উত্পাদনশীলতা হ্রাস করোনা-উত্তর অর্থনৈতিক পুনর্বাসন বিঘ্নিত করবে

আপডেট : ০৬ আগস্ট ২০২১, ২১:৪২

গল্পটি অনেক দিন আগে শুনেছিলাম। নিউজিল্যান্ডের প্রত্যন্ত অঞ্চলে জনৈক কৃষকের প্রতিদিন ১৫ লিটার দুধ দেওয়া একটি গাভি ছিল। শহরের এক ধনাঢ্য ব্যক্তি গাভিটি দেখে কেনার ইচ্ছে প্রকাশ করেন। কিন্তু কৃষক তার গাভি কোনোভাবেই বিক্রি করতে রাজি হচ্ছিলেন না। অনেক অনুনয়-বিনয় করার পর কয়েক গুণ বেশি মূল্যে কৃষক তার গাভিটি বিক্রি করে দেন। শহুরে ধনাঢ্য ব্যক্তি গাভিটি তার বাড়িতে নিয়ে গেলেন। দেখা গেল, প্রচুর যত্ন-আত্তি করার পরও শহরে গিয়ে গাভিটি কোনোভাবেই ১২ লিটারের বেশি দুধ দিচ্ছে না। ধনাঢ্য ব্যক্তিটি অনেকটা বিরক্ত হয়ে গাভি নিয়ে কৃষকের কাছে গেলেন। দেখা গেল, কৃষকের বাড়ি গিয়ে গাভিটি আগের মতোই ১৫ লিটার দুধ দিচ্ছে। পরবর্তীকালে অনুসন্ধান করে দেখা গেল, কৃষকের বাড়িতে নিয়মিত সংগীতচর্চা হয়। গাভিটি সেই সংগীতচর্চায় মুগ্ধ হয়ে বেশি পরিমাণ দুধ দিত। যেহেতু ধনাঢ্য ব্যক্তির বাড়িতে সংগীতের চর্চা হতো না, তাই গাভিটি সেখানে গিয়ে মনমরা হয়ে থাকত এবং দুধ দেওয়া কমিয়ে দেয়। ধনাঢ্য ব্যক্তিটি গাভিটি তার বাড়িতে নিয়ে যান এবং দুধ দোহনের সময় ক্যাসেড রেকর্ডারে গান বাজানোর ব্যবস্থা করেন। এতে গাভিটি আবারও ১৫ লিটার দুধ দিতে শুরু করে। এই গল্পের শিক্ষণীয় বিষয় হচ্ছে, বোবা প্রাণীর উত্পাদনশীলতা বৃদ্ধির জন্যও অনুকূল পরিবেশ দরকার হয়। মানুষের ক্ষেত্রে ব্যক্তিগত উত্পাদনশীলতা বৃদ্ধির জন্য অনুকূল পরিবেশ সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। সমযোগ্যতা নিয়ে একই পদবিতে অবস্থান করা সত্ত্বেও সবার ব্যক্তিগত উত্পাদনশীলতা একই রকম হয় না। ব্যক্তিভেদে উত্পাদনশীলতা কমবেশি হয়ে থাকে। উত্পাদনশীলতার বিকাশ ব্যতীত মানুষের সৃজনশীল প্রতিভা সর্বোচ্চ  পর্যায়ে উন্নীত হতে পারে না। মানুষ রোবট নয়। কাজেই তার প্রতিভা বিকাশের জন্য অনুকূল কর্মপরিবেশ একান্ত প্রয়োজন। ব্যক্তির সৃজনশীল উত্পাদনশীলতা বিকশিত হওয়ার জন্য কয়েকটি আবশ্যিক শর্ত পরিপালন করতে হয়। শিক্ষা এবং উপযুক্ত প্রশিক্ষণ একজন মানুষের উত্পাদনশীলতা বিকাশের জন্য অত্যন্ত সহায়ক। এর সঙ্গে সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন হচ্ছে শারীরিক এবং মানসিক সুস্থতা। শারীরিক ও মানসিকভাবে অসুস্থ একজন মানুষের পক্ষে তার উত্পাদনশীলতাকে চূড়ান্ত পর্যায়ে বিকশিত করা কোনোভাবেই সম্ভব নয়। ব্যক্তিমানুষের সমষ্টিতেই গড়ে ওঠে একটি সৃজনশীল জাতি। ব্যক্তিগত উত্পাদনশীলতাকে বিকশিত না করে কোনো জাতির পক্ষে কাঙ্ক্ষিত মাত্রায় আর্থসামাজিক উন্নতি অর্জন করা সম্ভব নয়। কিন্তু বেশির ভাগ মানুষই ব্যক্তিগত উত্পাদনশীলতাকে বিকশিত করার বিষয়টি উপেক্ষা করে থাকে। বিশেষ করে তৃতীয় বিশ্বের দেশগুলোতে এই প্রবণতা অত্যন্ত মারাত্মক আকারে লক্ষ করা যায়। ব্যক্তিগত সৃজনশীল উত্পাদনশীলতা বৃদ্ধির ক্ষেত্রে শিক্ষা ও প্রশিক্ষণ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু আমাদের মতো উন্নয়নশীল দেশে মানসম্পন্ন শিক্ষা এবং প্রশিক্ষণের ওপর তেমন একটা গুরুত্ব দেওয়া হয় না। তাই দেখা যায়, উচ্চশিক্ষা গ্রহণ করার পরও একজন ব্যক্তি কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি করতে ব্যর্থ হয়। মানুষ এমনই এক অর্থনৈতিক উপকরণ, যাকে প্রশিক্ষণের মাধ্যমে পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ সম্পদে পরিণত করা যায়। আবার প্রশিক্ষণবিহীন ব্যক্তি সমাজের জন্য আবর্জনা হিসেবে গণ্য হন। বাংলাদেশ থেকে প্রতি বছর বিপুলসংখ্যক মানুষ কর্মসংস্থানের উদ্দেশ্যে বিদেশে গমন করেন। কিন্তু তারা সেখানে গিয়ে বিপাকে পতিত হন। বাংলাদেশের ১০ জন শ্রমিকপ্রতি মাসে যে মজুরি পান ভারত, শ্রীলঙ্কা বা থাইল্যান্ডের পাঁচ জন শ্রমিকও তার চেয়ে বেশি মজুরি লাভ করেন। কারণ, তারা শিক্ষিত এবং ট্রেড-ভিত্তিক প্রশিক্ষিত অর্থাত্ অধিক উত্পানদনশীল জনশক্তি রপ্তানি করে। ফলে তারা আর্থিকভাবে লাভবান হচ্ছে। বাংলাদেশের শিক্ষার মান ক্রমশ নিম্নগামী হচ্ছে। দেশে প্রচুর উচ্চশিক্ষা-প্রতিষ্ঠান গড়ে উঠছে কিন্তু এদের শিক্ষার গুণমান নিয়ে সংশয় রয়েছে। বাংলাদেশে ব্যক্তিগত উত্পাদনশীলতা বৃদ্ধির বিষয়টি ব্যাপকভাবে উপেক্ষিত।

