বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রজ্ঞাপন

মেয়াদি আমানতের সুদহার মূল্যস্ফীতির কম হবে না

আপডেট : ০৮ আগস্ট ২০২১, ২১:৩২

ইত্তেফাক রিপোর্ট

এখন থেকে কোনো ব্যাংক মূল্যস্ফীতির হারের চেয়ে মেয়াদি আমানতে সুদ কম দিতে পারবে না। তিন মাস বা তার বেশি মেয়াদের জন্য ঘোষিত আমানতের ক্ষেত্রে এ নির্দেশনা কার্যকর হবে। তবে ঋণের সর্বোচ্চ সুদহারের সীমা বর্তমানের মতো ৯ শতাংশে অপরিবর্তিত থাকবে। গতকাল রবিবার এ বিষয়ে একটি প্রজ্ঞাপন জারি করে ব্যাংকগুলোর প্রধান নির্বাহীদের কাছে পাঠানো হয়।

আমানতকারীদের স্বার্থ সুরক্ষা এবং ব্যাংকিং খাতে দায়-সম্পদের ভারসাম্যহীনতা রোধে কেন্দ্রীয় ব্যাংক এ সিদ্ধান্ত নিয়েছে। মেয়াদি আমানতে বর্তমানে তিন থেকে ৫ শতাংশ সুদ পাওয়া যাচ্ছে। বেশি মেয়াদি আমানতে ৬ শতাংশ সুদ নির্ধারিত আছে। অথচ সাম্প্রতিক সময়ে গড় মূল্যস্ফীতি রয়েছে ৬ শতাংশের মতো।

প্রজ্ঞাপনে বলা হয়েছে, ব্যক্তি পর্যায়ের মেয়াদি আমানত এবং বিভিন্ন সরকারি-বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের প্রভিডেন্ট ফান্ড, অবসরোত্তর পাওনাসহ বিভিন্ন পাওনা পরিশোধের লক্ষ্যে গঠিত তহবিলের যে কোনো পরিমাণের মেয়াদি আমানতের ওপর সুদহার কোনোভাবেই মূল্যস্ফীতির চেয়ে কম নির্ধারণ করা যাবে না। তবে প্রাতিষ্ঠানিক আমানতের ক্ষেত্রে এ নিয়ম প্রযোজ্য হবে না।

এতে বলা হয়, তিন মাস ও তার বেশি মেয়াদি আমানতের ওপর সুদহার নির্ধারণের ক্ষেত্রে এ নির্দেশনা মানতে হবে। যে মাসের সুদহার নির্ধারণ করা হবে তার তিন মাস আগের ১২ মাসের গড় মূল্যস্ফীতি বিবেচনায় নিতে হবে। অর্থাত্ আগস্টে আমানতের সুদহার নির্ধারণের ক্ষেত্রে মে মাসের গড় মূল্যস্ফীতি বিবেচনায় নিতে হবে। গত মে মাসে গড় মূল্যস্ফীতি ছিল ৫ দশমিক ৫৯ শতাংশ।

বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রজ্ঞাপনে আরো বলা হয়েছে, ব্যাংকের তহবিলের প্রধান উত্স আমানতকারীদের থেকে সংগৃহীত অর্থ। আমানতের ওপর সুদহার অতিমাত্রায় কমলে ভবিষ্যতে ব্যাংকের আমানতের ওপর বিরূপ প্রভাব পড়তে পারে। ফলে ব্যাংকের দায়-সম্পদ ব্যবস্থাপনায়ও ভারসাম্যহীনতা সৃষ্টি হতে পারে। ব্যাংক থেকে পাওয়া বিবরণী পর্যালোচনায় দেখা যায়, অধিকাংশ ব্যাংক মেয়াদি আমানতের ওপর মূল্যস্ফীতির হারের চেয়ে কম সুদ দিচ্ছে। ক্ষুদ্র আমানতকারীসহ অন্য আমানতকারীদের একটি অংশ তাদের জীবিকা নির্বাহের জন্য ব্যাংকে রক্ষিত আমানতের সুদের ওপর নির্ভরশীল। ব্যাংকে রক্ষিত মেয়াদি আমানতের ওপর মূল্যস্ফীতির হারের চেয়ে কম সুদ দেওয়ায় আমানতকারীদের ক্রয়ক্ষমতা কমছে। এতে করে তারা ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন। এছাড়া মেয়াদি আমানতের ওপর সুদহার অত্যধিক হ্রাস জনসাধারণের সঞ্চয় প্রবণতাকে নিরুত্সাহিত করে। ফলে আমানতকারীরা তাদের সঞ্চিত অর্থ ব্যাংকে রাখার পরিবর্তে ঝুঁকিপূর্ণ খাতসহ বিভিন্ন অনুত্পাদনশীল খাতে বিনিয়োগের প্রবণতা বাড়ছে।

গত বছরের ২৪ ফেব্রুয়ারি বাংলাদেশ ব্যাংকের এক নির্দেশনায় জানানো হয়, ২০২০ সালের ১ এপ্রিল থেকে ক্রেডিট কার্ড ছাড়া সব ঋণে সর্বোচ্চ সুদহার হবে ৯ শতাংশ। তবে আমানতে সুদহার নির্ধারণের ক্ষমতা ব্যাংকগুলোর ওপর ছেড়ে দেওয়া হয়। এরপর নিজেদের মুনাফা ধরে রাখতে ব্যাংকগুলো আমানতের সুদ ব্যাপক কমাতে শুরু করে। এর মধ্যে করোনা শুরু হওয়ায় ব্যাংকগুলোর সিআরআর দেড় শতাংশ কমানো, প্রণোদনার আওতায় ঋণ বিতরণের জন্য প্রায় ৬০ হাজার কোটি টাকার পুনঃঅর্থায়ন তহবিলসহ বিভিন্ন নীতি সহায়তার কারণে বাজারে তারল্য বেড়েছে। আবার গত অর্থবছর রেমিট্যান্সে রেকর্ড ৩৬ দশমিক ১০ শতাংশ প্রবৃদ্ধি হয়। এসব কারণে ব্যাংকগুলোর হাতে উদ্বৃত্ত তারল্য ব্যাপক বেড়েছে। অথচ গত জুন পর্যন্ত বেসরকারি খাতে ঋণ বেড়েছে মাত্র ৮ দশমিক ৩৫ শতাংশ। এসব কারণে গত জুন শেষে ব্যাংকগুলোর অলস তারল্য দাঁড়িয়েছে ৬২ হাজার ৫০০ কোটি টাকা। আর ২ লাখ ৩১ হাজার কোটি টাকা উদ্বৃত্ত রয়েছে। ফলে বেশির ভাগ ব্যাংক এখন আমানত নিতেই অনীহা দেখাচ্ছে।