আজ থেকে প্রায় ১০০ বছর আগে ‘শনিবারের চিঠি’খ্যাত সজনীকান্ত দাস ‘ভেজালিয়াতি’ নামে একটি বিখ্যাত ব্যঙ্গ কবিতা লিখেছিলেন। তিনি ‘ভেজালিয়াতি’ শব্দটির ব্যাখ্যা দিয়েছিলেন এভাবে :‘জাল হইতে যেমন জালিয়াত্ জালিয়াতি, ভেজাল হইতে তেমনি ভেজালিয়াত্ ভেজালিয়াতি পদ-সিদ্ধ।’
শুরুতেই সেই কবিতার অংশবিশেষ উল্লেখ করা যাক :
‘জালিয়াত্ যতো কুপোকাত্ হলো ভেজালিয়াতির ঠেলাতে;/ সর্বনাশে এ খেলায় সকলে তেলামাথা চায় তেলাতে।/ জাল ফেলে যারা দিতেছে ভেজাল ময়দা ঘৃত ও তৈলে, তারা সারাক্ষণ হানিছে আঘাত জাতির জীবন-শৈলে/ খাদ্য ভেজাল হতে ক্রমে ক্রমে ভেজালে ভরিছে বিশ্ব;/ শত মণ চালে কাঁকর মিশিয়ে শুধুই করে না বিশ শ’,/ পেটেতে মারিয়া খুশি নয় শুধু, অন্তরে করে নিঃস্ব/ দেশ ভক্তিতে ভেজাল ঢুকেছে শনি ঢোকে সেই রন্ধ্রে,/ স্বাধীন জাতির খাতিরের লোক আছেন পরমানন্দে।/ নব মহামারী ভেজালিয়াতিতে ভুগিতেছে সারা দেশটা,/ ভুগিছে গোমেজ, রাম ও রহিম ভোগে ইজিকেল কেষ্টা;/ ফুলিছে চরণ ফুলিতেছে গাল/ শিরায় শোণিতে বহিছে ভেজাল/ বুক ধড়ফড় করে দিনরাত অম্বলে বাড়ে তেষ্টা—/ বলা কওয়া নেই হঠাত্ পড়িয়া মরিয়া যেতেছে শেষটা’
পরিশেষে তিনি দেবীর কাছে প্রার্থনা করেছেন :
‘ভেজালের জালা অনেক সয়েছি, দোহাই দুর্গা, রক্ষ,/ অনেক লক্ষ উহারা কামালো, মোরা মরিলাম লক্ষ।/ কাতরে ধরি মা চরণ প্রান্ত/ এবার উহারা দিক না ক্ষান্ত/ খাঁটি খেতে দিয়ে সামলাতে দাও ধড়ফড় করা বক্ষ,/ ভেজালিয়াতেরে অনেক দিলে মা, এইবার দাও মোক্ষ।’
১০০ বছর আগে সজনীকান্ত দাস ভেজালের যে কাহিনি বর্ণনা করেছেন, আমাদের দেশের বর্তমান পরিস্থিতির সঙ্গে তার খুব একটা পার্থক্য নেই। গুণে-মানে ভেজালের আরো সমৃদ্ধি ঘটছে, ভেজাল আরো বেশি সর্বত্রগামী হয়েছে—এই যা।
সর্বশেষ এক চিকিত্সকের নানাবিধ ভেজাল পরিচয় দেশব্যাপী ব্যাপক আলোড়ন সৃষ্টি করেছে। প্রাপ্ত তথ্যমতে, তিনি বেসরকারি মেডিক্যাল কলেজ থেকে পাশ করা একজন ডাক্তার। এইটুকু পরিচয় ঠিক আছে। কিন্তু এতে তিনি সন্তুষ্ট ছিলেন না। তাইতো কখনো চিকিত্সাবিজ্ঞানী, আবার কখনো বিশেষজ্ঞ চিকিত্সক কিংবা কখনো গবেষক। আরো রয়েছে কর্নেল, ব্রিগেডিয়ার জেনারেল, মানবাধিকারকর্মী, গবেষক, বিশিষ্ট আলোচক, বিভিন্ন আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমের বাংলাদেশ প্রতিনিধি, ডিপ্লোম্যাটসহ অসংখ্য পরিচয় ব্যবহার করেছেন। এত সব পরিচয় যার ঝুলিতে, সেই ডা. ইশরাত রফিক ঈশিতাকে গ্রেপ্তার করেছে র্যাব। গ্রেপ্তারের পর জানা গেছে, তার এসব পরিচয় ভুয়া।
