সেই ৮ মার্চ ২০২০ থেকে সবার মধ্যে শুরু হয়েছে একটা অজানা আতঙ্ক, হতাশা আর অস্থিরতা। করোনা নামের ছোট্ট একটা ভাইরাস সবকিছু ওলট-পালট করে দিয়েছে। স্বাভাবিক জীবনযাপন করতে পারছে না কেউ। দিন দিন সংক্রমণ ও মৃত্যু দেখে আঁতকে উঠেছে সবাই। অনেক অফিস-কারখানা, ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান বন্ধ হয়ে গেছে। দেড় কোটিরও বেশি লোকের আয় কমেছে। লাখ লাখ মানুষ বেকার ও কর্মহীন হয়ে পড়েছে। সংক্রমণের ভয়াবহতায় ১৭ মার্চ ২০২০ থেকে বন্ধ হয়ে যায় সব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান। লকডাউন দিয়ে জনগণকে ঘরে রাখার প্রয়োজন হয়ে পড়ে। এখনো অসংখ্য মানুষ চাকরি হারিয়ে বেকার হয়ে মানবেতর জীবনযাপন করছে। অনেকে জীবিকার তাগিদে চাকরি হারিয়ে অত্যন্ত ছোট কোনো ব্যবসা করছে, বাধ্য হয়ে অনেকে রিকশাও চালাচ্ছে পেটের তাগিদে।
মাঝখানে একটু দুর্বল হলেও ভাইরাসটি আবার হাঁটছে প্রচণ্ড দাপটের সঙ্গে। অনেকে নিজেকে অত্যন্ত সাহসী মনে করে বাইরে চলাফেরা করছে স্বাস্থ্যবিধি না মেনে। পরিণতিতে বন্ধ হচ্ছে না সংক্রমণ, থামছে না মৃত্যু। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোতে সেই যে তালা ঝুলছে, এখনো খোলার মতো অবস্থা বা পরিবেশ তৈরি হচ্ছে না। ফলে অনেক মেধাবী শিক্ষার্থী অকালে ঝরে যাচ্ছে। পড়ালেখার দীর্ঘ বিরতিতে অনেকে বিপথে যাচ্ছে। কোনো কোনো ক্ষেত্রে অনলাইনে ক্লাস করার অজুহাতে মোবাইল-ল্যাপটপ এখন তাদের নিত্যসঙ্গী হয়ে দাঁড়িয়েছে। প্রযুক্তির এই সুফলের পাশাপাশি এসবের অপব্যবহার বা কুফলও জড়িয়ে ধরেছে তাদের খুব সহজভাবে। বন্ধু-বান্ধবের সঙ্গে কেউ মিশতে পারছে না, বাইরে যেয়ে খেলাধুলা করতে পারছে না স্বাধীনভাবে। ঘরের চার দেওয়ালের মধ্যে বন্দি থেকে এবং মোবাইল-ল্যাপটপে মগ্ন থেকে বেশির ভাগ শিক্ষার্থীই মানসিকভাবে অসুস্থ হয়ে পড়ছে। অন্যদিকে, লকডাউনে অফিস- আদালত বন্ধ থাকায় ঘরবন্দি হয়ে পড়ছে অসংখ্য চাকরিজীবী মানুষ। কোনো কোনো সময় আবার লকডাউনে অফিস খোলা থাকলেও গণপরিবহন বন্ধ রাখার অযৌক্তিক সিদ্ধান্তের ফলে অফিসে যোগদান করাটা কঠিন ও অসম্ভব হয়ে পড়ছে।
সত্যি কথা বলতে কী, রাষ্ট্র এখন হিমশিম খাচ্ছে পরিস্থিতি সামাল দিতে এবং মোকাবিলা করতে। মহামারির সংক্রমণ ও মৃত্যু থেকে বাঁচাতে জনগণকে কোনোভাবেই সচেতন করতে পারছে না রাষ্ট্র। লকডাউন, কঠোর লকডাউন এবং কঠোর থেকে কঠোরতম লকডাউন দিয়েও জনগণকে এখন আর ঘরে আটকিয়ে রাখা সম্ভব হচ্ছে না।
