২০০৫ সালের পর ইথিওপিয়ায় প্রথম বহুদলীয় নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয় গত ২১ জুন, ২০২১। টাইগ্রে অঞ্চলে চলমান দ্বন্দ্ব, পশ্চিম অরোমিয়া অঞ্চলে অশান্তিসহ বিভিন্ন সমস্যা সত্ত্বেও নির্বাচনটি মূলত সফল হয়েছিল। প্রকাশিত ফলাফল অনুযায়ী, শাসক প্রোসপারিটি পার্টি (পিপি) সংসদে বিপুল সংখ্যাগরিষ্ঠ আসন অর্জন করেছে এবং প্রধানমন্ত্রী আবি আহমেদ পুনরায় পাঁচ বছরের জন্য ক্ষমতায় আসেন। সেই নির্বাচনে বিরোধীরা খুব অল্পসংখ্যক আসন পেলেও, এই অস্থির সময়ে পিপির বিপুল বিজয় আবি আহমেদের কাছে জনগণের প্রত্যাশার মাত্রা আরো বেড়ে গেছে। তাই জল্পনা শুরু হয়েছে, আগামী পাঁচ বছরে আবি এবং তার সরকারের অগ্রাধিকার কী হবে!
আবি আহমেদ পরবর্তী মেয়াদের জন্য এখনো কোনো বিস্তারিত রোড ম্যাপ প্রকাশ করেননি, তবে অনেকে মনে করছেন তিনি তার অর্থনৈতিক উদারীকরণ প্রকল্প এবং গ্রিন লিগ্যাসি উদ্যোগ নিয়ে চলবেন। তিনি আঞ্চলিক অর্থনৈতিক একীকরণ বৃদ্ধি এবং ইথিওপিয়ার অনেক অর্থনৈতিক চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় কাজ চালিয়ে যাবেন। এছাড়া গ্র্যান্ড ইথিওপিয়ান রেনেসাঁ বাঁধ ভরাট ও পরিচালনার চ্যালেঞ্জগুলো কাটিয়ে ওঠাও আবি প্রশাসনের জন্য অগ্রাধিকার হবে। এসবের বাইরে, টাইগ্রেতে দ্বন্দ্বের সমাধান করার পাশাপাশি টাইগ্রে, আফার এবং আমহারা অঞ্চলে যুদ্ধের সম্মুখীন বেসামরিক নাগরিকদের সাহায্য করা, পশ্চিম ওরোমিয়া ও বেনিশাঙ্গুল গুমুজ অঞ্চলে অশান্তির অবসান, বাস্তুচ্যুত আমহারা ইথিওপিয়ানদের পুনর্বাসন এবং তাদের ক্রমবর্ধমান অভিযোগের সমাধান করা, ভবিষ্যতের সংঘাত এড়াতে ফেডারেল সিস্টেমকে শক্তিশালী করা নিঃসন্দেহে প্রধানমন্ত্রী আবি আহমেদের এজেন্ডার শীর্ষে থাকবে।
আবি আহমেদ যদি টাইগ্রে নিয়ে দ্রুত পদক্ষেপ না নেন, তাহলে টাইগ্রের পরিস্থিতি ইথিওপিয়ার সবচেয়ে বড় সমস্যা হিসাবে চিহ্নিত হবে এবং দেশের ভবিষ্যত্, তার পরিকল্পনা এবং সর্বোপরি তার প্রশাসনের ক্ষমতাকে বাধাগ্রস্ত করবে। আবিকে কেবল টিপিএলএফের হুমকি মোকাবিলা করতে হবে না বরং টাইগ্রেকে ইথিওপিয়ার মূল স্রোতে আনার পাশাপাশি বিভিন্ন জাতিগোষ্ঠীর মধ্যে দ্বন্দ্বের অবসান ঘটাতে হবে।
ইরিত্রিয়া এবং ইথিওপিয়ার মধ্যে ২০১৮ সালে শান্তিচুক্তির মাধ্যমে দুই প্রতিবেশী জাতির মধ্যে কয়েক দশক ধরে চলমান শীতল যুদ্ধের অবসান ঘটে। তারপর থেকে দেশ দুইটি পারস্পরিক বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক গড়ে তুলতে একে অপরের রাজধানীতে দূতাবাস খুলেছে এবং শক্তিশালী কূটনৈতিক সম্পর্ক গড়ে তুলেছে। ইরিত্রিয়াকে ইথিওপিয়ার সঙ্গে সংযুক্ত করা রাস্তাগুলোও মেরামত করা হয়েছে, যা উভয় দেশের জন্য নতুন অর্থনৈতিক সুযোগ তৈরি করেছে; কিন্তু ২০১৮ সালে সমঝোতার অংশ হিসেবে অন্যান্য যে প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছিল তা এখনো বাস্তবায়িত হয়নি। দুই দেশের মধ্যে জনগণ এবং পণ্য ও সেবার অবাধ চলাচল কবে শুরু হবে তা এখনো স্পষ্ট নয়। সুতরাং, আবি আহমেদ তার ক্ষমতায় পরবর্তী মেয়াদে, প্রতিবেশীর সঙ্গে তার দেশের অর্থনৈতিক ও কূটনৈতিক সম্পর্ক সুসংহত করার জন্য আরো কঠোর পরিশ্রম করবেন বলে আশা করা হচ্ছে।
ইরিত্রিয়ার সঙ্গে একটি ঐতিহাসিক শান্তি চুক্তি অর্জনের কৃতিত্বস্বরূপ আবি আহমেদ ২০১৯ সালে নোবেল শান্তি পুরস্কার জিতেছিলেন। তিনি তার শাসনভার গ্রহণের প্রথম বছর থাকাকালীন, বেশির ভাগ প্রতিবেশীর সঙ্গে ইথিওপিয়ার সম্পর্ক উন্নত করতে পেরেছিলেন। এছাড়া তিনি ইরিত্রিয়া এবং জিবুতি, ইরিত্রিয়া ও সোমালিয়া এবং সোমালিয়া ও কেনিয়ার মধ্যে মধ্যস্থতা করেছিলেন। ফলস্বরূপ, আবি আন্তর্জাতিক অঙ্গনে একজন সম্মানিত এবং সক্ষম শান্তি নির্মাতা হিসেবে নিজের নাম তৈরি করতে পেরেছেন। তার নেতৃত্বে, ইথিওপিয়া একটি প্রধান আঞ্চলিক শক্তি হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে। এছাড়াও আবিকে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়কে বোঝাতে হবে যে, এটি তার প্রশাসন নয় বরং টিপিএলএফ যারা টাইগ্রের ধ্বংসের জন্য দায়ী।
যাহোক, আবি এবং তার সরকারকে আগামী মাস ও বছরগুলোতে একাধিক চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করতে হবে। যদি নতুন প্রশাসন তার সংস্কার প্রচেষ্টা অব্যাহত রাখে, অর্থনীতি পুনর্গঠন করে, টিপিএলএফের টাইগ্রেতে সন্ত্রাসের রাজত্বের অবসান ঘটায় এবং সব সময় নীতিগত পররাষ্ট্রনীতি অনুসরণ করে, তাহলে ইথিওপিয়া খুব দ্রুত এই বিশৃঙ্খলা থেকে বেরিয়ে আসতে পারবে।
n লেখক :শিক্ষার্থী, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়
