আজ ৮ আগস্ট বঙ্গমাতা ফজিলাতুন্নেছা মুজিবের জন্মদিবস। বঙ্গবন্ধু বলতেন, ‘আমার জীবনে রেণু (বঙ্গমাতার ডাক নাম) না এলে আমি বঙ্গবন্ধু হতে পারতাম না’—এই কথাটার চাইতে বড় সত্য আর কিছু নেই। অনেকে বলেন, মহাত্মা গান্ধীর পত্নী কস্তুরাবাই গান্ধীর মধ্যে স্বামীপ্রেম ও দেশপ্রেম যুক্ত হয়ে ছিল। কেউ কেউ বলেন, খেলাফত আন্দোলনের নেতা মওলানা মোহাম্মদ আলী ও মওলানা শওকত আলীর মা বি আম্লা বেগমের মধ্যে ধর্মপ্রেম ও দেশপ্রেম যুক্ত হয়েছিল। আমার মতে, বেগম ফহিলাতুন্নেসার চরিত্র বাংলাদেশের রাজনীতিতে সর্বাপেক্ষা মহত্ অথচ উপেক্ষিত চরিত্র। বঙ্গবন্ধুকে নিয়ে আলোচনার অন্ত নেই। গত বছর জন্মশত বার্ষিকীতেও বঙ্গবন্ধুর জীবনের নানা দিক নিয়ে আলোচনা হয়েছে। এখনো হচ্ছে। কিন্তু সেই আলোচনার ভিড়ে বেগম মুজিব অনেকটা তলিয়ে গেছেন। কিছু আলোচনা যে হয়নি তা নয়, কিন্তু এই মহীয়সী মহিলার চরিত্র বৈশিষ্ট্যের বিভিন্ন দিক নিয়ে বিশদ আলোচনা হয়নি। আমি তাকে খুব কাছ থেকে দেখার সুযোগ পেয়েছি। আমি তাকে তুলনা করি দেশবন্ধু চিত্তরঞ্জন দাশের পত্নী বাসন্তী দেবীর সঙ্গে।
দেশবন্ধুর মৃত্যুর পরেও তিনি বহুকাল বেঁচে ছিলেন। আমাদের মুক্তিযুদ্ধের সময় বাসন্তী দেবীকে আমি কলকাতায় তাদের বাসায় রোগশয্যায় দেখতে পাই। তিনি অল্প বয়সে বিধবা হয়েছেন। আবার একমাত্র ছেলে চিররঞ্জনের বয়স যখন ষোলো, তখন তাকে নিউমোনিয়া রোগে হারান। স্বামী ও পুত্রহারা দীর্ঘ জীবন তিনি সমাজসেবা করে কাটিয়েছেন। ব্রিটিশবিরোধী আন্দোলনে তিনি স্বামীর সঙ্গে ও একা বহুবার জেলে গেছেন। আমি যখন তাকে দেখি তখন তিনি রোগশয্যায়, চৈতন্য রহিত। তার এক সেবিকার কাছ থেকে দেশবন্ধু পত্নীর জীবনকথা জানি। বাংলাদেশের বঙ্গবন্ধুর ফজিলাতুন্নেছার জীবনকথাও জানি। তা বাসন্তী দেবীর জীবনের মতো বিস্ময় ও বৈচিত্র্যে ভরা। স্বামী, পুত্র ও পুত্রবধূদের নিয়ে দেশের জন্য একই রাতে আত্মহুতি দিয়েছেন তিনি। স্বামীপ্রেম ও দেশপ্রেম তার কাছে মিলেমিশে একাকার হয়ে গিয়েছিল।
বিএনপি সরকারের “সঠিক ইতিহাস চর্চার” ফলে বঙ্গবন্ধু ও বঙ্গবন্ধু পরিবারের শহিদ সদস্যদের, এমনকি বঙ্গমাতা বেগম ফজিলাতুন্নেছার অত্যুজ্জ্বল স্বামীপ্রেম ও দেশপ্রেমের ইতিহাস তলিয়ে যেতে বসেছিল। বঙ্গমাতার সঙ্গে আমার পরিচয় ছিল। তাকে আমি ঘনিষ্ঠভাবে জানতাম। ফলে শেখ হাসিনা ক্ষমতায় আসার বহু আগে ১৯৯২ কি ১৯৯৩ সালে লন্ডনে আমি তার জন্মদিন প্রথম পালনের ব্যবস্থা করি। লন্ডনের টয়েনবি হলে তিন ঘণ্টাব্যাপী এই অনুষ্ঠানটি হয়। আমাদের সৌভাগ্যবশত শেখ হাসিনা এই সময় লন্ডনে ছিলেন। শেখ মুজিব রিসার্চ সেন্টারের পক্ষ থেকে পারভীন সুলতানা বঙ্গবন্ধুকন্যার কাছ থেকে তার মহীয়সী মা সম্পর্কে আড়াই ঘণ্টাব্যাপী একটি ইন্টারভিউ গ্রহণ করেন। ইন্টারভিউটি ছিল রেকর্ডকৃত। হল-ভর্তি দর্শকদের সামনে এই ইন্টারভিউটি প্রচার করা হয়।
