১৯৬৬ সালের শুরুর দিকের ঘটনা। বঙ্গবন্ধু তখন আলফা ইনসিওরেন্সে কাজ করতেন। সেখানে বসেই আলাপ হচ্ছিল প্রখ্যাত সাংবাদিক আবদুল গাফ্ফার চৌধুরীর সঙ্গে। ছয় দফা কর্মসূচি সামনে রেখে আন্দোলনে যাবেন কি না, তা নিয়ে। আবদুুল গাফ্ফার চৌধুরী তার ‘ধীরে বহে বুড়িগঙ্গা’ গ্রন্থে এ ব্যাপারে বিস্তারিত লিখেছেন। বঙ্গবন্ধু তখন বলেছিলেন তিনি গ্রিন সিগন্যালের অপেক্ষায় আছেন। এই গ্রিন সিগন্যাল হচ্ছে বঙ্গমাতা শেখ ফজিলাতুন নেছা। তার দাদা ছিলেন বঙ্গবন্ধুর দাদার চাচাতো ভাই। কীভাবে এই নারীকে তিনি জীবনসঙ্গিনী হিসেবে পেলেন তার বর্ণনা মেলে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান রচিত ‘অসমাপ্ত আত্মজীবনী’ গ্রন্থে।
শেখ ফজিলাতুন নেছার ডাকনাম রেণু। তার বয়স তখন তিন বছর হবে। এ সময় তাদের বিয়ে হয়। সাত বছর বয়সে এতিম অবস্থায় আশ্রয় পান শ্বশুরের গৃহে আর ১২ বছর বয়সে স্বামীসঙ্গ। আজকের প্রেক্ষাপটে মনে হতে পারে, পুতুল খেলার মতো সবকিছু। কিন্তু এই বয়সেই কী অসাধারণ ধীশক্তি আর ধৈর্য নিয়ে তিনি সংসারের হাল ধরেছিলেন তা তার বড়কন্যা শেখ হাসিনার লেখা থেকে আমরা পাই :‘...সংসার চালাতে হচ্ছে, আওয়ামী লীগের নেতাদের সাহায্য করতে হচ্ছে। কে অসুস্থ তাকে টাকা দিতে হচ্ছে। কখনো অভাব কথাটা মায়ের কাছ থেকে শুনিনি। এমনও দিন গেছে বাজার করতে পারেননি। আমাদের কিন্তু কোনো দিন বলেননি আমার টাকা নাই, বাজার করতে পারলাম না। চাল-ডাল দিয়ে খিচুড়ি রান্না করেছেন, আচার দিয়ে বলেছেন প্রতিদিন ভাত ভালো লাগে নাকি; আজকে আমরা গরিব খিচুড়ি খাব। এটা খেতে খুব মজা।’
১৯৬৮ সালের ১৮ জানুয়ারি। ২১ মাস বঙ্গবন্ধুকে আটক রাখার পর জেল গেট থেকে আবার গ্রেফতার করে নিয়ে যাওয়া হয়। শুরু হয় আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলার কার্যক্রম। প্রথম দিকে নেতাকর্মী সবাই ভয়ে সরে যায়। এই সংকট মুহূর্তে রান্নাঘর ছেড়ে আদালতে আবির্ভূত হন বঙ্গমাতা। এর মধ্যে গণ-আন্দোলনের মুখে আইয়ুব খান সরকারও হার্ডলাইন থেকে সরে আসেন। আলোচনার ফাঁদ পেতে বঙ্গবন্ধুকে বাগে আনার জন্য প্যারলে মুক্তি দিয়ে রওয়ালপিন্ডি নিয়ে যাওয়ার তোড়জোড় শুরু করে। আওয়ামী লীগের অনেক নেতাকর্মীও বঙ্গবন্ধুকে আলোচনায় যাওয়ার জন্য চাপ দিতে থাকে। কিন্তু বঙ্গবন্ধু অপেক্ষা করছিলেন তার গ্রিন সিগন্যালের জন্য। এ সময় খাবারের টিফিন ক্যারিয়ারে দেওয়া ছোট্ট চিঠির মাধ্যমে বঙ্গবন্ধুকে তিনি লেখেন, ‘আপনি যদি প্যারোলে মুক্তি নিয়ে আইয়ুবের গোলটেবিলে যান, তাহলে বত্রিশ নম্বরে আর ফিরবেন না।’ প্রত্যন্ত এক গাঁয়ে বড়ো হওয়া, একাডেমিক কোনো ব্যাকগ্রাউন্ড না থাকা এমন নারীর এই চারিত্রিক দৃঢ়তার কথা চিন্তা করলে বিস্মিত হতে হয়। এই না যাওয়ার কারণে বাংলায় গণ-অভ্যুত্থান হয়েছিল। যার জোয়ারের তোড়ে ভেসে যেতে হয়েছিল জালিম আইয়ুব শাহিকে। বেগম ফজিলাতুন নেছার এই এক সিদ্ধান্তের কারণে বাংলার রাজনীতি নতুন দিকে মোড় নিয়েছিল। ইয়াহিয়া খাঁ ক্ষমতায় এসে ক্ষুব্ধ পূর্ব পাকিস্তানকে শান্ত করতে নির্বাচনের ঘোষণা দেন। এরপর ৭ই মার্চ তিনি যে ঐতিহাসিক ভাষণ দেন, এর পেছনেও ছিল বেগম ফজিলাতুন নেছার পরামর্শ।
১০ জানুয়ারি ১৯৭২-এ বঙ্গবন্ধু যখন দেশে ফিরে এলেন, তখন কলকাতার দৈনিক যুগান্তরে ছাপা হয় বঙ্গমাতার অনুভূতির কথা। ‘রাষ্ট্রের প্রধান মহিলারূপে আপনার কেমন লাগছে?’ সাংবাদিকদের প্রশ্নের উত্তরে স্মিতহাস্য বেগম মুজিব বলেন, ‘আমি বাড়ির গিন্নি। এ অবস্থায় আমার দায়িত্ব বিরাট, এক মস্ত বড় পরিবারের সব দায়িত্ব আমার ঘাড়ে। আমি রাজনীতিজ্ঞ নই। এখন আমি যদি বঙ্গবন্ধুর সঙ্গে বেরিয়ে বেড়াই, তাহলে আমার ঘর-গৃহস্থালি কে দেখবে?’ কত আটপৌরে, কত সাদামাটা ভাবনা। দেশ স্বাধীন হয়েছে। স্বাধীন দেশের রাষ্ট্রপতির স্ত্রী তার ঘরগৃহস্থালি নিয়ে চিন্তিত। অথচ তার ‘গ্রিন সিগন্যাল’ দেখে দেখে বঙ্গবন্ধু বাঙালির মুক্তির নৌকা ঘাটে ভিড়িয়েছিলেন। যে মহীয়সী ও প্রত্যুত্পন্নমতি নারীর কারণে এত কিছু, তিনি বলছেন ‘আমি রাজনীতিজ্ঞ নই’। আসলে তিনি রাজনীতিজ্ঞদের চেয়েও অধিক বিচক্ষণ ছিলেন। বিশ্বের ইতিহাসে অনেক বড় বিপ্লবীকে দেখা যায় শেষমেশ স্ত্রীদের বেপরোয়া আচরণের কারণে কলঙ্কিত হতে। যেমন নেলসেন মেন্ডেলার স্ত্রী উইনি মেন্ডেলা কিংবা রবার্ট মুগাবের স্ত্রী গ্রেসি মুগাবের কথা বলা যায়। বেগম ফজিলাতুন নেছা ক্ষমতা উপভোগের সেই পথে যাননি। মনোযোগ দিয়েছিলেন গার্হস্থ্যধর্মে।
বঙ্গমাতা মাত্র ৪৫ বছর বেঁচেছিলেন। এই স্বল্প-জীবনের পুরোটাই তিনি বঙ্গবন্ধুকে উজাড় করে দিয়েছেন। ৩৩ বছরের দাম্পত্য জীবনের প্রায় ১২ বছর বঙ্গবন্ধু জেলে কাটিয়েছেন। লেখাপড়া ও রাজনৈতিক কারণে আট বছর দুজন দুই জায়গায় থেকেছেন। ৩৩ বছরে মাত্র ১৩ বছর পাশে পেয়েছিলেন প্রিয় স্বামীকে। যখন সকল বাধা তুচ্ছ করে একটা সুস্থির জীবনের সম্ভাবনা উঁকি দিল, ঘাতকদের তা সহ্য হলো না। একই রাতে দুজনকেই পৃথিবী থেকে সরিয়ে দিল। অনেক মৃত্যু মানুষকে অমরত্ব দিয়ে যায়। বঙ্গবন্ধু ও তার পরিবারের আত্মত্যাগ তাদের অমরত্বের মহিমায় ভাস্বর করে রাখবে বাঙালির চেতনায়।
এই মহীয়সী নারী ১৯৩০ সালের ৮ আগস্ট গোপালগঞ্জের টুঙ্গিপাড়ায় জন্মগ্রহণ করেন। গত রবিববার সারা দেশে পালিত হয় তার ৯১তম জন্মবার্ষিকী। আমরা তার প্রতি জানাই বিনম্র শ্রদ্ধা।
n লেখক :অধ্যাপক, হূদেরাগ বিভাগ এবং হল প্রোভোস্ট, বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয়
