নারায়ণগঞ্জে সাত মাসে অগ্নিকাণ্ড চার শতাধিক

আপডেট : ১০ আগস্ট ২০২১, ২১:৪২

নিহত ৬১, আর্থিক ক্ষতি সাড়ে ৩৩ কোটি টাকা

হাবিবুর রহমান বাদল, নারায়ণগঞ্জ

শিল্প ও কলকারখানাসমৃদ্ধ এলাকা নারায়ণগঞ্জ। এখানে অগ্নিকাণ্ড ও মৃত্যু যেন স্বাভাবিক ঘটনা হয়ে দাঁড়িয়েছে। প্রায়  জেলার বিভিন্ন স্থানে এ ঘটনা ঘটেই চলছে। চলতি বছরের শুরু থেকে মাত্র সাত মাসে ৪১০টি অগ্নিকাণ্ডের ঘটনায় ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতিসহ ঝরেছে বহু প্রাণ। এসব ঘটনায় পুড়েছে হাজারো পরিবারের সোনালি স্বপ্ন। সুনির্দিষ্ট পদক্ষেপ ও অসচেতনতার কারণে অগ্নিকাণ্ডের পুনরাবৃত্তি হচ্ছে বলে জানান নারায়ণগঞ্জ ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্স কর্তৃপক্ষ। জেলা ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্সের সূত্র মতে, ২০২১ সালের প্রথম সাত মাসে জেলা জুড়ে ৪১০টি অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা ঘটে। এ সব অগ্নিকাণ্ডের ঘটনায় ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ মোট ৩৩ কোটি ৪০ লাখ ৫৬ হাজার ৫০০ টাকা।  গত বছর অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা ছিল ৫৯৪টি। গতবারের তুলনায় এ বছরে মাসিক অগ্নিকাণ্ডের হার বেড়েছে। সেই সঙ্গে আহত ও নিহতের সংখ্যাও বেড়েছে আগের তুলনায় কয়েক গুণ। ২০২১ সালের জানুয়ারি থেকে জুলাই পর্যন্ত, জেলায় সাত মাসেই অগ্নিকাণ্ডের ঘটনায় আহত ১০৫ এবং নিহত হয় ৬১ জন। অগ্নিকাণ্ডে ২০১৯ সালে আহত হয়েছিল ২৭ জন এবং নিহত হয় পাঁচ জন। ২০২০ সালে অগ্নিকাণ্ডের ঘটনায় আহত হয় ১৬ জন এবং নিহত হয়েছিল ৩৯ জন।

নারায়ণগঞ্জ ফায়ার সার্ভিস সূত্রে জানা যায়, অগ্নিকাণ্ডের ৯০ শতাংশ ঘটনায় চারটি গুরুতর কারণ চিহ্নিত করা হয়েছে। যা মধ্যে রয়েছে বৈদ্যুতিক গোলযোগ, চুলার আগুন ও সিগারেটের জলন্ত টুকরো এবং গ্যাস লাইনের আগুন থেকেই অধিকাংশ অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা ঘটেছে। গত জুলাই মাসে ৩৪টি অগ্নিকাণ্ডে আহত ৪৬ এবং নিহত হয় ৫৪ জন । জুন মাসে ৩৪ টি অগ্নিকাণ্ডে  দুই জন আহত ও এক জন নিহত হয়। তার আগের পাঁচ মাসে অর্থাত্ মে মাসে ৪৮টি অগ্নিকাণ্ডে আহত হয় ২০  জন। এপ্রিলে ঘটে ৮৩টি অগ্নিকাণ্ড। এতে আহত ১৫  এবং নিহত হন দুই জন। মার্চে ৮৩টি অগ্নিকাণ্ডে  আহত সাত জন। ফেব্রুয়ারিতে  ৬৬টি অগ্নিকাণ্ডে আহত সাত ও  নিহত দুই জন। আর জানুয়ারিতে ৬২টি অগ্নিকাণ্ডে আহত আট  ও নিহত হয় দুই জন। সব চেয়ে বড় অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা ঘটে গত ৮ জুলাই রূপগঞ্জ উপজেলার কর্ণগোপ এলাকার সজিব গ্রুপের অঙ্গ প্রতিষ্ঠান হাসেম ফুড অ্যান্ড বেভারেজের সেজান জুস  কারখানায়। ভয়াবহ এ অগ্নিকাণ্ডে ৫২ শ্রমিক প্রাণ হারায়। এদের মধ্যে ৪৯ জন অগ্নিদগ্ধ হয়ে মারা যান। মর্মান্তিক এ ঘটনার রেস কাটতে না কাটতেই ৪ আগস্ট রূপগঞ্জের তারাব পৌরসভার মৈকুলী এলাকার একটি কেমিক্যালের গোডাউনে অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা ঘটে। প্রায় তিন ঘণ্টা চেষ্টা চালিয়ে আগুন নিয়ন্ত্রণে আনে ফায়ার সার্ভিসের ১৪টি ইউনিট। তবে এতে হতাহতের ঘটনা না ঘটলেও ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে।

নারায়ণগঞ্জ ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্সের উপসহকারী পরিচালক আব্দুল্লাহ আল আরেফীন জেলায় মাত্রাতিরিক্ত অগ্নিকাণ্ডের কারণ ও সমাধানের বিষয়ে বলেন, নারায়ণগঞ্জ শিল্প পরিপূর্ণ একটি নগরী। এখানে  ব্যাপক পরিসরে কলকারখানার কার্যক্রম চলে। পর্যাপ্ত সতর্কতা অবলম্বন না করায় অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা প্রায়ই ঘটে। এ বছরের গত সাত মাসে সর্বাধিক অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা ঘটে বৈদ্যুতিক গোলযোগ ও ত্রুটিপূর্ণ গ্যাসলাইনের কারণে। বৈদ্যুতিকসংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের প্রতি তিন মাস পরপর বৈদ্যুতিক সংযোগ ঠিক আছে কি না, তদারকি করা উচিত। একই ভাবে তিতাসের গ্যাস লাইনের কার্যক্ষমতা ও পরিস্থিতি নিয়ে তদারকি করা প্রয়োজন। কিন্তু এমনটা হয় না। বছরের পর বছর  চলে যায় এসব লাইনের মেরামত বা কার্যক্ষমতা নিরীক্ষা করা হয় না। ত্রুটিপূর্ণ সংযোগ ও সুইচবোর্ডের কারণে একাধিক দুর্ঘটনা ঘটে। প্রাকৃতিক দুর্ঘটনা ছাড়া অধিকাংশ ঘটনা মানুষের অসচেতনতার কারণে ঘটছে। মানুষের সচেতনতার পাশাপাশি বহুতল ভবন ও সব ধরনের প্রতিষ্ঠানে প্রয়োজনীয় অগ্নিপ্রতিরোধ ব্যবস্থা গ্রহণ করা হলে এ ঘটনা সংখ্যা হ্রাস পাবে।