কাজের মধ্য দিয়ে যারা বেঁচে থাকেন, সন্তোষ গুপ্ত তেমনি আদর্শের এক বাতিঘর। বহুমাত্রিক প্রতিভাধর এই ব্যক্তিত্বের বিচরণ ছিল শিল্পকলার পুরো প্রান্তরে। সন্তোষ গুপ্তের বর্ণিল কর্মজীবনের সামগ্রিক পরিচয় মেলে তাকে নিয়ে বিভিন্ন জনের বিভিন্ন সময়ে লেখায়। তার জীবনসংগ্রাম, পরিবার, লেখাজোখার পাশাপাশি তার সময়ের প্রতিনিধিত্বশীল মানুষদেরও দেখতে পাওয়া যায় তার জীবন ও সময় পাঠ করলে।
খ্যাতিমান সাংবাদিক ও অসম ব্যক্তিত্বের অধিকারী সন্তোষ গুপ্তের সঙ্গে আমার কবে পরিচয় হয়েছিল ঠিক মনে নেই। তবে প্রথমে দৈনিক সংবাদে গিয়ে যা দু-একটা কথা বলেছিলাম। সন্তোষ গুপ্ত যে টেবিলে বসতেন, তার পরিসর ছিল বিশাল। প্রচুর কাগজে ভরা বললেও ভুল হবে। কাগজের স্তূপের মধ্যে বসে লিখতেন তিনি। এডিট করতেন চিঠিপত্র, উপসম্পাদকীয় ইত্যাদি। ‘মুক্ত আলোচনা’ নামে সংবাদে একটা পাতা সম্পাদনা করতেন তিনি।
অনিরুদ্ধ কলাম লেখা এই মনীষীর কাছে যেতে যেতে একসময় অফিস থেকে বাসায় যাওয়া শুরু হয়। মনের অজান্তেই আমি তার পরিবারের একজন হয়ে উঠি। তিনি জানতেন না এমন বিষয় নেই। বহুমাত্রিক মেধাবী এই মানুষটি ছিলেন শিশুর মতো সরল-সহজ-জ্ঞানী। লেখালেখিতে তার খ্যাতি আসে শুধু কবিতায়, প্রথম দিকে।
আধুনিক কবিদের কাব্য বিচারে তার কবিতা অনন্য। কিন্তু পরে প্রবন্ধ সাহিত্যে মনোনিবেশ করেন। সন্তোষ গুপ্তের বই ‘ইতিহাস আমাদের দিকে’, ‘সমাজতন্ত্রের অন্য ইতিহাস’, ‘স্মৃতি-বিস্মৃতির অতলে’ এবং চিত্রকলার সমালোচনাসহ বহুমাত্রিক সাহিত্যচর্চা করেছেন তিনি। আপাত অর্থে ১৯৬২ সালে কমিউনিস্ট পার্টি থেকে সরে দাঁড়ানো এবং সমাজতান্ত্রিক চিন্তা সম্পর্কে তার মতামত অনেকটা বদলে গেলেও অকপটে তিনি তা বলে গেছেন।
তার মতে, যেসব দেশে কমিউনিস্ট পার্টি ক্ষমতা দখল করেছে, তারা সবাই একটি মডেলই ব্যবহার করেছে। পরম অসহিষ্ণুতা একনায়কত্বের অঙ্গ। আর একনায়কত্ব মানেই স্বেচ্ছাচার। ইতিহাসের এই শিক্ষা ও অভিজ্ঞতা অস্বীকার করে মানবমুক্তির মডেল হিসেবে গৃহীত পথটির চরিত্র দেখা গেল কমিউনিস্ট শাসিত সব দেশেই একরকম। এটা যখন প্রমাণিত হলো, তা নিয়ে আমাদের দেশের কোনো কমিউনিস্ট গ্রুপ প্রশ্ন করেনি। আদর্শগত মতান্ধতা, ধর্মীয় মতান্ধতা কিংবা জাতি শ্রেষ্ঠত্বের নামে উগ্র জাতীয়তাবাদের সঙ্গে সামরিক শক্তি যুক্ত হলে তারা রাষ্ট্রীয় পর্যায়ে ফ্যাসিবাদের জন্ম দেয়। বিশ্বাস তার অঙ্গ, যুক্তি নয়। এই যুক্তিহীন পদ্ধতি প্রলেতারীয় একনায়কত্বের নামে জাতীয় গণ্ডি অতিক্রম করে আন্তর্জাতিক রূপ ধারণ করলেই তার চরিত্র বদলায় না।
