করোনা মহামারিতে সমগ্র বিশ্বই আজ বিপর্যস্ত। উন্নত-অনুন্নত সকল দেশই করোনা পরিস্থিতি লইয়া পেরেশান। গত দেড় বত্সরেরও অধিক কাল ধরিয়া করোনা পৃথিবীর সকল কিছুতে ছন্দপতন ঘটাইয়াছে মারাত্মকভাবে। মানুষের জীবন ও জীবিকা আজ হুমকির মুখে। এমতাবস্থায় করোনার টিকা দিশেহারা মানুষের জন্য আশার আলো ও আশীর্বাদস্বরূপ। স্বাস্থ্যবিধি অনুসরণ, সামাজিক দূরত্ব বজায় ও সকল নাগরিককে টিকাদান কর্মসূচির আওতায় আনয়নের মাধ্যমে এই সর্বনাশা দুর্যোগ-দুর্বিপাক হইতে আমরা পরিত্রাণ লাভ করিতে পারি। আমরা সৌভাগ্যবান এই কারণে যে, অনেক দেশের পূর্বেই আমাদের দেশে শুরু হইয়াছে টিকাদান কর্মসূচি। টিকার যেই সংকট ছিল তাহা এখন আর নাই। আর সবচাইতে আনন্দের খবর হইল, করোনার টিকাদান কর্মসূচি এখন সমগ্র দেশে তৃণমূল পর্যায় পর্যন্ত ছড়াইয়া পড়িয়াছে। গত ৭ আগস্ট হইতে সমগ্র দেশে শুরু হইয়াছে ভ্যাকসিনেশন ক্যাম্পেইন। ইহার পাশাপাশি আগামী ১৪ আগস্ট হইতে দেশ জুড়িয়া শুরু হইবে গণটিকা প্রয়োগ কার্যক্রম। ডেলটা ধরনের করোনায় যখন প্রতিদিন সংক্রমণ ও মৃত্যুর সংখ্যা উদ্বেগজনকভাবে বাড়িতেছে, তখন এই টিকাদান কর্মসূচিকে আমাদের সাধুবাদ না জানাইয়া কোনো উপায় নাই।
ভ্যাকসিনেশন ক্যাম্পেইন জনগণের মধ্যে ব্যাপক সাড়া ফেলিয়াছে। করোনার টিকা লইয়া জনমনে যে ভীতি ও সংশয় ছিল তাহা এখন কাটিয়া গিয়াছে। প্রতিটি টিকাদান কেন্দ্রে দেখা দিয়াছে উপচাইয়া পড়া ভিড়। অশীতিপর বৃদ্ধরা পর্যন্ত বৃষ্টি উপেক্ষা করিয়া প্রতিষেধক টিকা গ্রহণ করিতেছেন। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নির্দেশনা বাস্তবায়নে স্থানীয় পর্যায়ে রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দ সার্বিক সহযোগিতার যে হস্ত প্রসারিত করিয়াছেন, ইহা তাহারই ফল। ইহাতে বিভিন্ন বেসরকারি সংস্থা ও এনজিওকর্মীদেরও অবদান রহিয়াছে। ১২ আগস্ট পর্যন্ত ছয় দিনব্যাপী ভ্যাকসিনেশন ক্যাম্পেইনে ৩২ লক্ষ মানুষকে করোনা ভাইরাস প্রতিরোধী টিকার প্রথম ডোজ প্রদানের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করিয়াছে স্বাস্থ্য অধিদপ্তর। এই জন্য সমগ্র দেশের ৪ হাজার ৬০০টি ইউনিয়নে, ১ হাজার ৫৪টি পৌরসভায় ও সিটি করপোরেশন এলাকার ৪৩৩টি ওয়ার্ডে ৩২ হাজার ৭০৬ জন টিকাদানকারী ও ৪৮ হাজার ৪৫৯ জন স্বেচ্ছাসেবীর মাধ্যমে একযোগে এই কোভিড-১৯ টিকা দেওয়া হইতেছে। টিকা প্রদান এখন এতটাই সহজ করা হইয়াছে যে, কেবল জাতীয় পরিচয়পত্রের ফটোকপি দেখাইলেই চলে। তাহার পরও কিছু কিছু অভিযোগ আসিতেছে যাহা আমলে নেওয়া প্রয়োজন। যেমন—টিকাদান কেন্দ্রে মানুষের অত্যধিক চাপে হুড়াহুড়ি ও বিশৃঙ্খলা দেখা দিতেছে। স্বাস্থ্যবিধির এই ব্যত্যয় বিপজ্জনক। মানুষ ঘণ্টার পর ঘণ্টা লাইনে অপেক্ষা করিতেছেন। কেন্দ্রগুলিতে ২০০ হইতে ৩৫০ টিকা দেওয়া হইতেছে; কিন্তু টিকার চাইতে টিকা গ্রহীতার সংখ্যা কোথাও কোথাও অত্যধিক। কোনো কোনো কেন্দ্রে পর্যাপ্ত চেয়ারের ব্যবস্থা করা হইয়াছে যাহাতে টিকা নিতে আসা ব্যক্তিদের দাঁড়াইয়া না থাকিতে হয়। ইহা একটি ভালো উদ্যোগ। তবে রাজবাড়ীতে এক নারীকে দুই ডোজ টিকা দেওয়া হইয়াছে, যাহা অপ্রত্যাশিত। সবচাইতে আশঙ্কার কথা হইল, রংপুরের পীরগঞ্জে ও পাবনার ভাঙ্গুরায় টিকা নেওয়ার এক ও ছয় ঘণ্টার ব্যবধানে দুই জনের মৃত্যুর অভিযোগ উঠিয়াছে। যদিও অন্য রোগ-ব্যাধির কারণেও তাহাদের মৃত্যু হইতে পারে। বিষয়টি তদন্তযোগ্য।
গত জুলাই মাসটি আমাদের জন্য কঠিন সময় ছিল। শোকের মাস আগস্টও তাহার ব্যতিক্রম বলিয়া মনে হইতেছে না। গত ৫ আগস্ট করোনায় দেশে সর্বোচ্চ ২৬৪ জনের মৃত্যু হইয়াছে। গত শনিবারও মারা গিয়াছে ২৬১ জন। তাই সকলকে করোনা ভাইরাসের টিকা গ্রহণে আরো উদ্বুদ্ধ ও অনুপ্রাণিত করিতে হইবে। গত শনিবার পর্যন্ত সুরক্ষা অ্যাপের মাধ্যমে টিকার জন্য নিবন্ধন করিয়াছেন ২ কোটি ১৮ লক্ষ ১৩ হাজার মানুষ। তন্মধ্যে দেড় কোটিরও অধিক মানুষ ইতিমধ্যে করোনা টিকার আওতায় আসিয়া গিয়াছেন। ইহা সরকারের একটি যুগান্তকারী সাফল্য নিঃসন্দেহে।
