গোপালপুরে ফিরে এলো বুনোহাঁস

আপডেট : ০৬ আগস্ট ২০২১, ২১:২২

গোপালপুর (টাঙ্গাইল) সংবাদদাতা

‘বুনোহাঁস পাখা মেলে-শাঁই-শাঁই শব্দ শুনি তার.... উড়ুক উড়ুক তারা হূদয়ের শব্দহীন জ্যোত্স্নার ভেতর।’ কবি জীবনানন্দ দাসের ‘বুনোহাঁস’ কবিতায় অসীম আকাশে ডানা মেলা উড়ন্ত হাঁস, প্রকৃতি আর পরিবেশের রয়েছে চমত্কার বর্ণনা। হারিয়ে যাওয়া এমন বুনোহাঁসরা চার দশক পর আবার ফিরেছে টাঙ্গাইলের গোপালপুর উপজেলার বিলঝিলে, খাল-পুকুরে, ঝোপঝাড়ে। জানা যায়, ধনুকের মতো বাঁকানো গ্রাম সাহাপুর। দক্ষিণে পয়াবিল, উত্তরে বুদ্ধিবিল, পূর্বে বসনবিল। বিলের টলমলে জলে ঘেরা গ্রাম গাছপালা, বাঁশঝাড় আর গুল্মলতার বৈচিত্র্যে ভরপুর।

গ্রামের হোমিও চিকিত্সক মুখতার হোসেন জানান, সাহাপুর ছিল পাখির গ্রাম। পরে নানা কারণে পাখিশূন্য হতে থাকে। চার দশক আগে বুনোহাঁস দেখা যেত। দীর্ঘদিন দেখা না মেলায় ধরে নেওয়া হয় বিলুপ্তি ঘটেছে। কিন্তু গত বৃহস্পতিবার বাড়ির সুপারি বাগানে হঠাত্ বুনোহাঁসের দেখা মেলে। সকালের বৃষ্টিতে সুপারি গাছের উঁচু ঝোপ থেকে ছয়/সাতটি বাচ্চা হাঁস ধুপাধুপ নিচে পড়ে। তারপর পিল পিল করে নামে বিলের জলে। কিন্তু একটি দুর্বল বাচ্চা পিছিয়ে পড়ে। আর বাড়ির শিশুরা সেটিকে খপ করে ধরে ফেলে। অসুস্থ ছানাটিকে চিকিত্সা, খাবার ও সেবা দিয়ে বাড়িতেই আগলে রাখা হয়েছে।

প্রবীণ আবুল হোসেন জানান, গাঁয়ের বিলে বুনোহাঁস, ডাহুক, পানকৌড়ি, কালিম, গাংচিল, বক, বাবুইবাটান, মাছরাঙা, শামুকখোল, কান্তেচরা, মানিকজোড় ও সারসের মতো আবাসিক এবং নানা অতিথি জলচর পাখি দেখেছেন। এখনো বক, মাছরাঙা, কালিম, ডাহুক মিললেও বুনোহাঁস একদম হারিয়ে যায়। চার দিন আগে বুনোহাঁসের ফিরে আসার খবরে সবাই অবাক। গাছগাছালিতে বাসা বাঁধছে, বিলের পানিতে ডুবসাঁতার দিচ্ছে জেনে সবাই খুশি। শিকার ও প্রজননস্থল যাতে বিনষ্ট না হয় সেদিকে সবার খেয়াল। গ্রামের পেশাদার পাখি শিকারি নাজিম উদ্দীন ছয় দশক ধরে ফাঁদে জলজ পাখি শিকার ও বেচাবিক্রির ব্যবসা করেন। ৮০ সালের দিকে সর্বশেষ বুনোহাঁস শিকার করেন তিনি। এরপর আর দেখা মেলেনি। আষাঢ়-শ্রাবণে বুনোহাঁস ডিম থেকে ছয়/সাতটি করে বাচ্চা দেয়। বিলের কাছাকাছি গাছের কোঠরে বা পত্রগুচ্ছের আড়ালে বাসা বাঁধে। বাচ্চা ফোটানোর দিনকয়েক পর মা-হাঁস বৃষ্টিমুখর দিনে বাসা থেকে বাচ্চাদের ঠেলে নিচে ফেলে দেয়। আর বাচ্চারা মাকে অনুসরণ করে দ্রুত পায়ে হেঁটে পানিতে নামে। এরা শস্যবীজ, ছোট মাছ, পোকামাকড়, জলজ উদ্ভিদের ডগা ও ফুল খায়।

গ্রামের আরেক প্রবীণ আলাউদ্দীন মিয়া জানান, গ্রামীণ বনজঙ্গল হ্রাস, অবাধে শিকার, খাদ্যসংকট ও প্রজনন পরিবেশ বিনষ্ট হওয়ায় বুনোহাঁসসহ জলজ পাখি কমতে থাকে। দিনদিন গাঁয়ে গাছপালার সংখ্যা বাড়ছে। শিকার বন্ধ হয়ে গেছে। শুস্ক মৌসুমে বিলের তলানীতে কিছু পানি থাকে। তাছাড়া আশপাশের বাণিজ্যিক মত্স্য খামারে পাখিরা খাবার ও আশ্রয় পায়। ফলে বুনোহাঁসের মতো জলজ পাখিরা আবার ফিরেছে।

প্রাণিবিদ্যা গবেষক আ ন ম আমিনুর রহমান মিডিয়াকে জানান, বালিহাঁস গোত্রভুক্ত বুনোরা দল বেঁধে বিচরণ করে। দৈর্ঘ্য ৩২-৩৪ সেমি। গড় ওজন ২৫০ গ্রাম। চিবুক, ঘাড় ও দেহের নিচটা তুলার মতো সাদা। গলায় কালো মালা। ডানায় সাদা ডোরা দাগ। চোখ বাদামি। টানা চোখের কাজল রেখা মায়ার সঞ্চার করে। প্রাণিবিদ্যা বিভাগের অবসরপ্রাপ্ত কলেজ শিক্ষক ড. হাসান মামুন জানান, সিলেট, গোপালগঞ্জ, বাগেরহাট ও রাজশাহীর নিম্নাঞ্চলে এখনো কিছু বুনোহাঁসের দেখা মেলে। টাঙ্গাইল থেকে এটি হারিয়ে গেছে বহু আগে। সাহাপুর গ্রামে বুনোহাঁসের ফিরে আসার খবরটি খুবই উত্সাহব্যঞ্জক। মানুষ ও পাখি প্রকৃতিরই অংশ। একটিকে বিলীন করে দিয়ে অন্যটির বেঁচে থাকার লড়াই হবে কঠিন থেকে কঠিনতর।