কেরানীগঞ্জ দাপিয়ে বেড়াচ্ছে একাধিক কিশোর গ্যাং

আপডেট : ০৭ আগস্ট ২০২১, ২২:০২

পক্ষকালের ব্যবধানে এক জনকে হত্যা, তিন জনকে ছুরিকাঘাত,

হাসপাতালে মৃত্যুর সঙ্গে লড়ছে এক জন

এইচ এম আমীন

   কেরানীগঞ্জ (ঢাকা) সাংবাদদাতা

কেরানীগঞ্জ দাপিয়ে বেড়াচ্ছে একাধিক কিশোর গ্যাং। মাত্র ১৫ দিনের ব্যবধানে তারা ছুরিকাঘাতে এক জনকে হত্যা করেছে। তাদের ছুরিকাঘাতে জখম হয়েছে তিন জন। তারা ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে মৃত্যুর সঙ্গে পাঞ্জা লড়ছে। জানা গেছে, জিঞ্জিরা বেড়িবাঁধ, থানারঘাট, বালুর মাঠ, আগানগর, আমবাগিচা ও কদমতলী এলাকার ত্রাস কিশোর গ্যাংয়ের গডফাদার শাহ আলম, মুকুল, সোহাগ, রবিন, টিটু ও সুজন। তাদের নেতৃত্বে  দুই শতাধিক কিশোর জড়িত নানা অবৈধ কর্মকাণ্ডে। তারা বিভিন্ন গ্রুপে ভাগ হয়ে চুরি, ছিনতাই ও চাঁদাবাজি করে।

তাদেরই একটি গ্রুপ বাবুবাজার সেতুতে পথচারীদের কাছ থেকে টাকাপয়সা ও মোবাইল ফোনসেট ছিনতাই এবং বিভিন্ন জেলা থেকে আগত কাপড় ব্যবসায়ীদের সর্বস্ব লুট করে। এ ছাড়া জিঞ্জিরা বাজার এলাকায় ব্যাবসায়ীদের কাছ থেকে চাঁদা আদায় ও ইয়াবাসহ বিভিন্ন মাদক পাইকারি ও খুচরা বিক্রি করার অভিযোগ রয়েছে কিশোর গ্যাং সদস্যদের বিরুদ্ধে। এ সব অভিযোগ জানিয়েছেন এলাকার একাধিক ব্যবসায়ী, প্রবীণ রাজনৈতিক নেতা  ও সমাজসেবী।

সাইদুল নামে এক কাঠ ব্যবসায়ী জানান, তিনি ব্যাবসায়িক কারণে মডেল থানার জিঞ্জিরা টিনপট্টি রোড এলাকায় ভাড়া থাকেন। গত ৪ আগস্ট বিকালে তার ছেলে মুরাদকে কিশোর গ্যাংয়ের সদস্য ইমন, রাসেল ও রতন বেশ কিছু ইয়াবা ট্যাবলেট দিয়ে তা বুড়িগঙ্গার বেড়িবাঁধে বসে বিক্রি করে দেওয়ার জন্য চাপ দেয়। মুরাদ তাদের প্রস্তাবে রাজি না হওয়ায় ঐ দিন রাতে তারা বাসা থেকে মুরাদকে ডেকে নিয়ে ধারালো ছোরা দিয়ে পিঠ, পেট ও মাথায় ছয়টি জখম করে। স্বজনরা তাকে আহত অবস্থায় উদ্ধার করে ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি করে। কর্তব্যরত চিকিত্সকরা জানান, অতিরিক্ত রক্ত ক্ষরণের কারণে গত দুই দিনেও মুরাদের জ্ঞান ফিরেনি। তার অবস্থা আশঙ্কাজনক।

গত ১৮ জুলাই কদমতলী এলাকায় নগর পরিবহনের লেগুনাচালক সাগরকে কিশোর গ্যাং সদস্য টলটু সাগর ও নুরু ছিনতাইয়ে সহযোগী হওয়ার প্রস্তাব দেয়। সাগর তাতে রাজি না হওয়ায় তাকে ছুরিকাঘাতে জখম করে তারা। এলাকাবাসী সাগরকে উদ্ধার করে ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপালে ভর্তি করলে গত ১৯ জুলাই সাগর সেখানে মারা যায়। সে পিরোজপুর জেলার নাজিরপুর এলাকার জমির উদ্দিনের ছেলে।

এ ঘটনার পর র্যাব (১০) কোম্পানি কমান্ডার মেজর ওয়াহেদুজ্জামান ও আবুল কালাম আজাদের নেতৃত্বে র্যাব সদস্যরা গত ২২ ও ২৩ জুলাই আগানগর ও কদমতলীতে অভিযান চালিয়ে রনি, কোরবান, রিপন, রতন, আকাশ, আজগর, আল আমিন, তায়েব, আহাদ, বুস্টার, শাওন, তাজুল, আলী আজগর, রিয়াজ, আনোয়ার, রবিন ও হকি শাওনসহ ১৭ কিশোর গ্যাং সদস্যকে আটক করে। এ সময় তাদের কাছ থেকে ১১টি চাকু ও ১৭টি মোবাইল ফোনসেট ও বিপুল পরিমাণ মাদকদ্রব্য উদ্ধার করা হয়।

কদমতলী এলাকার যুবলীগ নেতা ও মসজিদ কমিটির সভাপতি হাজি নাসির উদ্দিন জানান, কিশোর গ্যাং সদস্যরা দিনদিন ভয়ংকর হয়ে উঠছে। দুই শতাধিক কিশোর গ্যাং সদস্য ভিন্ন ভিন্ন দলে বিভক্ত হয়ে প্রতিদিন দক্ষিণ কেরানীগঞ্জ থানার ঝিলমিল আবাসিক হাউজিং এলাকা, চুনকুটিয়া, কদমতলী, শুভাঢ্যা, আগানগর, কালীগঞ্জ, কেরানীগঞ্জ মডেল থানার জিঞ্জিরা, মান্দাইল ও মনু ব্যাপারীর ঢাল এলাকাসহ বাবুবাজার সেতুতে ছিনতাই, চাঁদাবাজি ও বিভিন্ন মাদক বিক্রি করে আসছে।

কেরানীগঞ্জ উপজেলা সাবেক যুবলীগ সভাপতি ও বর্তমান আওয়ামী লীগ নেতা হাজি মোস্তাক হোসেন জানান, এলাকার  কয়েক জন প্রভাবশালীর প্রশ্রয়ে কেরানীগঞ্জে কিশোর গ্যাং মাথাচাড়া দিয়ে উঠেছে। তাদের মাদক বিক্রির কারণে এলাকার যুবসমাজ ধ্বংসের মুখে। বাড়ছে ছিনতাই, চাঁদাবাজি ও ধর্ষণের মতো বিভিন্ন অপরাধ। কয়েক মাস আগে আগানগর বেড়িবাঁধ এলাকায় চাঁদা না দেওয়ায়  কিশোর গ্যাং সদস্যরা ডাইং কারখানার মালিক হাজি রফিক আহমেদ নামে এক ব্যবসায়ীকে কুপিয়ে হত্যা করে। বর্তমানে কেরানীগঞ্জে  কিশোর গ্যাং সদস্যদের অত্যাচারে ও মাদকের ভয়ংকর থাবায় এলাকাবাসী অসহায় হয়ে পড়েছে।