মোবাইল কোর্ট পরিচালনার প্রক্রিয়া নিয়ে প্রশ্ন হাইকোর্টের

আপডেট : ০৬ আগস্ট ২০২১, ০০:১১

বাল্যবিবাহের ঘটনায় মোবাইল কোর্টে দুই শিশুকে এক মাসের আটকাদেশের ঘটনায় ব্যাখ্যা তলব করেছে হাইকোর্ট। মোবাইল কোর্ট পরিচালনকারী নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট নেত্রকোনার আটপাড়া উপজেলার সহকারী কমিশনার (ভূমি) সুলতানা রাজিয়ার লিখিত ব্যাখ্যা ২৬ আগস্টের মধ্যে দাখিল করতে বলা হয়েছে। এ সংক্রান্ত আবেদনের শুনানি শেষে বিচারপতি এম. ইনায়েতুর রহিমের একক ভার্চুয়াল হাইকোর্ট বেঞ্চ গতকাল বৃহস্পতিবার এই আদেশ দেন। একই সঙ্গে যে প্রক্রিয়ায় দুই শিশুকে সাজা দেওয়া হয়েছে তা নিয়েও উষ্মা প্রকাশ করেছে আদালত। অ্যাটর্নি জেনারেল এ এম আমিন উদ্দিনের উদ্দেশ্যে বিচারপতি ইনায়েতুর রহিম বলেন, গণমাধ্যমের নিউজ পড়ে দেখলাম নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট তার চেম্বারে বসে দুই শিশুকে সাজা দিয়েছেন। এভাবে কি তিনি সাজা দিতে পারেন? আইনানুযায়ী মোবাইল কোর্ট ঘটনাস্থলে থেকে সাজা দিতে পারেন।

এ পর্যায়ে অ্যাটর্নি জেনারেল আদালতের মনোভাবের সঙ্গে একমত পোষণ করে বলেন, যেখানে অপরাধ সংঘটন হয়েছে অর্থাত্ স্পটে (ঘটনাস্থল) সাজা দেওয়ার সুযোগ রয়েছে। বিচারপতি ইনায়েতুর রহিম বলেন, অফিসে বসে মোবাইল কোর্ট পরিচালনা করে কাউকে সাজা দেওয়ার সুযোগ নাই। থানায় বসেও করার সুযোগ নাই। এ রকম অনেক ঘটনা পত্রপত্রিকায় দেখছি যে, ঘটনা ঘটেছে কিন্তু ২/৩ দিন পর সাজা দেওয়া হচ্ছে। কয়েক দিন আগে বরগুনায় এরকম একটি ঘটনা ঘটেছে। মোবাইল কোর্টের স্পিরিট কিন্তু এরকম না। এ রকম ঘটনা যেন না ঘটে সেজন্য নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেটদের যথাযথ প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করতে মন্ত্রিপরিষদ সচিবের সঙ্গে আপনি কথা বলুন। মোবাইল কোর্ট পরিচালনার সময় যথাযথভাবে যেন আইনের প্রয়োগ ঘটানো হয় সেই বিষয়ে ম্যাজিস্ট্রেটদের প্রশিক্ষণ দেওয়া দরকার। তখন অ্যাটর্নি জেনারেল বলেন, মাই লর্ড আমি সচিবের সঙ্গে কথা বলব।

নেত্রকোনার ঘটনা নিয়ে আইনজীবী মো. শিশির মনিরের আবেদনে বলা হয়েছে, জেএসসির নিবন্ধন কার্ড অনুযায়ী শিশু দুটির বয়স ১৫ বছর। অর্থনৈতিক অসচ্ছলতার কারণে প্রায় দুই বছর ধরে তারা লেখাপড়ার পাশাপাশি ঢাকায় তৈরি পোশাক কারখানায় চাকরি করছিল। সে সময় দুজনের মধ্যে প্রেমের সম্পর্ক গড়ে ওঠে। সম্প্রতি মেয়েটি বিয়ে করার জন্য ছেলেটিকে চাপ দেয়। কিন্তু ছেলেটি তা প্রত্যাখ্যান করে। গত ঈদে তারা গ্রামের বাড়িতে যায়। মেয়েটি বিয়ের দাবিতে গত সপ্তাহের বুধবার রাত থেকে ছেলের বাড়িতে অবস্থান নেয়। এরপর রবিবার ছেলেমেয়ের পরিবার তাদের বিয়ের আয়োজন করে। বাল্যবিবাহের খবর পেয়ে সহকারী কমিশনার (ভূমি) সুলতানা রাজিয়া সেখানে পুলিশ পাঠান। এরপর দুজনকে তার কার্যালয়ে নিয়ে ভ্রাম্যমাণ আদালত বসিয়ে বাল্যবিবাহ নিরোধ আইনে এক মাসের আটকাদেশ দেন বলে পত্রিকায় প্রকাশিত প্রতিবেদনে বলা হয়। পরে এ ঘটনা হাইকোর্টের নজরে আনলে বুধবার দুই শিশুকে জামিনে মুক্তির আদেশ দেয়। ঐ আদেশ পৌঁছার আগেই আপিল শুনানি করে অতিরিক্ত জেলা ম্যাজিস্ট্রেট দুই শিশুকে জামিন দেন। পরে তারা কারাগার থেকে মুক্তি পায়।

এদিকে গতকাল ঐ আবেদনের ওপর শুনানিতে শিশির মনির বলেন, সেদিন সুলতানা রাজিয়া মোবাইল কোর্টের দায়িত্বে ছিলেন না। আমার ধারণা মিসকনসেপশনের ভিত্তিতে তিনি এটা (ক্ষমতা) প্রয়োগ করেছেন। এ বিষয়ে তার ব্যাখ্যা জানতে চাওয়া দরকার।

ডেপুটি অ্যাটর্নি জেনারেল বিপুল বাগমার বাল্যবিবাহ নিরোধ আইনের ৭ ও ৮ ধারা উল্লেখ করে বলেন, সেখানে শাস্তির বিধান আছে। আদালত বলেন, বাল্যবিয়ে হয়ে থাকলে কমপিটেন্ট কোর্ট সাজা দেবে। যেহেতু আমাদের একটা জাজমেন্ট রয়েছে এবং শিশু আইন অনুযায়ী মোবাইল কোর্টে শিশুদের সাজা দেওয়ার সুযোগ নেই।

ব্লাস্টের আইনজীবী এস এম রেজাউল করিম বলেন, নেত্রকোণার অতিরিক্ত জেলা ম্যাজিস্ট্রেট শিশুদের সাজা সরাসরি বাতিল করে দিয়েছেন। বেআইনি না হলে উনি বাতিল করলেন কীভাবে? আদালত বলেন, ঠিক আছে। ঐ ম্যাজিস্ট্রেটের কাছে যে ব্যাখ্যা চাওয়া হয়েছে, তার একটা অনুলিপি ২৬ আগস্টের মধ্যে হাইকোর্টে প্রেরণ করবে। দেখি উনি কি ব্যাখ্যা দেন।