সরকারি একটি সংস্থা থেকে বহিষ্কৃত ঈশিতা কবির বিখ্যাত হওয়ার প্রধান মাধ্যম হিসেবে বেছে নেন মূলধারার গণমাধ্যম। আটক ঈশিতা রফিকের সব পরিচয়ই ভুয়া, প্রতারণাই ছিল তার মূল কাজ। এমনকি জাতীয় ও আন্তর্জাতিক বিভিন্ন পুরস্কার ও সম্মাননাও ভুয়া। ভুয়া সব পদ-পদবি ব্যবহার করে বোকা বানিয়েছেন অনেককে। অতিথি হয়েছেন বিভিন্ন টিভি টকশোর। এমনকি করোনাকালে চিকিত্সকদের প্রশিক্ষণ ও ভুয়া সার্টিফিকেটও দিতেন তিনি।
আসলে ভেজাল আমাদের দেশে যুগ যুগ ধরেই ছিল, বর্তমানেও আছে, নিশ্চয়ই ভবিষ্যতেও থাকবে। ভেজাল আমাদের জীবনে অনিবার্য হয়ে গেছে। ভেজাল কী আর ভেজাল কাকে বলে, সে সম্পর্কে কমবেশি আমাদের সবারই ধারণা আছে। যদিও ভেজালের কোনো সর্বজনগ্রাহ্য সংজ্ঞা খুঁজে পাওয়া যাবে না। বাংলা ভাষায় সাধারণত খাঁটি শব্দের বিপরীত অর্থেই ভেজাল শব্দটি প্রয়োগ করা হয়। যা পুরোপুরি খাঁটি বা সাচ্চা নয়, তা-ই ভেজাল। অনেকে ভেজালের সঙ্গে নকলকে গুলিয়ে ফেলেন। ভেজালের সঙ্গে নকলের পার্থক্য আছে। নকল হলো পুরোপুরিই মিথ্যা, ফাঁকি। সোনার রঙের কোনো গয়নাকে সোনা বলে চালালে তাকে বলা হবে নকল সোনা। নকল সোনার গয়নায় সোনার অস্তিত্বই থাকে না। কিন্তু ভেজালের ক্ষেত্রে অন্য নিয়ম। সেখানে সোনা অল্পবিস্তর থাকবে, কিন্তু সঙ্গে থাকবে খাদ বা অন্য কম দামি বস্তুর মিশ্রণ। নকলের ক্ষেত্রে শুধু চেহারার মিল রেখে আসল জিনিসের নামে পুরো আরেকটি জিনিস চালিয়ে দেওয়া হয়। কিন্তু ভেজালের ক্ষেত্রে সামান্য হলেও প্রকৃত জিনিসের অস্তিত্ব থাকে; এর সঙ্গে যোগ হয় খাদ বা কম দামি কোনো জিনিস। সেদিক থেকে বিবেচনা করলে নকলের চাইতে ভেজাল ভালো (যেমন ভালো কুপিয়ে হত্যা করার চাইতে গুলি করে খুন করা!)।
ব্যবসায়ীদের মাধ্যমেই আমাদের দেশে ভেজালের প্রবেশ। ব্যবসায়ীরা লাভ করার জন্য নানা ফন্দিফিকির করতে থাকেন। এর মধ্যে ভেজাল তাদের সবচেয়ে সৃজনশীল উদ্যোগ। চালে কাঁকর, আটায় তুষ ও ভুসি, ঘিয়ে তেল, সরিষার তেলে সয়াবিন, সয়াবিনে ডালডা—এভাবে ভেজালে ভেজালে বাজার সয়লাব। বর্তমানে আমাদের দেশে ভেজাল ছাড়া খাঁটি জিনিস পাওয়া নিতান্তই দুর্লভ ব্যাপার। শতভাগ খাঁটি বলে আমরা বাজার থেকে যা কিনছি, দোকানদার বা ব্যবসায়ী ভাইয়েরা ‘আল্লাহর কসম খাঁটি’ বলে যা আমাদের কাছে গছিয়ে দিচ্ছে, তা আসলে মোটেও খাঁটি নয়। অবশ্য খাঁটি জিনিস দেশ থেকেই উধাও হয়ে গেছে বহু আগেই। বর্তমানে নকল আর ভেজালের ঠেলায় সবকিছুই যেন ‘খাঁটিত্ব’ হারিয়েছে।
