ফোনালাপ ফাঁসের ঘটনায় তদন্ত চেয়ে রিট দায়ের

আপডেট : ১১ আগস্ট ২০২১, ০০:১৯

ফোনালাপ ফাঁসের ঘটনা তদন্ত চেয়ে হাইকোর্টে রিট আবেদন দায়ের করা হয়েছে। একই সঙ্গে ফোনে আড়িপাতা বন্ধে উচ্চ আদালতের নির্দেশনা চাওয়া হয়েছে আবেদনে। গতকাল মঙ্গলবার হাইকোর্টের সংশ্লিষ্ট শাখায় এই রিট দায়ের করা হয়। বিচারপতি এম ইনায়েতুর রহিম ও বিচারপতি মোস্তাফিজুর রহমানের সমন্বয়ে গঠিত হাইকোর্টের ডিভিশন বেঞ্চে এ রিটের ওপর শুনানি হবে। সুপ্রিম কোর্টের ১০ আইনজীবীর পক্ষে হাইকোর্টের সংশ্লিষ্ট শাখায় এই রিট দাখিল করেন অ্যাডভোকেট মোহাম্মদ শিশির মনির। আবেদনে ডাক ও টেলিযোগাযোগ বিভাগের সচিব, তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি বিভাগের সচিব, টেলিযোগাযোগ ও তথ্য প্রযুক্তি বিষয়ক সচিব, বাংলাদেশ টেলিযোগাযোগ নিয়ন্ত্রণ কমিশনের (বিটিআরসি) চেয়ারম্যানকে বিবাদী করা হয়েছে।

রিট আবেদনে ২০১৩ সাল থেকে ২০২১ সাল পর্যন্ত অর্থাত্ গত আট বছরে ২০টি ফোনালাপ ফাঁসের ঘটনার তথ্য তুলে ধরা হয়েছে। এসব ঘটনার মধ্যে উল্লেখযোগ্য হচ্ছে, আওয়ামী লীগ সভানেত্রী ও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা এবং তত্কালীন বিরোধীদলীয় নেত্রী বেগম খালেদা জিয়ার ফোনালাপ, আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদের ও বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরের ফোনালাপ, প্রয়াত সাবেক আইনমন্ত্রী ব্যারিস্টার মওদুদ আহমদ ও রাজশাহী মহানগর পুলিশের সহকারী কমিশনার নাজমুল হাসানের ফোনালাপ, ফরিদপুর-৪ আসনের সংসদ সদস্য মজিবুর রহমান চৌধুরী (নিক্সন) ও চরভদ্রাসন উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার (ইউএনও) ফোনালাপ, যশোর-৬ আসনের সংসদ সদস্য শাহীন চাকলাদার ও ওসির মধ্যকার ফোনালাপ, ভিকারুননিসা নূন স্কুল অ্যান্ড কলেজের অধ্যক্ষ কামরুন নাহার মুকুলের ফোনালাপ, মাওলানা মামুনুল হকের ফোনালাপ, সেনাবাহিনীর অবসরপ্রাপ্ত মেজর সিনহা মোহাম্মদ রাশেদ খান হত্যার ফোনালাপ, সাবেক ডাকসু ভিপি নুরুল হক নুরের ফোনালাপ। এসব ব্যক্তির ফোনে আড়িপাতা এবং সেই ফোনালাপ ফাঁসের ঘটনা দেশের গণমাধ্যমে প্রচার ও প্রকাশ করা হয়েছে। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমেও ভাইরাল হয়েছে। এসব ফোনালাপ ফাঁসের ঘটনা তদন্ত চাওয়া হয়েছে রিটে।