রাষ্ট্রকে পথে নামাতে হয় আইনশৃঙ্খলা বাহিনী, জরিমানা গুনতে হয় লকডাউন না মেনে অপ্রয়োজনে বাইরে আসার জন্য কিংবা মুখে সামান্য একটি মাস্ক না পরার জন্য! কোনোভাবেই যেন আমরা বুঝতে চাই না, এই মহামারি দীর্ঘ প্রায় দেড়টি বছর ধরে দাপটের সঙ্গে ঘুরে বেড়াচ্ছে আমাদের সামান্য অসচেতনতা এবং সঠিক ও কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণের অভাবে। রাষ্ট্রের সব পরিকল্পনায় কার্যকর সব ব্যবস্থা যেন অচল হয়ে পড়ছে দিন দিন এক শ্রেণির মানুষের অহেতুক অতি সাহসিকতায়। তবে এতদিনে যেন রাষ্ট্রের হুঁশ হয়েছে, এভাবে জনগণকে আর সচেতন করা যাবে না কিংবা বিভিন্ন নামের লকডাউনের ঘোষণা দিয়ে তাদের ঘরে আটকে রাখা যাবে না। ভ্যাকসিন বা টিকা নিয়ে বিভিন্ন গুজব, অবহেলা আর নাটকের আবির্ভাব হলেও বিশেষজ্ঞ মহল অনেক দিন ধরেই বলে আসছিলেন, জনগণকে পুরোপুরি স্বাস্থ্যবিধি মানানো এবং শতভাগ মাস্ক পরিয়ে সচেতন করানো আমাদের দেশে সত্যিই কঠিন; একমাত্র টিকা কার্যক্রমই এক্ষেত্রে দিতে পারে সফলতা। আর তাই এখন টিকা কার্যক্রমে বেশি ঝুঁকতে যাচ্ছে সরকার। পরিস্থিতির দ্রুত উন্নয়ন এবং বাস্তব সফলতার প্রত্যাশায় অপেক্ষা করছে সচেতন মহল। জানি না, আর কতদিন এভাবে আমাদের অপেক্ষা করতে হবে? বিশেষ করে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলো খোলার ব্যাপারে এখনই দ্রুত কার্যকরী ব্যবস্থা গ্রহণ না করলে অসংখ্য ফুল কুঁড়ি অবস্থাতেই ঝরে পড়বে অকালে, এতে কোনো সন্দেহ নেই। দীর্ঘদিন লেখাপড়া বন্ধ থাকার ফলে অনেক পরিবার তার মেয়ে সন্তানকে অল্প বয়সেই বিয়ে দিতে বাধ্য হচ্ছে। পাশাপাশি ছেলে সন্তানকেও লেখাপড়া বন্ধ করে উপার্জনের পথে নামাচ্ছে। অন্যদিকে, মোবাইল-ল্যাপটপে বিভিন্ন সামাজিকমাধ্যম ব্যবহারের ফলে এবং ঘরে বন্দি থাকার ফলে শিক্ষার্থীরা বিভিন্ন ধরনের মানসিক সমস্যায় ভুগছে কিংবা অনেক ক্ষেত্রে বিপথে চলে যাচ্ছে। তাছাড়া বর্তমান এ পরিস্থিতিতে চাকরি হারিয়ে বেকারত্বের হার যেমন বাড়ছে, তেমনি পাশাপাশি বাড়ছে খুন, ধর্ষণ, হত্যাসহ বিভিন্ন ধরনের অপরাধ প্রবণতা।
সবাইকে ভাবতে হবে, বুঝতে হবে—আমরা কতদিন ধরে প্রাণ খুলে সবার সঙ্গে মিশতে পারি না, বাইরে যেয়ে প্রকৃতির বিশুদ্ধ নির্মল বাতাসে প্রাণভরে নিঃশ্বাস নিতে পারি না! আমরা সবাই উন্মুখ হয়ে বসে আছি—আবার কবে স্বাভাবিক অবস্থা ফিরে পাব? কবে আমরা এ কঠিন অবস্থা থেকে পরিত্রাণ পাব? কবে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোতে আবার আগের মতো স্বাভাবিক অবস্থা ফিরে আসবে? কবে সবাই আবার দল বেঁধে আনন্দে হইচই করতে পারব? সন্তান, পরিবার এবং প্রিয়জনদের মুখে সুস্থ হাসি দেখতে পাব? খুব শিগিগরই সেই সুস্থ-স্বাভাবিক দিনটি আবার ফিরে পাব এ প্রত্যাশা আমরা করতেই পারি। তবে এজন্য অবশ্যই দরকার সবার আগে আমাদের নিজেদের মধ্যে সচেতনতাবোধ জাগ্রত করা। পাশাপাশি দ্রুত টিকা কার্যক্রম নিশ্চিতসহ প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ গ্রহণে সরকার তথা রাষ্ট্রকে নিতে হবে কার্যকরী ও যথাযথ ব্যবস্থা। সবাইকে বুঝতে হবে—আমরা সবাই কঠিন এ মহামারি থেকে মুক্তি চাই, স্বাভাবিক অবস্থায় জীবনযাপন করতে চাই।
n নিবন্ধকার