বর্তমানে বিশ্বব্যাপী অতিমারি করোনার প্রাদুর্ভাব চলছে। বিশ্বে করোনায় আক্রান্ত হয়ে এ পর্যন্ত (০২-০৮-২০২১) ৪২ লাখ ৪৮ হাজার মানুষ প্রাণ হারিয়েছে। আক্রান্ত হয়েছে ১৯ কোটিরও বেশি মানুষ। এটা আনুষ্ঠানিক হিসাব। এর বাইরেও অনেকেই মৃত্যুবরণ করেছেন এবং আক্রান্ত হয়েছেন। আমাদের মতো উন্নয়নশীল দেশের মানুষ খুব একটা স্বাস্থ্যসচেতন নয়। ফলে অনেকেই করোনার ভাইরাস বহন করা সত্ত্বেও জানতে পারছেন না তিনি করোনায় আক্রান্ত। প্রত্যেকটি মানুষকেই মৃত্যুর স্বাদ গ্রহণ করতে হবে। মানুষ কখনোই কামনা করে না কিন্তু অনিবার্যভাবে ঘটবে—সেটাই হচ্ছে মৃত্যু। কিন্তু বিশ্বব্যাপী করোনাকালে যেভাবে মানুষ অকাতরে প্রাণ হারাচ্ছে, তা কিছুদিন আগেই ছিল কল্পনার বাইরে। করোনার মতো অদৃশ্য জীবাণুর সংক্রমণ কখনো কমছে কখনো বাড়ছে। পৃথিবী কখন করোনা থেকে মুক্তি পাবে, তা কেউই নিশ্চিত করে বলতে পারছেন না। অনেকেই অবশ্য বলছেন, করোনার প্রাদুর্ভাব একসময় কমে আসবে কিন্তু বিশ্ব কখনোই করোনা থেকে সম্পূর্ণ মুক্ত হতে পারবে না। যারা করোনায় মারা গেছেন অথবা ভবিষ্যতে যাবেন তাদের জন্য শোক প্রকাশ করা ছাড়া আর কিছু করণীয় নেই। কিন্তু যারা করোনা সংক্রমণ থেকে কোনোভাবে রক্ষা পেয়েছেন অথবা পাবেন তাদের ভবিষ্যত্ নিয়ে আমরা কী চিন্তা করছি? করোনার সিম্পটম সবার ক্ষেত্রে একই রকম হয় না। ফলে অনেকেই এই সংক্রমণকে তেমন একটা গুরুত্ব দিচ্ছেন না। কিন্তু যারা কোনোভাবে করোনা সংক্রমণ থেকে রক্ষা পেয়েছেন, তাদের ভবিষ্যত্ মারাত্মক অনিশ্চয়তার মধ্যে পতিত হচ্ছে। করোনা সংক্রমিত হওয়ার পর সুস্থ হলেও তার প্রভাব দীর্ঘদিন শরীরের মধ্যে থেকে যাবে। করোনার প্রভাবে ভবিষ্যতে সবচেয়ে বেশি ক্ষতি হবে ব্যক্তিগত উত্পাদনশীলতার ক্ষেত্রে। যারা একবার করোনায় আক্রান্ত হয়েছেন এবং পরবর্তীকালে সুস্থ হয়েছেন তারা শারীরিক দুর্বলতা অনুভব করছেন। কোনো স্থানে বেশি ক্ষণ একনাগাড়ে দাঁড়িয়ে থাকতে সমস্যা হয়। মানুষের স্বাভাবিক জীবনীশক্তি করোনার কারণে বিপন্ন হয়ে যাচ্ছে। শারীরিক সক্ষমতা হারানোর পাশাপাশি করোনায় আক্রান্ত ব্যক্তি চিন্তার সক্ষমতা হারিয়ে ফেলছেন। করোনার কারণে আগামী দিনে আমরা তুলনামূলক স্বল্প উত্পাদনশীল