রেজাউল করিম খোকন
দুই মেয়ে সাদিয়া ও নাদিয়ার পর আবারও বাচ্চা নেওয়ার ইচ্ছে ছিল না সুরভির। ছেলে হোক আর মেয়ে হোক, দুটি সন্তানই যথেষ্ট। স্বামী শরিফকে বলেছে সে অনেকবার। মেয়েগুলোকে মানুষ করতে পারলেই জীবনটা সার্থক। সুরভির দেখানো যুক্তির বিপরীতে শরিফ বলেছে, মেয়েদের তো একদিন বিয়ে দিতে হবে। ওরা জীবনে যতোই প্রতিষ্ঠিত হোক না কেন, স্বামীর ঘরে তো যেতে হবে এক সময়। তখন আমাদের পাশে কে থাকবে, বুড়ো বয়সে কে দেখবে আমাদের, এই ব্যবসা-বাণিজ্য, বিশাল সম্পত্তি কে দেখাশোনা করবে?
শরিফ ওর বাবা-মায়ের একমাত্র ছেলে। যদিও ওর আরো তিন বোন আছে। সবার বিয়ে হয়ে গেছে। অনেক বড় ব্যবসায়ী পরিবারের একমাত্র ছেলে হিসেবে শরিফকে একাই সব দেখতে হচ্ছে। যদি তার আরো ভাই থাকত তাহলে এতোটা চাপ পড়ত না তার ওপর। এখন তার অবর্তমানে এত ব্যবসা-বাণিজ্য, ইন্ডাস্ট্রি দেখাশোনা করবে কে? এজন্য ছেলেসন্তান দরকার। সুরভির শ্বশুর-শাশুড়ি ও ননদের একই কথা। যেভাবেই হোক একটা ছেলের মা হতে হবে তাকে। পরপর দুটি মেয়ে হওয়ায় সুরভিকে অনেক খোঁটা শুনতে হয়েছে। শাশুড়ি তো সুযোগ পেলেই নানা কথা শোনায়—‘তোমার মতো এমন একটা মেয়েকে এ বাড়ির বউ করাটা মস্তবড় ভুল হয়েছে আমাদের। যে কেবলই একটা মেয়ে পয়দা করার মেশিন ছাড়া আর কিছুই নয়, এবার যদি ছেলে না হয় তোমার, তাহলে কিন্তু পরিবারের ভবিষ্যতের জন্য আমাদের অন্য চিন্তাভাবনা করতে হবে।’
সুরভি বুঝে গেছে, প্রয়োজনে ছেলের জন্য আরেকটা বউ আনতে দ্বিধা করবে না তার শাশুড়ি। শরিফদের অর্থবিত্ত-বৈভবের অভাব নেই। এখনো অনেক মেয়ে চোখ বুজে রাজি হয়ে যাবে শরিফের দ্বিতীয় বউ হতে। যদি শেষ পর্যন্ত তাই হয়, কী হবে সুরভির?
আচ্ছা, সন্তান ছেলে হবে না মেয়ে হবে এর ওপর তো সুরভির কিংবা শরিফ—কারোই হাত নেই। এটা তো নির্ধারণ করেন সৃষ্টিকর্তা, তার ইচ্ছাতেই সন্তান ছেলে কিংবা মেয়ে হয়। এতোদিন গ্রামের কিংবা শহরের বস্তির অনেক মহিলাকে দেখেছে ছেলেসন্তান জন্ম দিতে না পারায় স্বামী তাদের ত্যাগ করেছে কিংবা ছেলেসন্তানের আশায় স্বামী আবার বিয়ে করেছে। সুরভি তো সে রকম পরিবারের মেয়ে নয়। ইউনিভার্সিটিতে পড়ুয়া শিক্ষিত, সংস্কৃতিমনা, আধুনিকমনস্ক পরিবারের মেয়ে। শরিফদের পরিবারও শিক্ষিত, ধনাঢ্য, প্রভাবশালী। গ্রামের সাধারণ এক গরিব অসহায় গৃহবধূ, যে স্বামীর সংসারে নানা নির্যাতন আর বঞ্চনার শিকার হয়ে দুর্বিষহ জীবনযাপন করছে তার সঙ্গে কোনো পার্থক্য নেই সুরভির। চরম অনিশ্চয়তা এবং নিরাপত্তাহীনতা তাকে গ্রাস করতে থাকে ক্রমশ।
অলংকরণ :অবিনাশ আচার্য