‘অনালোকে আলোকস্তম্ভ’ বইতে সন্তোষগুপ্তের কিছু স্মৃতিময় কথা ব্যক্ত হয়েছে। সেখান থেকে সাংবাদিক, সাহিত্যিক শহীদুল্লা কায়সারকে নিয়ে স্মৃতিচারণ করেছেন সন্তোষ গুপ্ত। সন্তোষ গুপ্ত সাংবাদিক জীবনের বিশেষ সুহূদ-সহযোদ্ধা শহীদুল্লা কায়সার। তিনি লিখেছেন—আমাদের দুজনের মধ্যে মিল ছিল সাধারণভাবে কয়েকটি দিক থেকে। কাছাকাছি বয়স ছাড়াও চিন্তাধারা, দৃষ্টিভঙ্গির দিক থেকেও ছিলাম কাছাকাছি। তবু বৈপরীত্য বোধ হয় বন্ধুত্বকে প্রগাঢ় করে। তাই তার প্রাণবন্ত উচ্ছলতা, গভীর মানবিকতা, বন্ধুবাত্সল্য, সহিষ্ণুতা, সহূদয়তা আর অফুরন্ত কর্মশক্তি মুগ্ধ করেছে। বলা বাহুল্য, তার এসব গুণ মুখোশ হিসেবে ব্যবহার করতে চেষ্টা করলেও আয়ত্ত করতে পারিনি। তার মেজাজ শান্ত, যে কোনো রকম উত্তাপের মুখেও নরোম গলায় আশ্চর্য দৃঢ়তা নিয়েই স্বীয় বক্তব্য রাখতেন। আর আমার স্বভাবে এসব ক্ষেত্রে বিপরীত মেরুতে অবস্থান নিত; এই বিপরীতমুখিতা কিন্তু তার দিকে প্রচণ্ডভাবে টেনেছে। তাই তার বন্ধুত্ব ছিল সহজ, একান্ত নিঃশ্বাসের মতো। দুশ্চিন্তা ছিল না কখনো তাকে বন্ধু হিসেবে ভুল বোঝাবুঝির; কোন প্রশ্নে বড় রকমের মতভেদ সত্ত্বেও নয়।
রণেশ দাশগুপ্ত সম্পর্কে তিনি লিখেছেন—আমাদের রণেশদার সঙ্গে আমার পরিচয় হয় যশোর জেলে। ঢাকা কেন্দ্রীয় কারগার থেকে আমাকে পাঠানো হলো যশোর জেলে ১৯৫০ সালের আগস্ট মাসে। সেখানে গিয়ে রাজবন্দি হিসেবে পেলাম বরিশালের নুটু ব্যানার্জি আর ঢাকার রণেশ দাশগুপ্ত ও দেবপ্রসাদ মুখার্জিকে। ১২ নম্বর ওয়ার্ডের দোতলায় বেশ একটা বড়সড় প্রশস্ত কক্ষে আমাদের রাজবন্দিদের রাখা হতো। সাজাপ্রাপ্ত রাজবন্দিরা ছিলেন পৃথক ওয়ার্ডে। রণেশদার নাম আগে শুনেছি। সম্ভবত ১৯৪৭ সালের অক্টোবর মাসে ঢাকার সদরঘাটের গির্জাসংলগ্ন এক মিলনায়তনে একটি আলোচনাসভায় অধ্যাপক অজিত গুহ ও রণেশদা ছিলেন বক্তা। সেখানে তিনি ব্যাখ্যা করছিলেন সমাজবিজ্ঞানের তত্ত্বটি :শ্রমের সঙ্গে সংস্কৃতির সম্পর্ক। বন্ধু দেখে মানুষ চিনতে হয়। ‘অনালোকে আলোকস্তম্ভ’ বইটি সামনে আনলে মানুষ এ দেশের সাহিত্য-সংস্কৃতির সংগ্রামের দিশা পেত। জানত ইতিহাস। সন্তোষ গুপ্ত যার পথিকৃত্। তাকে স্মরণ করছি শ্রদ্ধাভরে।
n লেখক :সাংবাদিক