রিট আবেদনে বলা হয়েছে, ব্যক্তির গোপনীয়তার অধিকার ১৩৬১ সাল থেকে পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে স্বীকৃত। ১৮৯০ সালে হার্ভার্ড ল রিভিউ এ ‘দি রাইট অব প্রাইভেসি’ শিরোনামে প্রকাশিত প্রবন্ধে ব্যক্তিগত গোপনীয়তার অধিকার নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা করা হয়। এরই ধারাবাহিকতায় ১৯৬৪ সালে নিউ ইয়র্ক বিশ্ববিদ্যালয়ে উপস্থাপিত এক প্রবন্ধে ব্যক্তির স্বাধীনতা, মর্যাদা ও ব্যক্তিগত গোপনীয়তা সংরক্ষণের ওপর সর্বোচ্চ গুরুত্ব আরোপ করা হয়। এছাড়াও সার্বজনীন মানবাধিকার সনদপত্র, নাগরিক ও রাজনৈতিক অধিকার সম্পর্কিত আন্তর্জাতিক চুক্তি অনুযায়ী পৃথিবীর সব আধুনিক ব্যবস্থায় ব্যক্তিগত গোপনীয়তার অধিকার স্বীকৃত ও সংরক্ষিত। এরই ধারাবাহিকতায় বাংলাদেশের সংবিধানের ৪৩ অনুচ্ছেদে চিঠিপত্র ও যোগাযোগের অন্যান্য উপায়ের গোপনীয়তা সংরক্ষণ নাগরিকের মৌলিক অধিকার হিসেবে স্বীকৃতি পায়। এই অধিকার সংবিধান কর্তৃক নিশ্চিত করা হয়েছে। অর্থাত্, সংবিধানের তৃতীয় ভাগে উল্লিখিত মৌলিক অধিকারসমূহের মধ্যে যোগাযোগের ক্ষেত্রে ব্যক্তিগত গোপনীয়তা সংরক্ষণ অন্যতম। এছাড়াও ২০০১ সালে প্রণীত টেলিযোগাযোগ নিয়ন্ত্রণ আইনের ৬ ধারা অনুযায়ী টেলিযোগাযোগ নিয়ন্ত্রণ কমিশন প্রতিষ্ঠিত হয়। ঐ আইনের ৩০(চ) ধারা অনুযায়ী টেলিযোগাযোগের একান্ততা রক্ষা নিশ্চিত করা এই কমিশনের দায়িত্ব। কিন্তু লক্ষ করা যাচ্ছে যে, এই ধরনের ফোনালাপ ফাঁসের ঘটনা অহরহ ঘটছে। অথচ সংবিধান ও প্রচলিত আইন অনুযায়ী কমিশন তার দায়িত্ব পালন করছে না।

রিট আবেদনে এক মামলায় হাইকোর্টের বৃহত্তর বেঞ্চের দেওয়া রায়ের পর্যবেক্ষণও তুলে ধরা হয়। ঐ রায়ে হাইকোর্ট বলেছে, টেলিযোগাযোগ নিয়ন্ত্রণ কমিশন ও টেলিফোন সেবা প্রদানকারী কোম্পানিগুলোর দায়িত্ব সর্বাধিক। সংবিধান ও আইন অনুযায়ী ব্যক্তিগত গোপনীয়তা সংরক্ষণ তাদের দায়িত্ব। তারা আইনের বিধান ব্যতিরেকে গ্রাহকদের ব্যক্তিগত যোগাযোগের তথ্য প্রদান করতে পারে না।

লিগ্যাল নোটিশের জবাব না পেয়ে রিট :

রিট আবেদন দায়েরের আগে সংশ্লিষ্ট বিবাদীদের লিগ্যাল নোটিশ দিয়েছিল রিটকারীরা। কিন্তু জবাব না পেয়ে এই রিট করেন তারা। রিটকারীরা হলেন :মুস্তাফিজুর রহমান, রেজওয়ানা ফেরদৌস, উত্তম কুমার বণিক, শাহ নাবিলা কাশফী, ফরহাদ আহমেদ সিদ্দীকী, মোহাম্মদ নওয়াব আলী, মোহাম্মদ ইবরাহিম খলিল,  জি এম মুজাহিদুর রহমান (মুন্না), ইমরুল কায়েস ও একরামুল কবির।

আইনজীবী শিশির মনির বলেন, বাংলাদেশ টেলিযোগাযোগ নিয়ন্ত্রণ কমিশনের দায়িত্ব হলো নাগরিকের টেলিযোগাযোগের একান্ততা রক্ষার ব্যবস্থা নিশ্চিত করা। কিন্তু কমিশন আজ অবধি কোনো কার্যকরী পদক্ষেপ গ্রহণ করেনি। যদিও টেলিযোগাযোগ নিয়ন্ত্রণ আইনের ৭১ ধারায় বলা হয়েছে, টেলিফোনে আড়িপাতা দণ্ডনীয় অপরাধ। এই অপরাধে দোষী ব্যক্তি দুই বছর কারাদণ্ড অথবা অনধিক ৫ কোটি টাকা জরিমানা বা উভয় দণ্ডে দণ্ডিত হবেন। অথচ আজ অবধি কমিশন স্বতঃপ্রণোদিত হয়ে কারো বিরুদ্ধে কোনো মামলা করতে দেখা যায়নি।