দুধের কথাই ধরা যাক। খাঁটি দুধ পাওয়া এখন আর কোনোমতেই সম্ভব নয়। যারা পুরোনো লোক, যাদের বর্তমানে বয়স পঞ্চাশের ঊর্ধ্বে, তারা যদি গ্রামে গিয়ে এক ফোঁটা পানি না মেশানো বাড়ির খাঁটি দুধও খান, তবু দেখবেন দুধের স্বাদ কেমন পানসে লাগছে। আজ থেকে ৩০ বা ৪০ বছর আগে খাওয়া দুধের সেই স্বাদ, গন্ধ, ঘনত্ব ও খাঁটিত্ব কোনো কিছুই আর অবশিষ্ট নেই। রংটা শুধু সাদা আছে, এই যা। এর কারণ আছে। আগে গরু খাঁটি ঘাস খেত। খাঁটি খড়, বিচালি, মাড়, পানি খেত; কিন্তু এখন সেসব খাঁটি গোখাদ্য আর নেই। এখন সবখানে ভেজাল। ভেজাল সার ও কীটনাশকের প্রভাবে মাটির গুণ বদলে গেছে। ঘাসসহ সবকিছুই এখন ভেজালের ফসল। এই ভেজাল খেয়ে, ভেজাল থেকে যা কিছু উত্পন্ন হয় তা আর আগের মতো হয় না। ভেজাল থেকে উত্পন্ন যে দ্রব্য, তা আরো বেশি ভেজালের শিকার হয়ে শেষ পর্যন্ত রূপ-রস-গন্ধ-স্বাদ সবকিছু হারায়।
আগে পুঁটি মাছে যে স্বাদ ছিল, এখন ইলিশ মাছেও সেই স্বাদ নেই। হাঁস, মুরগি, গরু, খাসি, পাঁঠা—সব মাংসই এখন কুকুর-বেড়ালের মাংসের মতো বিস্বাদ মনে হয়। অবশ্য এক্ষেত্রে নকল ও ভেজালের প্রকোপও আছে। বাজারে পদ্মার ইলিশ বলে যা পাওয়া যায়, তা আসলে বার্মার সামুদ্রিক ইলিশ। রুই, কাতলাসহ আরো অনেক মাছই ‘নদীর মাছ’ বলে পাওয়া যায়, যেগুলো চাষ করা। নানা ধরনের খাদ্য খাইয়ে সেগুলোকে দ্রুত বড় বানানো হয়। এসব মাছ ফরমালিন আর বরফের সাগর পাড়ি দিয়ে দীর্ঘ ভ্রমণ শেষে যখন আমাদের হাতে বা পাতে এসে পৌঁছায়, তখন এর স্বাদ আমাদের সন্তুষ্ট করতে পারে না।
তবে এখন মাছ-মাংসের ক্ষেত্রে দেশি-বিদেশি বা স্বাদের সমস্যার চাইতে ভেজালের সমস্যাই প্রকট। খাসির মাংসের সঙ্গে গরুর মাংস, ভেড়ার মাংস মেশানো (শোনা যায় অনেক ‘ওস্তাদ’ ব্যবসায়ী কুকুরের মাংস পর্যন্ত মেশান), গরুর মাংসের সঙ্গে মহিষের মাংস মেশানো, হোটেল-রেস্তোরাঁয় মরা মুরগির মাংস বিক্রি ইত্যাদি ঘটনা এখন হরহামেশাই ঘটছে। আমরা জেনেশুনে শেষ পর্যন্ত তা মেনেও নিয়েছি। প্রতিকারের উপায় যেখানে নেই, সেখানে মেনে না নিয়ে আর উপায়ই বা কী?
