দেশে নতুন গ্যাসক্ষেত্র আবিষ্কৃত হয়েছে। সিলেটের সীমান্তবর্তী উপজেলা জকিগঞ্জে এটি আবিষ্কার করেছে বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম এক্সপ্লোরেশন অ্যান্ড প্রোডাকশন কোম্পানি (বাপেক্স)। গ্যাস সংকট বৃদ্ধি ও প্রমাণিত মজুত ক্রমে ফুরিয়ে যাওয়ার প্রবণতা এবং আমদানি নির্ভরতা বৃদ্ধির মধ্যে দেশের এই ২৮তম গ্যাসক্ষেত্র আবিষ্কারের খবর এলো। দীর্ঘদিন পর নতুন দেশীয় উত্স থেকে গ্যাস সরবরাহের সম্ভাবনা তৈরি হওয়ায় জ্বালানি, শিল্প ও অর্থনীতিতে নতুন উত্সাহ-উদ্দীপনা সঞ্চারিত হবে। দেশে প্রাকৃতিক গ্যাসের প্রমাণিত মজুত কমে আসছে। আবাসিকে নতুন গ্যাস-সংযোগ প্রদান বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে। গ্যাস সংকটে বিদ্যুত্ উত্পাদন ব্যাহত হচ্ছে। জ্বালানি এবং স্থিতিশীল বিদ্যুতের অভাবে শিল্প উত্পাদনের গতিও ধীর। বিকল্প হিসেবে ব্যয়বহুল এলএনজি (তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস) আমদানি করা হচ্ছে প্রায় তিন বছর ধরে। গ্যাস, তেল, কয়লা এবং এলপিজির আমদানি-নির্ভরতা বাড়ছে। এমন প্রেক্ষাপটে গতকাল সোমবার সিলেটে নতুন গ্যাসক্ষেত্র আবিষ্কারের ঘোষণা এলো। এর আগে সর্বশেষ ২০১৮ সালের জানুয়ারিতে ভোলায় একটি গ্যাসক্ষেত্র আবিষ্কৃত হয়েছিল।
জ্বালানি নিরাপত্তা দিবস উপলক্ষ্যে গতকাল দুপুরে আয়োজিত এক ওয়েবিনারে নতুন গ্যাসক্ষেত্র আবিষ্কারের তথ্য জানান বিদ্যুত্, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ প্রতিমন্ত্রী নসরুল হামিদ। তিনি জানান, আবিষ্কৃত গ্যাসক্ষেত্রটিতে দৈনিক ১০ কোটি ঘনফুট গ্যাসের প্রবাহ পাওয়া যাবে। এ স্তরটিতে গ্যাসের পরিমাণ প্রাথমিকভাবে প্রায় ৬৮ বিসিএফ বা ৬ হাজার ৮০০ কোটি ঘনফুট। মোট পরিমাণের ৭০ শতাংশ উত্তোলন করা যাবে। সে বিবেচনায় উত্তোলনযোগ্য গ্যাসের মজুত প্রায় ৪৮ বিসিএফ বা ৪ হাজার ৮০০ কোটি ঘনফুট। আবিষ্কৃত গ্যাস স্তরের চাপ ৬ হাজার ২৬০ পিএসআই এবং সারফেস ফ্লোইং প্রেসার ১ হাজার ২৭০ পিএসআই পাওয়া গেছে। উত্তোলনযোগ্য গ্যাসের মোট মূল্য ১ হাজার ২৭৬ কোটি টাকা। দৈনিক ১০ মিলিয়ন বা ১ কোটি ঘনফুট হারে প্রায় ১২-১৩ বত্সর গ্যাস উত্পাদন করা সম্ভব হবে।
