দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলে মাদকের বিষ কীভাবে ছড়াইয়া পড়িয়াছে—তাহা চোখ-কান খোলা রাখিলেই জানা যাইবে। কিন্তু কাহারা এই সকল অঞ্চলের মাদকের কারবারি? কাহাদের দ্বারা এই কারবারিরা ইন্ধন ও সহযোগিতা পাইতেছেন? দেখা যাইতেছে, ক্ষমতাসীন দলের নেতাদের দ্বারাই মাদক কারবারিরা সকল প্রকারের পৃষ্ঠপোষকতায় পাইতেছে। এমনও দেখা যায় যে, মাদক কারবারির বিরুদ্ধে অনেকগুলি মামলা থাকিলেও তাহার কর্মকাণ্ড উপজেলার থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তাও সমর্থন করিতে বাধ্য হন। কারণ, উপজেলার ক্ষমতাসীন দলের সভাপতি ঐ মাদক কারবারির তথাকথিত ত্রাণকর্মের উদ্বোধন করাইতেছে।
ইত্তেফাকের সংবাদে আমরা দেখিয়াছি, মাদকের বিরুদ্ধে অভিযানের বিষয়টি সরকার অত্যন্ত গুরুত্বের সহিত গ্রহণ করিয়াছে। সরকার মাদকের বিরুদ্ধে অত্যন্ত কঠোর অবস্থান লইয়াছে বটে, কিন্তু থানা পর্যায়ের কী অবস্থা—তাহা কি সরকারের উচ্চমহল জানে না? থানা জানিবে না, এমন কোনো মাদক ব্যবসা, চোরাকারবারি, নারী পাচারের ঘটনা ঘটিতেই পারে না। এমনও দেখা যাইতেছে যে, মাদক ব্যবসায়ীরা ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান তৈরি করিয়া দিতেছে। মাদক ব্যবসায়ী সামনে আসে না, আবার প্রশাসন বলিতেছে—দেখিয়া লইবে। আবার ক্ষমতাসীন দলের নেতা ঐ ব্যবসায়ীর তথাকথিত জনকল্যামূলক কাজের সহিত জড়িত রহিতেছেন। এখন প্রশ্ন হইল—ক্ষমতাসীন দলের এই ধরনের নেতাদের দেখিয়া থানার কর্মকর্তা কী করিয়া সাহস করিবেন ঐ মাদক কারবারিকে ধরিবার? ফলে তাহাদের ‘দেখিয়া নেওয়াটা’ ফাঁকা বুলি হইয়া উপজেলার আকাশে-বাতাসে ধাক্কা মারে। অথচ কেন্দ্রীয় পর্যায়ে যাহারা সুটেড-বুটেড নেতা রহিয়াছেন, তাহারা ভাঙা রেকর্ডের মতো হুংকার দিয়াই যাইতেছেন—কাউকে ছাড় দেওয়া হইবে না। প্রশ্ন হইল, তাহারা কি জানেন না মাঠ পর্যায়ে, উপজেলা পর্যায়ে প্রকাশ্যে কী হইতেছে? কোন কোন নেতা কোন কোন মাদক ব্যবসায়ীকে বিভিন্নভাবে সহযোগিতা করিয়া যাইতেছে—ইহা তাহাদের অগোচরে হইবার উপায় নাই।
প্রকৃতপক্ষে, কেবল আমাদের দেশে নহে, সারা পৃথিবীতেই মাদক ব্যবসায়ীরা রাজনীতিবিদদের দ্বারা পৃষ্ঠপোষকতায় পায়। নিশ্চয়ই সরকারের নির্দেশেই মাদক নির্মূলে দেশব্যাপী অভিযান অব্যাহত রাখিবার কঠোর সিদ্ধান্ত লইয়াছে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী। কিন্তু তাহারা কি সরকারপ্রধানের নিকট ইহা কখনো বলিতে পারিয়াছেন যে, ঐ মাদক ব্যবসায়ীরা দলীয় লোকদের দ্বারা পৃষ্ঠপোষকতা পাইতেছেন? একটি দলের উপজেলা পর্যায়ের সভাপতি তো যথেষ্ট গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তি। একজন মাদক কারবারি, যাহার বিরুদ্ধে অনেকগুলি মামলা রহিয়াছে, ঐ সভাপতি কী করিয়া সেই মাদক ব্যবসায়ীর পক্ষে তথাকথিত জনহিতকর ত্রাণমূলক অনুষ্ঠান উদ্বোধন করেন? তিনি কি ইহার মাধ্যমে দলের সুনাম ক্ষুণ্ন করিতেছেন না? এলাকার লোকজন তো ঠিকই জানেন তিনি একজন মাদক অপরাধীকে কোলে তুলিয়া লইয়াছেন। অতএব ভাবিয়া করিও কাজ, করিয়া ভাবিও না। ইত্তেফাকে প্রকাশিত এই সংক্রান্ত প্রতিবেদনে ইহা জানা গিয়াছে যে, মাদকের সঙ্গে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর একশ্রেণির কর্মকর্তাও জড়িত। অবস্থাদৃষ্টে ইহা স্পষ্ট যে, প্রশাসনের প্রতিটি স্তরেই মাদক কারবারিদের প্রতিনিধি রহিয়াছে। সুতরাং পরিস্থিতি এই রকম থাকিলে কাহারো বাপেরও সাধ্য নাই মাঠ পর্যায়ে মাদক নির্মূল করিবার। এখন এই অবস্থা বিদ্যমান রাখিয়া যদি অভিযান আরো কঠোর করা হয়, তখন দেখা যাইবে যে কেবল কিছু টোকাই ধরা পড়িতেছে। আসল ক্রিমিনালরা ধরাছোঁয়ার বাহিরে চলিয়া যাইবে।
আমরা মনে করি, সরকারের সিদ্ধান্ত ঠিকই আছে কিন্তু সমাধানের পথটা ঠিক নাই। গণতন্ত্রের অনেক ধরনের দুর্বলতা রহিয়াছে। এই দুর্বলতাকে চিহ্নিত করিয়া গণতন্ত্রকে রক্ষা করিতে হইবে। ভালো কর্মীদের মূল্যায়ন করিতে হইবে, আবার শুদ্ধি অভিযানও চালাইতে হইবে। মনে রাখিতে হইবে, বঙ্গবন্ধুও একসময় মাদকের বিরুদ্ধে অভিযান চালাইয়াছিলেন। তখনো ইহার সহিত এমন সকল নেতাকে জড়িত থাকিতে দেখা গিয়াছিল, যাহা ছিল বঙ্গবন্ধুর চিন্তার বাহিরে। সুতরাং বর্তমানে যেই পরিস্থিতি বিদ্যমান, তাহাতে মাদকের বিরুদ্ধে জিরো টলারেন্সের কথা শুনিয়া জনগণ যেন হাসাহাসি না করে, তেমন বাস্তবোচিত পদক্ষেপ লইতে হইবে। মাঠ পর্যায়ের মাদক ব্যবসায়ীদের ছাই দিয়া না ধরিলে মাদকের বিরুদ্ধে শক্ত শক্ত কথা কেবল কথার কথাই হইয়া থাকিবে।
