্রতি ৫.৫০ লাখ টাকা আর্থিক সহায়তা দেওয়া হয়েছে। স্থানীয় সরকারে ১০ হাজার শূন্য পদ পূরণে জম্মু-কাশ্মীর সরকার নিয়োগ শুরু করেছে। আরো ২৫ হাজার পদ পূরণে আরেকটি কর্মসূচি নেওয়া হয়েছে। আবাসিক সার্টিফিকেট প্রদানের সহজ নিয়ম প্রণয়ন করা হয়েছে।

লাদাখকে পৃথক কেন্দ্রশাসিত অঞ্চল করার সিদ্ধান্ত ঐ অঞ্চলের মানুষের কাছে সমাদৃত হয়েছে। এ দুটি কেন্দ্রশাসিত অঞ্চলের আমূল পরিবর্তন কংগ্রেস নেতৃত্বের ব্যর্থতার কথা স্পষ্ট করে দেয়। তাদের সংশোধন করার সাহস ও আত্মবিশ্বাসের অভাব ছিল। তার ফলে জম্মু-কাশ্মীর ভারতীয় ঐতিহ্যের উদার ধর্মনিরপেক্ষ ও গণতান্ত্রিক সত্তা থেকে পৃথক হয়েছিল।

দুই বছর পরে পরিস্থিতি কেমন?

২০১৯ সালের ৫ আগস্ট ভারতের পার্লামেন্টে সংবিধানের ৩৭০ ধারার পাশাপাশি ৩৫এ-রও বিলোপ ঘটে। জম্মু-কাশ্মীর ও লাদাখ দুই কেন্দ্র শাসিত অঞ্চলে পরিণত হয়। এ দুই ধারার মাধ্যমে জম্মু-কাশ্মীর ভারতের অন্য এলাকা থেকে অনেকটাই আলাদা হয়েছিল। এর ফলে অন্য রাজ্যের মানুষ যেমন সেখানে জমি কিনতে পারত না, তেমনি তাদের সেখানে নাগরিকত্বের অধিকারও ছিল না। ১৯৫০ সালে তত্কালীন পশ্চিম পাকিস্তান থেকে বেশ কিছু পাঞ্জাবি ও বাল্মীকি সম্প্রদায়ের মানুষ কাশ্মীরে চলে আসে। তারা নাগরিকত্ব থেকে বঞ্চিত ছিল। কারণ ৩৭০ ধারা তাদের নাগরিকত্বের অধিকার অস্বীকার করত। আবার এই ধারাই কাশ্মীরের মানুষের ভারতের বাকি অংশের সঙ্গে যুক্ত হওয়ায় অন্তরায় হয়ে ছিল। ছিল আলাদা পতাকা। প্রতিরক্ষা, মুদ্রাব্যবস্থা আর পররাষ্ট্র—এই তিন অধিকার ছাড়া সাবেক জম্মু-কাশ্মীর রাজ্য সরকারের হাতে প্রায় সব ক্ষমতাই ছিল। ভারতের পার্লামেন্টের তৈরি করা ৮০ শতাংশ আইনই সেখানে কার্যকর করা যেত না। ভারতে বিনা মূল্যে চাল, গম, ডালের পাশাপাশি নিখরচায় চিকিত্সা, বাসস্থানের মতো সরকারি পরিষেবার সুযোগ পেতে ‘আধার কার্ড’-এর ব্যবহার জরুরি। কাশ্মীরে আধার কার্ডের ব্যবহার হতো না। ফলে গরিব মানুষের কাছে বিনা মূল্যে সরকারি পরিষেবাও পৌঁছাতে পারত না। ফোন, মোবাইলে যোগাযোগ, ইন্টারনেট পরিষেবা ছিল দূর অস্ত। ফলে ব্যবসা-বাণিজ্যে সমস্যা হতো।

বিজেপির দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক অ্যাজেন্ডা ছিল জম্মু-কাশ্মীরে ৩৭০ এবং ৩৫-এ ধারা বিলোপ। ২০১৯ সালে এ দুই ধারার বিলুপ্তি ঘটানোকে অনেকেই তাই রাজনৈতিক চমক হিসেবেই ধরে নিয়েছিলেন। অনেকেই মন্তব্য করেন, হিন্দুত্ববাদী মতাদর্শ কাজে লাগাতে স্থানীয়দের মতামত উপেক্ষা করে কাশ্মীরের বিশেষ অধিকার খর্ব করেছে বিজেপি সরকার। দেশে-বিদেশে সমালোচনার ঝড় ওঠে। উত্তপ্ত হয়ে ওঠে কাশ্মীরও।

জম্মু-কাশ্মীর ও লাদাখ একই উপত্যকার দুই ফুল। কেন্দ্রশাসিত দুই অঞ্চলের মানুষ নিজেদের অভিজ্ঞতায় বুঝছে যে কিছু বদল এসেছে। জনজীবন আগের থেকে ভালো হতে শুরু করেছে। গত কয়েক দশকে সকাল হলেই গুলি-বোমা, মেশিনগানের শব্দ আর যখন-তখন হরতাল—এই ধারায় উপত্যকার মানুষ অভ্যস্ত হয়ে পড়েছিল। তাদের খাদ্যাভ্যাসও গড়ে উঠেছে সেভাবেই। গরম ভাত, সঙ্গে বেশি করে সুরুয়ায় এক টুকরো মাংস। এটুকুই তাদের একবেলার খাবার। কেন এই অভ্যাস?

শ্রীনগরের বাসিন্দা শাল ব্যবসায়ী জাভেদ ইয়ানি জানালেন, ‘একবার হরতাল, বয়কট শুরু হলে কবে শেষ হবে তা জানা ছিল না। ঘর থেকে বের হওয়াও যেত না। তাই অল্প খাবারে দিন গুজরান অভ্যেস করতে হয়েছে।’ বছর বাইশের তাজা তরুণ মনজুর দার অনলাইনে আখরোট, জাফরানের ব্যবসা করেন। তিনি জানালেন, ‘পরিস্থিতি স্বাভাবিক হওয়ায় দুনিয়ার নানান প্রান্তে ভালো মানের জাফরান রপ্তানি করে পরিবারকে সচ্ছল করে তুলতে পেরেছি। অর্থনৈতিক অস্থিরতা কমেছে।’

n লেখক: দৈনিক ইত্তেফাকের কলকাতা প্রতিনিধি