সামাজিকীকরণ :প্রেক্ষিত করোনাকাল

আপডেট : ০৬ আগস্ট ২০২১, ২১:৪৩

মানবজীবনের সঙ্গে গুরুত্বপূর্ণ যেসব বিষয় ওতপ্রোতভাবে জড়িয়ে রয়েছে তার মধ্যে অন্যতম একটি উপাদান হলো শিক্ষা। মানুষ গড়ার হাতিয়ার হচ্ছে শিক্ষা, শিক্ষাকে মানুষের অন্যতম প্রধান মৌলিক অধিকার বলে বিবেচনা করা হয়। উন্নত জীবনযাপন, ভালোভাবে বেঁচে থাকা কিংবা সচ্ছলভাবে জীবনধারণের জন্য এটি অপরিহার্য। অপরিহার্য হলেও শিক্ষা ছাড়াও কিন্তু বাঁচা যায়, তার ভূরি ভূরি উদাহরণ আছে। আমাদের পূর্বপুরুষের বেশির ভাগই শিক্ষিত ছিলেন না। শিক্ষা মানুষের অন্তর্নিহিত শক্তিকে প্রস্ফুটিত করতে সহায়তা করে, শিক্ষা মানুষকে আলোকিত করে, পথ চলতে সহায়তা করে। শিক্ষার আরেকটি দিক হচ্ছে তা মানুষকে সামাজিকীকরণে সহায়তা করে।

সামাজিকীকরণ ব্যক্তিজীবনে খুবই গুরুত্বপূর্ণ একটি অনুষঙ্গ। এই সামাজিকীকরণের মাধ্যমেই একটি মানবশিশু সামাজিক মানুষ তথা মানবিক মানুষে পরিণত হয়। ব্যক্তির নৈতিক মূল্যবোধ, তার মানবিক গঠন, বিচারক্ষমতা গড়ে ওঠে এই সামাজিকীকরণের মাধ্যমেই। এই প্রক্রিয়াটি শুরু হয় মূলত ব্যক্তির পারিবারিক জীবন থেকে। আরো স্পষ্ট করে বললে মা, বাবা, ভাই, বোন থেকেই। তবে এটি সারা জীবনব্যাপী চলমান একটি প্রক্রিয়া। সামাজিকীকরণের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ আরেকটি ক্ষেত্র হলো শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান। এক্ষেত্রে শিক্ষার্থীর শিক্ষক, সহপাঠী বিশেষ ভূমিকা পালন করেন। এমনকি অনেক শিক্ষার্থী আছে, যারা তার মা-বাবার চেয়েও তার শিক্ষককে আদর্শ মনে করে এবং সে তার শিক্ষককে অনুসরণ করে। শিক্ষকের প্রত্যক্ষ কিংবা পরোক্ষ প্রভাবে শিক্ষার্থী প্রভাবিত হয়, হচ্ছে যুগ যুগ ধরে। কাজেই ব্যক্তির সামাজিকীকরণে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের ভূমিকা অন্য যে কোনো উপাদানের চেয়ে কম গুরুত্বপূর্ণ নয়।

তবলা ছাড়া গান আর চুন ছাড়া পান যেমন জমে না, তেমনি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের আলো-বাতাস গায়ে না মেখে যে শিক্ষা অর্জিত হয়, তাও অনেকেটা তবলা ছাড়া গানের মতো। আমরা যে যতই বলি না কেন, যা-ই বলি না কেন একজন শিক্ষার্থী যদি তার শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের ছোঁয়া না পায়, তার শিক্ষকদের সান্নিধ্যে না আসতে পারে, তার বন্ধুদের সঙ্গে ক্যাম্পাসে আড্ডা দিতে না পারে, হইহুল্লোড় না করতে পারে, তাহলে তার অর্জিত পুঁথিগত বিদ্যা খুব বেশি ফলপ্রসূ হবে না। স্কুল-কলেজে ক্লাস হয় না, লেখাপড়া হয় না বলে যারা বাজার গরম করেন তাদের বলি, আপনি আপনার সন্তানকে একবার জিগ্যেস করুন তো শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বন্ধ থাকায় তার অনুভূতি কেমন? কোনো শিক্ষার্থীই বলবে না, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বন্ধ থাকায় সে ভালো আছে। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান কেবল শিক্ষা প্রদান কিংবা শিক্ষা অর্জনের ক্ষেত্রই নয় বরং একজন মানবসন্তানকে সামাজিক মানুষ, সুনাগরিক করে গড়ে তোলা, মানবিক মানুষ হয়ে ওঠার অন্যতম প্রধান চারণভূমিও। অর্থাত্, ব্যক্তির সামাজিকীকরণের অন্যতম উর্বর ভূমি হচ্ছে এই শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান।