বেগম মুজিবের জন্মদিন প্রথমবারের মতো পালন দ্বারা আমার মনে হয়েছে বঙ্গমাতার কাছে আমাদের বিরাট দায়বদ্ধতা কিছুটা হলেও শোধ করেছি। অন্তত ব্রিটেনে প্রবাসী বাংলাদেশিদের কাছে বাংলার মানুষের অধিকার আদায়ে স্বামীর পাশে দাঁড়িয়ে তার বিরাট অবদানের কথা তুলে ধরতে পেরেছি। ইতিহাসখাদক বিএনপি গৌরবের যে উজ্জ্বল ইতিহাস খেয়ে হজম করে ফেলতে চেয়েছিল তা উদিগরণ করে ফেলতে আমরা তাদের বাধ্য করেছি। এখন বঙ্গমাতা বহুল আলোচিত।
বঙ্গপিতাকে যেহেতু আমি ভাই ডাকি, সেহেতু বঙ্গমাতাকে আমি ভাবি ডাকতাম। বঙ্গবন্ধুর সঙ্গে আমার আগে পরিচয় হলেও বেগম মুজিবের সঙ্গে আমার পরিচয় ১৯৫৮ সালের অক্টোবর মাসে। আইয়ুবের ক্ষমতা দখলের সময়। এই সময় পাকিস্তানে কেন্দ্রীয় সরকার হিসাবে ক্ষমতায় ছিল স্যার ফিরোজ খান নুনের নেতৃত্বে কোয়ালিশন সরকার। সাবেক পূর্ব পাকিস্তানে ছিল আওয়ামী লীগের আতাউর রহমান খানের সরকার। মুজিব ভাই সংগঠনের কাজ করার জন্য আগেই মন্ত্রিসভা ত্যাগ করেছিলেন কিন্তু তখনো আব্দুল গণি রোডের সরকারি বাসা ত্যাগ করেননি। তাদের ৩২ নম্বরের ধানমন্ডির বাসার নির্মাণ তখনো শেষ হয়নি।
আইয়ুব খান বন্দুকের জোরে কেন্দ্রে ও প্রদেশগুলোতে মন্ত্রিসভা ভেঙে দিয়েই ক্ষান্ত হননি, মন্ত্রীদের ২৪ ঘণ্টার মধ্যে সরকারি বাসভবন ছেড়ে দেওয়ার নোটিশ দেন। অন্যান্য মন্ত্রীরা যার যা পাট গুছিয়ে চলে যান। কিন্তু বিপদ দেখা দিল বঙ্গবন্ধু পরিবারের। আইয়ুব তাদের ভয় করতেন এবং এক নম্বর শত্রু বলে বিবেচনা করতেন। বঙ্গবন্ধুর তখন ঢাকায় কোনো বাড়িঘর নেই। বঙ্গবন্ধুকে তো গ্রেফতার করে জেলে পাঠানো হয়েছে। কিন্তু তার স্ত্রী ছেলেমেয়ে কোথায় যাবেন? আত্মীয়রা আইয়ুবের ভয়ে মুখ ফিরিয়ে নিয়েছে। বন্ধুবান্ধবেরা তার পরিবারকে বাড়ি ভাড় দিতে চান না।
আমি তখন সদ্য বিবাহিত। পুরান ঢাকার স্বামীবাগের গলিতে একটি একতলা বাড়িতে স্ত্রীকে নিয়ে সদ্য উঠেছি। বাড়িটার এক অংশে ইটের গাঁথুনি অন্য অংশে টিনের ঘর। টিনের ঘরে ইলেকট্রিসিটি নেই। এটাচড বাথরুম নেই। এই সময় ইত্তেফাকের প্রতিষ্ঠাতা সম্পাদক প্রয়াত তফাজ্জল হোসেন মানিক মিয়া আমাকে ডেকে পাঠালেন। আমি ইত্তেফাকের সম্পাদকীয় বিভাগে চাকরি করি। মানিক ভাই একটু ইতস্তত করে বললেন, তোমাকে একটা অনুরোধ জানাব। রাখতে পারবে? বললাম কী অনুরোধ মানিক ভাই? তিনি বললেন, আমি জানি তুমি নতুন বিয়ে করেছ। নতুন বাড়িতে উঠেছ। এদিকে মজিবর মিয়াকে সরকার সরকারি বাড়ি ছাড়ার নোটিশ দিয়েছে। ২৪ ঘণ্টার নোটিশ। ওরা কেথায় যাবে। তুমি কি তোমার বৌকে শ্বশুরবাড়িতে সাত দিনের জন্য রেখে বাড়িটা মজিবর মিয়ার পরিবারের জন্য ছেড়ে নিতে পারবে? তিনি বঙ্গবন্ধু পরিবারের অবস্থা আমাকে বুঝিয়ে বললেন।
