হত্যার ষড়যন্ত্র সফল হলে জাতি অনিশ্চিত গন্তব্যে ধাবিত হতো

আপডেট : ০৯ আগস্ট ২০২১, ২৩:২৩

গোপালগঞ্জের কোটালীপাড়ার জনসভায় শক্তিশালী দুটি বোমা পুঁতে আওয়ামী লীগের সভানেত্রী ও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে হত্যার ষড়যন্ত্র করেছিল হুজির (হরকাতুল জিহাদ) জঙ্গিরা। জঙ্গিদের এই ষড়যন্ত্র পুরোপুরিভাবে বাস্তবায়িত হলে সমগ্র জাতি একটি অনিশ্চিত জীবনের মধ্যে নিমজ্জিত হতো মর্মে পর্যবেক্ষণ দিয়েছে হাইকোর্ট। আদালত বলেছে, ষড়যন্ত্রকারী আসামিরা মূলত যাকে হত্যা করার জন্য এই বোমা পুঁতে রাখার ঘটনার অবতারণা করেছিল, তিনি (প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা) দেশের বৈধ সরকারপ্রধান হিসেবে তখন ক্ষমতায় ছিলেন। একটি বৈধ সরকারপ্রধানকে তার সহযোগীদেরসহ হত্যার প্রচেষ্টা এবং তা বাস্তবায়ন করা কতখানি দেশ ও জাতির জন্য ক্ষতিকর, তা জাতির পিতা বঙ্গবন্ধুকে হত্যা-পরবর্তীকালে এ দেশের নিরীহ স্বাধীনতাকামী জনগণ উপলব্ধি করে। আসামিদের ভ্রান্ত চিন্তা ও ধারণা এই জাতির জন্য একটি কলঙ্কময় অধ্যায়। দেশের মানুষের কল্যাণের স্বার্থে জঙ্গিবাদ ও জঙ্গি তত্পরতা চিরতরে এ দেশ থেকে বিলীন হওয়া প্রয়োজন। বিচারপতি জাহাঙ্গীর হোসেন সেলিম ও বিচারপতি মো. বদরুজ্জামানের সমন্বয়ে গঠিত হাইকোর্টের ডিভিশন বেঞ্চ ডেথ রেফারেন্স গ্রহণ এবং মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত আসামিদের আপিল খারিজের পূর্ণাঙ্গ রায়ে এই পর্যবেক্ষণ দিয়েছে।

এদিকে পূর্ণাঙ্গ রায়ে হাইকোর্ট ১০ জঙ্গির দণ্ড কার্যকর কারা কর্তৃপক্ষ ফাঁসিতে ঝুলিয়ে বা ফায়ারিং স্কোয়াডে করতে পারবে বলে অভিমত দিয়েছে। রায়ে হাইকোর্ট বলেছে, ফৌজদারি কার্যবিধির ৩৬৮(১) ধারায় বলা হয়েছে, আসামির মৃত্যু না হওয়া পর্যন্ত ফাঁসিতে ঝুলিয়ে রাখতে হবে। এই ধারা অনুসরণ করেই বিচারিক আদালত মৃত্যুদণ্ড প্রদান করে থাকে। কিন্তু ১৯৭৪ সালের বিশেষ ক্ষমতা আইনের ৩৪(এ) ধারায় বলা হয়েছে, বিশেষ ট্রাইব্যুনাল ইচ্ছা করলে গলায় ঝুলিয়ে অথবা ফায়ারিং স্কোয়াডে গুলি করে মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করার আদেশ দিতে পারে। দেশের বিচার বিভাগের ইতিহাসে একমাত্র বঙ্গবন্ধু হত্যা মামলায় উভয় পদ্ধতির যে কোনো একটি অনুসরণ করার কথা বিচারিক আদালতের রায়ে উল্লেখ করা হয়েছিল। কিন্তু জনগণের উপস্থিতিতে ফায়ারিং স্কোয়াডে মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের কোনো বিধান ফৌজদারি কার্যবিধিতে নেই। ফলে ঐ রায় সংশোধন করে দিয়েছিল হাইকোর্ট। তবে বিশেষ ক্ষমতা আইনের ৩৪(এ) ধারায় মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের দুই ধরনের পদ্ধতি থাকলেও বর্তমান মামলায় দ্রুত বিচার ট্রাইব্যুনাল নির্ধারিত পদ্ধতি অনুসরণপূর্বক দণ্ডিতদের গুলি করে মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের আদেশ দেয়। রায়ে হাইকোর্ট বলেছে, আদতে বাংলাদেশ দুর্ভাগা। এ দেশে মহান স্বাধীনতার স্থপতি সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ বাঙালি জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে সপরিবারে বিনা দোষে নির্মম ও নিষ্ঠুরভাবে হত্যা করেছিল ঘাতকের দল। দুনিয়ার কোনো সভ্য দেশে এমনিভাবে জাতির জনককে সপরিবারে হত্যার ঘটনা বিরল। ঐ হত্যাকাণ্ডের মধ্য দিয়ে এই সার্বভৌম দেশ যতটুকু পিছিয়ে গিয়েছিল, ঠিক আবারও অনুরূপ একটি ঘটনার সূচনা হয়েছিল গোপালগঞ্জের কোটালীপাড়ায় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে হত্যার উদ্দেশ্যে তার জনসভাস্থলে শক্তিশালী দুটি বোমা পুঁতে রাখার মধ্য দিয়ে। আদালত বলেছে, হুজি নেতা মুফতি আব্দুল হান্নানসহ অন্য আসামিদের দোষ স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি ও নথি পর্যালোচনায় দেখা যায় যে, আসামিরা (হুজি) দেশের প্রচলিত আইন মেনে চলতে নারাজ। তারা জঙ্গি তত্পরতার মাধ্যমে তাদের নিজস্ব চিন্তার প্রতিফলন ঘটাতে চায়। কিন্তু জঙ্গিদের এ ধরনের চিন্তা দেশের প্রচলিত আইন কখনো সমর্থন করে না। কারণ এরা সবাই জন্মগতভাবে এ দেশেরই নাগরিক। ষড়যন্ত্র করে শক্তিশালী দুটি বোমা পুঁতে রাখার মধ্য দিয়ে যে অপরাধ আসামিরা সংঘটিত করেছে, তা ছিল অত্যন্ত ভয়ংকর ও জঘন্য। এমতাবস্থায় দীর্ঘ হাজতবাস বিবেচনায় তাদের দণ্ড হ্রাসের সুযোগ নেই।

২০০০ সালের ২০ ও ২৩ জুলাই গোপালগঞ্জের কোটালীপাড়ায় শেখ লুত্ফুর রহমান সরকারি আদর্শ কলেজ মাঠে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার জনসভাস্থলের পাশ থেকে ৭৬ কেজি এবং হেলিপ্যাড থেকে ৪০ কেজি ওজনের দুটি শক্তিশালী বোমা উদ্ধার করে সেনাবাহিনীর বিশেষজ্ঞ দল। এ ঘটনায় করা মামলায় ২০১৭ সালে ঢাকার দ্রুত বিচার ট্রাইব্যুনাল-২ বিশেষ ক্ষমতা আইনে দোষী সাব্যস্ত করে ১০ আসামিকে মৃত্যুদণ্ড দেয়। ফাঁসির ঐ রায় বহাল রাখে হাইকোর্ট।