ক্রিকেট বিশ্বে বহুদিন ধরিয়াই ক্যাঙারুর দাপটে সকল দেশই কাঁপিয়াছে। কথিত টাইগার বহুবার তাহাদের সামনে ধরাশায়ী হইয়াছেন; কিন্তু ইতিহাসের কাজই হইল চিরায়ত বলিয়া কোনো কিছু না রাখা। অস্ট্রেলিয়ার জয়ও চিরায়ত রহিল না। টাইগারও চিরকাল বিড়াল থাকে না, স্বমহিমায় ভাস্বর হইয়া উঠে। এমনিভাবে সম্প্রতি টি-টোয়েন্টির পাঁচ ম্যাচের সিরিজে চির দাপুটে অস্ট্রেলিয়াকে ৪-১ ব্যবধানে পরাজিত করিয়াছে।
অনেকের নিকট মনে হইতে পারে, ইহা যেন এক অবিশ্বাস্য রূপকথা! কিন্তু উভয় দলে পাঁচ ম্যাচ দেখিলে ইহাকে আর যাহাই বলা হউক অঘটন বা অবিশ্বাস্য বলা যাইবে না।
আমরা দেখিয়াছি, বাংলাদেশ সফরে আসিবার পূর্বে ক্রিকেটের কুলীন দল অস্ট্রেলিয়া একগাদা শর্ত জুড়িয়া দিয়াছিল। বিসিবিও তাহাদের আতিথ্যে কার্পণ্য করে নাই। তবে শেষ বেলায় পরাক্রমশালী অস্ট্রেলিয়া দল দেশে ফিরিল অনেকগুলি লজ্জাজনক রেকর্ড সঙ্গে লইয়া। সিরিজের পঞ্চম ও শেষ ম্যাচে অস্ট্রেলিয়াকে ৬০ রানের বড় ব্যবধানে পরাজিত করিয়াছে বাংলাদেশ, যাহা অতীতে কখনো হয় নাই। অস্ট্রেলিয়ার ক্রিকেট ১৪৪ বত্সরের পুরাতন। ১৪৪ বত্সরে এই প্রথম ৬২ রানে গুটাইয়া গিয়া সীমিত ওভারের ক্রিকেটে সর্বনিম্ন সংগ্রহের ইতিহাস গড়িয়াছে অস্ট্রেলিয়া। ১৩ দশমিক ৪ ওভারে অলআউট হইয়াও গড়িয়াছে লজ্জার ইতিহাস। এত কম সময়ের মধ্যে অস্ট্রেলিয়ার ইনিংস আর কখনোই গুটাইয়া যায় নাই। হয়তো আন্ডারডগ হিসাবে ঘরের মাঠে মিরপুরে বাংলাদেশ মনস্তাত্ত্বিকভাবে কিছুটা বাড়তি সুবিধা পাইয়াছিল; কিন্তু মিরপুরের কঠিন উইকেটে বাংলাদেশ ইহার পাশাপাশি বোলিং, ব্যাটিং এবং ফিল্ডিংয়ে অসাধারণ নৈপুণ্য দেখাইল। বাংলাদেশ ক্রিকেট দলের ফিল্ডিং লইয়া অভিযোগ ও সমালোচনা হয় নিয়মিত, বিশেষ করিয়া সীমিত ওভারের খেলায় ফিল্ডিং দিয়াই বৃত্তের ভিতরে রান থামানো, কঠিন ক্যাচ ধরিয়া ম্যাচের মোড় ঘুরাইয়া দেওয়ার মতো বিষয় যেইখানে ঘটিয়া থাকে, সেইখানে সহজ ক্যাচ মিস করিয়া বাংলাদেশের ফিল্ডাররা জয়ের সম্ভাবনা থাকিলেও তাহা পুরাপুরি কাজে লাগাইতে পারে না—এমন ঘটনা অতীতে অনেক বার ঘটিয়াছে; কিন্তু অস্ট্রেলিয়ার সহিত এই সিরিজে ইহার ব্যত্যয় ঘটিয়াছে। যেমন চতুর্থ টি-টোয়েন্টিতেই শরিফুল ইসলামের বলে অ্যাস্টন অ্যাগার সোজা ব্যাট চালাইলে তাহা শামিম হোসেন দারুণভাবে ডাইভ দিয়া ধরিয়া ফেলেন। এই অসাধারণ ক্যাচ ধরিয়া ফেলিবার মুহূর্তটি বিস্ময় জাগায়। আনন্দে আমাদের বুকের স্ফীতি বাড়িয়া যায়। আরো স্বস্তির কথা হইল, এই সিরিজে মাথার অনেক উপরে উঠা বলগুলিও বাংলাদেশের ফিল্ডাররা মিস করেন নাই। বৃত্তের ভিতর বল খুব অধিক বাহির হইতে দেন নাই, যাহার ফলে অনেক খুচরা রান আটকানো গিয়াছে। মনে রাখিতে হইবে, টি-টোয়েন্টির মতো ছোট ফরম্যাটের ক্রিকেটে চার বা পাঁচ রানের ব্যবধানই ম্যাচের নির্ণায়ক হইয়া দাঁড়ায়। সুতরাং খুচরা রান বাঁচাইবার ক্ষেত্রে বাংলাদেশের টাইট ফিল্ডিং খুবই গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখিয়াছে ম্যাচ জয়ে। ইহার পাশাপাশি বাংলাদেশ বলা যায় প্রতিটি ম্যাচেই খুব ভালো বোলিং করিয়াছে। পাঁচটি ম্যাচে বোলিংয়ের যেই ধারাবাহিকতা বাংলাদেশ দেখাইতে পারিয়াছে, তাহা যদি বিশ্বকাপ অবধি ধরিয়া রাখা যায়, তবে বিশ্বকাপেও বাংলাদেশ নিঃসন্দেহে চমক দেখাইবে।
সর্বশেষ সিরিজের সেরা খেলোয়াড় হইয়াছেন বিশ্বের অন্যতম সেরা অলরাউন্ডার সাকিব আল হাসান। শেষ ম্যাচে তাহার ঘূর্ণিতেই দিশেহারা হইয়া গিয়াছিল অস্ট্রেলিয়া। ম্যাচ শেষে ইতিহাসের প্রথম ক্রিকেটার হিসাবে টি-টোয়েন্টি ভার্শনে ১ হাজার রান ও ১০০ উইকেটের অনন্য রেকর্ডে উজ্জ্বল হইয়া উঠিয়াছেন সাকিব। সাকিবকে জানাই প্রাণঢালা অভিনন্দন। ইহার সহিত অভিনন্দন জানাই বাংলাদেশ দলের খেলোয়াড় এবং নেপথ্য কারিগরদের। আমরা আশা করিব, বাংলাদেশের ক্রিকেট আগামী দিনেও এইরূপ নব নব মহিমায় ভাস্বর হইয়া উঠিবে। জয়ের ধারাবাহিকতা বজায় রাখিবে।