আমি তো বাড়ি ছাড়তে রাজি। কিন্তু বাড়িটার কন্ডিশন ভালো নয়। বঙ্গবন্ধুর পরিবার কি ঐ বাড়িতে থাকতে পারবেন? মানিক ভাই বললেন, খুব পারবেন। আরে মাথার ওপর একটা ছাদ থাকবে তো। তুমি বিকালেই ওদের সঙ্গে দেখা করো। তোমার বাড়িতে ওঠার ব্যবস্থা করে দাও।
মুজিব পরিবার আমার বাসায় উঠবেন। ভাবতেই গর্ববোধ করেছি। বিকালেই চলে গেলাম মুজিব পত্নীর কাছে। তিনি আমাকে দেখে হেসে বললেন, তুমিই গাফ্ফার চৌধুরী? বললাম, হ্যাঁ বাড়ির চাবি নিয়ে এসেছি। তিনি বললেন, বসো চা খাও। তারপর বললেন, তুমি যে আমাদের জন্য এত কষ্ট করতে রাজি হয়েছ তাতে খুশি হয়েছি। তবে তোমার বাড়িটা আমাদের লাগবে না ভাই। আমাদের পরিচিত একজনের বাসা পেয়েছি। মানিক ভাইকে সে কথা জানিয়ে দিয়েছি। আমার উত্সাহটা একটু দমে গিয়েছিল। কী করব, সালাম জানিয়ে চলে এসেছি।
এই প্রথম আমার ভাবিকে দেখা। ব্যক্তিত্বময় সুন্দর চেহারা। গায়ের রঙ খুবই ফর্সা। পান খেয়ে ঠোট লাল করেছেন। পরনে সাধারণ শাড়ি। এরপর তাকে বহুবার দেখেছি। কিন্তু তার প্রথম দেখা চেহারাটাই আবার মনে উজ্জ্বল হয়ে আছে। তার সঙ্গে আমার ব্যক্তিগত ও রাজনৈতিক অনেক স্মৃতি। বঙ্গবন্ধুর মতো নেতার পত্নী হয়ে তিনি সাধারণ মানুষের সঙ্গে কত সহজভাবে মিশতে পারতেন তার একটা উদাহরণ দিচ্ছি।
সম্ভবত ১৯৬৮ সালের কথা। আমার শ্বশুর তখন গুরুতর অসুস্থ। ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালের তেতলার একটি কেবিনে রেখে তার চিকিত্সা চলছে। আমি আজাদে চাকরি করি। বাসা নারিন্দায়। বিকালের শিফটের কাজ সেরে বাসায় ফিরতে পারি না। দোকান থেকে শুকনা রুটি খেয়ে সারা রাত শ্বশুরের কেবিনে জেগে থেকে তাকে পাহারা দি। দিন দুই পরে বেগম মুজিব তার বড় মেয়ে শেখ হাসিনাকে নিয়ে হাসপাতালে তেতলায় আমার শ্বশুরের পাশের কেবিনে এলেন। শুনলাম শেখ হাসিনার অ্যাপেন্ডিসাইটিস অপারেশন হবে।
আমাকে দেখে ভাবি খুশি হলেন। বললেন, ‘ভালোই হয়েছে, তুমি আছ। আমি যখন বাসায় যাব, তুমি হাসিনাকে পাহারা দিও। আর তুমি যখন বাসায় খেতে যাবে, আমি তোমার শ্বশুরকে পাহারা দেব।’ শুধু বলা নয়, কিছুদিনের জন্য তিনি এই ব্যবস্থাটা বলবত্ করেছিলেন। আমার প্রায় অজ্ঞান শ্বশুরের মাথার কাছে ফ্লোরে বসে তিনি পানদানি থেকে পান-সুপারি বের করে সুপুরি কাটতেন। আমি এই অসাধারণ মহিলার সাধারণ বেশভূষা ও অমায়িক ব্যবহার দেখে বিস্মিত হতাম। হাসপাতালের বয়বেয়ারা নার্সেরাও তার এক ডাকে ছুটে আসেন। বঙ্গবন্ধু ক্ষমতায় থাকাকালে শেখ কামাল যখন গুলিবিদ্ধ হয়ে মূমুর্ষু অবস্থায় হাসপাতালে ছিলেন, তখনও তাকে অধীর ও অধৈর্য্য হতে দেখিনি। সবাইকে তিনি সাহস ও সান্ত্বনা দিয়েছেন। নিজের মুখে টেনে রেখেছেন একটি সৌম্য, শান্ত হাসি। তার সম্পর্কে আরো অনেক কাহিনি জানি। বারান্তরে তা লেখা যাবে। বঙ্গবন্ধু যদি হন বিশ শতকের শ্রেষ্ঠ বাঙালি, তাহলে নিঃসন্দেহে বেগম ফজিলাতুন্নেছা মুজিব বিশ শতকের একজন শ্রেষ্ঠ বাঙালি মহিলা।
n লন্ডন, ৭ আগস্ট, শনিবার,২০২১