তবে এখন সবখানে সবকিছুতেই পুরোদমে ভেজাল চলছে। শাক-সবজি, ফলমূল থেকে শুরু করে মানুষে পর্যন্ত ভেজাল চলছে। ওষুধে ভেজাল, টাকায় ভেজাল, স্বাক্ষরে ভেজাল, সার্টিফিকেটে ভেজাল, গণতন্ত্রে ভেজাল, নেতায় ভেজাল, সরকারে ভেজাল, সেনায় ভেজাল, মুক্তিযোদ্ধায় ভেজাল, কথায়ও ভেজাল বেরোচ্ছে। আমাদের বাতাসে ভেজাল (দূষণ), খাদ্যে ভেজাল, পানিতে ভেজাল (আর্সেনিক), কথায়-প্রতিশ্রুতিতে সবখানে ভেজাল। এত সব ভেজালের মধ্য থেকে আমাদের মানবিক সম্পর্কে পর্যন্ত ভেজাল ঢুকে গেছে।
পটিয়ে-পাটিয়ে ভালোবেসে বিয়ে করার এক বছরের মাথায় ভেজাল ধরা পড়ে যাচ্ছে, স্বামী-স্ত্রী সম্পর্ক চিরতরে ছিন্ন হয়ে যাচ্ছে। ভেজাল দিয়ে তৈরি সম্পর্কে দ্রুতই সৃষ্টি হচ্ছে অবিশ্বাস, যার অনিবার্য পরিণতিতে দেখা দিচ্ছে বিচ্ছেদ, ভাঙন। মা-বাবার সঙ্গে সন্তানের বোঝাপড়া হচ্ছে না। স্বামীর সঙ্গে স্ত্রীর হচ্ছে না, প্রেমিক-প্রেমিকারও না। সম্পর্কে ভেজাল ঢুকে গেছে। আর ভেজাল সম্পর্কের মধ্যে প্রাণের টান তৈরি হচ্ছে না। যেখানে প্রাণের টান নেই, সেখানে বিচ্ছেদ বা বিবাদ অনিবার্য। হচ্ছেও তা-ই।
মুখে আমরা একে অপরের জন্য জীবন দিয়ে দিচ্ছি; বাস্তবে কাঁচকলা। যে যার স্বার্থ ও সুবিধার পেছনে ছুটছি। নিজের স্বার্থে আঘাত লাগলে, নিজের সুখ-স্বাচ্ছন্দ্য-স্বাধীনতায় বিঘ্ন ঘটলে সম্পর্কের বাঁধনটাই কেটে দিচ্ছি। ভেজাল আবেগ, ভেজাল মানবিক অনুভূতি ছন্দে ছন্দে বেজে উঠলেও জীবনের ছন্দপতন ঘটাচ্ছে প্রতিনিয়ত।
ভেজালিয়াতির অক্টোপাস যেভাবে আমাদের চারদিক থেকে চেপে ধরেছে, তার থেকে রেহাই পাওয়ার কোনো পথ আদৌ আছে কী?
n লেখক : রম্য রচয়িতা