বর্তমান এই পেনডেমিক প্রেক্ষাপটে শিক্ষাদান প্রক্রিয়া অব্যাহত রাখা হয়েছে অনলাইন শিক্ষা প্রদান প্রক্রিয়ার মাধ্যমে। উপায় নেই, বিকল্পও নেই, যদিও এ প্রক্রিয়ায় শিক্ষক-শিক্ষার্থী কেউই পুরোপুরি সন্তুষ্ট নন। সুযোগ-সুবিধার অভাবে যারা অনলাইন ক্লাসে অংশগ্রহণ করতে পারছে না, তাদের কথা না হয় বাদই দিলাম, যাদের অনলাইনে ক্লাস করার যথেষ্ট সুযোগ-সুবিধা আছে তারাও কি স্বাচ্ছন্দ্যে ক্লাস করছে! না করছে না, করার কথাও নয়, কারণ এ প্রক্রিয়াটি আমাদের জন্য স্বাভাবিক কোনো প্রক্রিয়া নয়। একজন ছাত্র, সে যদি মাধ্যমিক বা উচ্চমাধ্যমিক কিংবা উচ্চশিক্ষার শিক্ষার্থী হয়, তাহলে সারা দিন ঘরে বসে বসে অনলাইনে ক্লাস করে খুব স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করবে তা আশা করা অনুচিত। আমরাও ছাত্র ছিলাম। একদিন কলেজে না গেলে কিংবা ক্লাস না করতে পারলে সারা দিনটাই ব্যর্থ মনে হতো। উচ্চশিক্ষার ক্ষেত্রে শিক্ষার্থীদের শিক্ষামূলক আড্ডার কোনো বিকল্প নেই।

একজন শিক্ষার্থী কলেজে যাবে, ক্লাস করবে, শিক্ষকদের সঙ্গে মতবিনিময় করবে, বন্ধুদের সঙ্গে গল্পগুজব করবে, খেলাধুলা করবে, কমনরুমে বসে সহপাঠীদের সঙ্গে আড্ডা মারবে—তবেই না তার প্রাতিষ্ঠানিক সামাজিকীকরণ সম্পন্ন হবে। বর্তমান অবস্থায় শিক্ষা অর্জনে শিক্ষার্থীরা যত না পিছিয়ে যাচ্ছে, তার চেয়ে বেশি পিছিয়ে যাচ্ছে সামাজিক জীব হয়ে ওঠার ক্ষেত্রে। অনেক শিক্ষার্থী ঘরে বসে বসে অনেকটাই মানসিকভাবে বিপর্যস্ত হয়ে যাচ্ছে। করোনার প্রত্যক্ষ ক্ষতির তুলনায় এই প্রচ্ছন্ন ক্ষতি কিন্তু কম নয় এবং এর প্রতিক্রিয়া গোটা জাতিকে দীর্ঘদিন বহন করতে হবে। একজন শিক্ষার্থী কীভাবে শিক্ষা গ্রহণ করে তা অনেকটাই বোঝা যায় এবং জানাও যায় কিন্তু তার সামাজিকীকরণ হয় নীরবে-নিভৃতে, যা সরাসরি প্রত্যক্ষ করা যায় না। শিক্ষার তুলনায় এই অপ্রত্যক্ষিত সামাজিকীকরণের গুরুত্ব ব্যক্তিজীবনে কিংবা সামাজিক জীবনে কোনোভাবেই কম নয়। শিক্ষায় ব্যক্তির আত্মজ্ঞান বৃদ্ধি পায় আর সামাজিকীকরণের মাধ্যমে ব্যক্তির আত্মোপলব্ধি ঘটে। জীবনে পূর্ণতা লাভের অন্যতম প্রধান একটি মাধ্যম হলো আত্মোপলব্ধি। একটি সমাজের প্রতিটি সদস্যের যেদিন আত্মোপলব্ধি ঘটবে, সেদিন সে সমাজ থেকে সব ধরনের পঙ্কিলতা, সামাজিক হানাহানি, কপটতা, কূপমণ্ডূকতা দূর হবে। আমরা একটি সুস্থ সমাজ ব্যবস্থার দেখা পাব।

করেনার তাণ্ডবে আমাদের ভবিষ্যত্ প্রজন্ম যাতে মুখ থুবড়ে না পড়ে যায়, তার জন্য পরিকল্পনা মোতাবেক আমাদের আগাতে হবে। এটি করতে হবে রাষ্ট্রীয় পরিকল্পনার অংশ হিসেবে গুরুত্ব সহকারে। একটি প্রজন্ম যদি ট্র্যাক আউট হয়ে যায়, তাহলে কোনো উন্নয়ন প্রকল্পই আমাদের কাজে আসবে না। মানবসম্পদের চেয়ে বড় কোনো সম্পদ এখনো আবিষ্কার হয়নি। রাষ্ট্রের পাশাপাশি পরিবারকেও এ দায়িত্ব নিতে হবে। আমাদের সন্তানরা ঘরে বসে বসে একগুঁয়ে হয়ে যাচ্ছে, পড়াশোনায় মন বসাতে পারছে না। খুবই স্বাভাবিক, এমন অবস্থায় তারা কিছুটা বিপর্যস্ত হচ্ছে, হবেই। তাই বলে তাদেরকে বিমুখ করবেন না। তাদের পাশে থাকুন, ভরসা দিন; বলুন, এ গ্রহণের কাল চিরস্থায়ী নয়, সুদিন আসবেই, অন্ধকার তিরোহিত হয়ে আলো ফুটবেই।

শিক্ষা হোক আনন্দদায়ক, আনন্দময় শিক্ষার কোনো বিকল্প নেই।

n লেখক :প্রফেসর, বিভাগীয় প্রধান, দর্শন বিভাগ, মৌলভীবাজার সরকারি কলেজ