মানবশক্তি পেতে যাচ্ছি। আগেই বলা হয়েছে, ব্যক্তিগত উত্পাদনশীলতা বৃদ্ধির অন্যতম উপায় হচ্ছে গুণমানসম্পন্ন শিক্ষা এবং প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা নিশ্চিত করা। কিন্তু করোনার কারণে আর্থিক ক্ষতির পাশাপাশি শিক্ষাব্যবস্থার সবচেয়ে বেশি ক্ষতি হয়েছে। ইউনেস্কোর একটি প্রতিবেদনের তথ্য মোতাবেক, করোনার কারণে ১৫ কোটি শিশু বিদ্যালয়ের বাইরে চলে যেতে বাধ্য হয়েছে। এদের মধ্যে অন্তত আড়াই কোটি শিশু আর কখনোই বিদ্যালয়ে ফিরে আসতে পারবে না। এই যে প্রায় দুই বছর ধরে বিশ্বব্যাপী শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বন্ধ রয়েছে তার অনিবার্য প্রভাব পড়বে আগামী দিনে ব্যক্তি উত্পাদনশীলতা সুরক্ষা দেওয়ার ক্ষেত্রে। যারা শিক্ষা এবং প্রশিক্ষণবঞ্চিত হচ্ছেন তারা আর কখনোই তাদের স্বাভাবিক উত্পাদনশীলতা অর্জন করতে পারবেন না। গুণমানসম্পন্ন শিক্ষার অভাবে আগামী দিনে সম্প্রসারমাণ তথ্যপ্রযুক্তি খাতও সাংঘাতিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হবে। ব্যক্তিগত উত্পাদনশীলতা বিকাশে বিশ্ব যেভাবে এগিয়ে যাচ্ছিল তা নিশ্চিতভাবেই ব্যাহত হবে। করোনা সংক্রমণ শুরু হওয়ার আগে বিশ্বব্যাপী উত্পাদনশীলতা যে পর্যায়ে ছিল তা অর্জন করতে অনেক দিন সময় প্রয়োজন হবে। অনেকেই এমনও বলছেন, বিশ্ব আর কখনোই আগের উত্পাদনশীল অবস্থায় ফিরে যেতে পারবে না। কারণ যারা করোনায় আক্রান্ত হয়েছেন এবং যারা আক্রান্ত হননি তাদের সবারই উত্পাদনশীলতা কমে যাবে। সেই অবস্থা থেকে উত্তরণ খুব একটা সহজ হবে না। বিশ্বব্যাপী করোনার ক্ষতিকর প্রভাব নিয়ে নানা ধরনের গবেষণা হচ্ছে। কিন্তু ব্যক্তিগত উত্পাদনশীলতা বিনষ্ট হওয়ার বিষয়টি এখনো অবহেলিত রয়ে যাচ্ছে। কীভাবে করোনা-উত্তর ব্যক্তিগত সৃজনশীল উত্পাদনশীলতাকে পুনরুদ্ধার করা যেতে পারে সে ব্যাপারে কার্যকর এবং ফলপ্রসূ গবেষণা হওয়া প্রয়োজন। করোনা-উত্তর উত্পাদনশীলতাকে পুনরুদ্ধারের জন্য বিশ্বব্যাপী কার্যক্রম গ্রহণ করা যেতে পারে। কারণ মানুষ শুধু বেঁচে থাকলেই হবে না, তাকে সর্বোচ্চ উত্পাদনশীলতা নিয়ে মানুষের মতো মানুষ হয়ে বেঁচে থাকতে হবে।

n লেখক :অবসরপ্রাপ্ত ব্যাংকার ও

অর্থনীতিবিষয়ক লেখক