বাপেক্স সূত্রে জানা যায়, গ্যাস কূপটিতে মোট চারটি স্তরে গ্যাস পাওয়া গেছে। নতুন এই অনুসন্ধান কূপটি খননে ৭১ কোটি টাকা খরচ হয়েছে। এর আগে গত ১ মার্চ বাপেক্স এখানে কূপ খনন শুরু করে। ৭ মে খনন শেষ হলে ১৫ জুলাই ডিএসটি (ড্রিল স্টিম টেস্ট) সৌভাগ্য শিখা জ্বালাতে সক্ষম হন প্রকৌশলী এবং ভূতত্ত্ববিদরা।
বাপেক্সের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মোহাম্মদ আলী বলেন, এটি বাপেক্সের অষ্টম সাফল্য। এই কূপে চারটি স্তরে পরীক্ষা করে একটি স্তরে বাণিজ্যিকভাবে উত্তোলনযোগ্য গ্যাস পাওয়া যায়। মাটির ২ হাজার ৮৭০ থেকে ২ হাজার ৮৯০ মিটার গভীরে এই গ্যাস স্তর অবস্থিত। কূপটি খননে বাজেট ছিল ৮৬ কোটি টাকা। আমরা তার চেয়ে কম খরচ করেছি। তিনি জানান, নতুন এই গ্যাসক্ষেত্রে আগামী শুষ্ক মৌসুমে দ্বিমাত্রিক ও ত্রিমাত্রিক ভূকম্প জরিপ পরিচালিত হবে। এরপর পুরো গ্যাসক্ষেত্রের পূর্ণাঙ্গ আকার বা কাঠামো সম্পর্কে ধারণা পাওয়া যাবে। ঐ ধারণা-তথ্যের ওপর ভিত্তি করে গ্যাস উত্তোলনে কূপ খননের সিদ্ধান্ত হবে।
ইত্তেফাক সিলেট অফিসের স্টাফ রিপোর্টার হুমায়ূন রশিদ চৌধূরী এবং দক্ষিণ সুরমা সংবাদদাতা আহসান হাবিব জানান, নতুন গ্যাস খনি আবিষ্কারের সংবাদ বৃহত্তর সিলেটের সর্বত্র ছড়িয়ে পড়লে অনেকেই আশার আলো দেখছেন। দেখছেন ঐ ক্ষেত্রে কর্মসংস্থানসহ সিলেট উন্নয়নের নতুন স্বপ্ন। তারা জানান, জকিগঞ্জের নতুন এই গ্যাসক্ষেত্র থেকে ৩২ কিলোমিটার দূরে বিয়ানীবাজার ও ৪৬ কিলোমিটার দূরে কৈলাসটিলা গ্যাসক্ষেত্র অবস্থিত। জকিগঞ্জ থেকে বিয়ানিবাজার বা কৈলাসটিলা পর্যন্ত পাইপলাইন নির্মাণের পর জাতীয় গ্রিডে নতুন গ্যাসক্ষেত্র থেকে গ্যাস দেওয়া সম্ভব হবে।
বাংলাদেশ তেল, গ্যাস ও খনিজ সম্পদ করপোরেশন (পেট্রোবাংলা) সূত্র জানায়, দেশে গ্যাসের প্রমাণিত ও সম্ভাব্য মজুতের পরিমাণ ১০ টিসিএফ বা ১০ লাখ কোটি ঘনফুট গ্যাস। দৈনিক গ্যাসের চাহিদা ৩৬৬ কোটি ঘনফুট। বার্ষিক গ্যাসের চাহিদা ১ লাখ ৩৪ হাজার কোটি ঘনফুট বা (১ দশমিক ৩৩ টিসিএফ) গ্যাস। এমন প্রেক্ষাপটে দেশজ গ্যাসের সঙ্গে আমদানিকৃত এলএনজি মিশিয়ে গ্রাহক পর্যায়ে বিতরণ করা হচ্ছে। এর মাধ্যমে গ্যাসের প্রমাণিত মজুত যত দিন বেশি সম্ভব ধরে রাখতে চায় সরকার।
