অণুকথা : নার্সিসিজম

আপডেট : ১১ আগস্ট ২০২১, ২০:০৭

 

নার্সিসাস, নার্সিসিজম, নার্সিসিস্ট এই শব্দগুলো মূলত আত্মপ্রেম কিংবা আত্মমগ্নতার স্বরূপকে তুলে ধরার জন্যই ব্যবহার করা হয়ে থাকে। নার্সিসিজমের সঙ্গে জড়িয়ে আছে গ্রিক পুরানের অন্যতম একটি চরিত্র নার্সিসাসের জীবনের ঘটনা। নার্সিসাস নদী দেবতা সিসিফাস এবং জলপরী লিরিউপির পুত্র। গ্রিক পুরান অনুসারে নার্সিসাস ছিলেন অপূর্ব রূপের অধিকারী। মর্ত্যের যে কোনো নর-নারী কিংবা পরীরা পর্যন্ত তার রূপে মোহিত হয়ে প্রেমে পড়ে যেত। নার্সিসাস তার এই রূপ সৌন্দর্যে এতোটাই অহংকারী ও আত্মগরিমায় মগ্ন হয়ে ওঠে যে শেষমেশ তা ট্রাজেডিতে পরিণত হয়।

নার্সিসাসের জন্মের পর তার মা তাকে নিয়ে গেলেন এক অন্ধ ভবিষ্যদ্বক্তা টাইরেসিয়াসের কাছে। টাইরেসিয়াস শিশু নার্সিসাসের ভবিষ্যত্ সম্পর্কে হুঁশিয়ার করে দিয়েছিলেন—‘নার্সিসাস যেন কখনোই নিজেকে না দেখে, যেদিনই সে তার প্রতিবিম্ব দেখবে সেদিনই তার জীবনের সমাপ্তি ঘটবে।’ ছোটবেলা থেকেই নিজের রূপের প্রশংসা শুনতে শুনতে অদ্ভুত অহংকার জাগে নার্সিসাসের মনে। নার্সিসাস কারো ভালোবাসায় সাড়া দিত না বরং প্রত্যেকেই নিষ্ঠুরতার সঙ্গে প্রত্যাখ্যান করত। নার্সিসাসের ভালোবাসার নিষ্ঠুরতার শিকার হতে হয়েছিল অপ্সরী ইকোকে। ইকো ছিল অপূর্ব মিষ্টি কণ্ঠস্বরের অধিকারী। কিন্তু দুর্ভাগ্যক্রমে হেরা দেবীর অভিশাপে অন্যের কথার প্রতিধ্বনি ফিরিয়ে দেওয়া ছাড়া নিজে থেকে কোনো কথা বলতে পারত না ইকো। নার্সিসাস যখন বনে শিকার করতে যেত তখন বনপরী ইকো তার অপেক্ষায় পথ চেয়ে থাকত। ইকো যখন নার্সিসাসের প্রতি তার ভালোবাসা প্রকাশ করে, তখন অহংকারী নার্সিসাস তাকে তাচ্ছিল্যের সঙ্গে ফিরিয়ে দেয়। নার্সিসাস একইভাবে আরো অসংখ্য পরীকে আকৃষ্ট করে শেষে তাদেরকে তাচ্ছিল্যের সঙ্গে দূরে সরিয়ে দিত। এভাবে অপমানিত হয়ে তারা মন থেকে চাইত—যেন ভালোবেসেও ভালোবাসা না পাওয়ার কষ্ট কেমন তা নার্সিসাস একবার বুঝুক।

নার্সিসাসের চরম পরিণতি নিয়ে প্রচলিত রয়েছে কয়েকটি কাহিনি। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য একটি কাহিনি ছিল এমন, নার্সিসাস নিজের রূপ নিজ চোখে স্পষ্টভাবে কোনোদিন দেখেনি। একদিন হরিণ শিকার করার পর ক্লান্ত নার্সিসাস পানির আশায় একটি হ্রদের পাড়ে আসে, স্বচ্ছ পানির হ্রদটিতে কোনোদিন কেউ হাত দেয়নি, কখনো কোনো পশুও এর পানি পান করেনি। নার্সিসাস যখন পানির জন্য নিচু হয় তখনি প্রথমবারের মতো নিজেকে স্পষ্ট দেখতে পায় এবং পানিতে প্রতিফলিত নিজের রূপ দেখে মুগ্ধ হয়ে যায়। মুগ্ধ নার্সিসাস বারবার বলতে লাগল, ‘এত সুন্দর! এত সুন্দর!’ নিজের প্রতিবিম্বকে ছুঁয়ে দেখার জন্য নার্সিসাস পানিতে ঝাঁপিয়ে পড়ে এবং ডুবে মারা যায়। 

অন্য একটি প্রচলিত কাহিনি থেকে জানা যায়, নার্সিসাস একদিন একটি জলাশয়ের কাছে গিয়ে দেখতে পায়, এক অপূর্ব জলদেবতা জল থেকে তার দিকে তাকিয়ে আছে। আসলে সেটি ছিল তার নিজেরই প্রতিবিম্ব, যেহেতু নার্সিসাস কখনোই নিজেকে দেখেনি তাই সে তার প্রতিবিম্বকে জলদেবতা ভেবে তার প্রেমে পড়ে যায়। মন্ত্রমুগ্ধের মতো নার্সিসাস তার নিজের প্রতিবিম্বকে চুম্বন করতে গেল, কিন্তু পানিতে ঢেউ তৈরি হওয়াতে সেই জলদেবতা গেল হারিয়ে। পানি শান্ত হলে জলদেবতা আবার ফিরে এলো। জল স্পর্শ করলেই যেহেতু জলদেবতা হারিয়ে যায় তাই ভয়ে নার্সিসাস আর জলের দিকে হাত বাড়ায় না। শুধু মন্ত্রমুগ্ধের মতো নিজের প্রতিবিম্বের দিকে তাকিয়ে থাকত। তার মৃত্যু হলো নিজের প্রতিবিম্বের দিকে তাকিয়ে থেকে থেকে।

নার্সিসাসের এই স্বভাব থেকেই আত্মকেন্দ্রিকতা বা আত্মপ্রেম বোঝাতে নার্সিসাস কমপ্লেক্স অভিধাটি ব্যবহার করা হয়ে থাকে। নার্সিসিজম মূলত ব্যক্তিত্বের সংকট কিংবা পার্সোনালিটি ডিসঅর্ডার। নার্সিসিজম কমপ্লেক্সে ভোগা মানুষজন এতোটাই আত্মকেন্দ্রিক হয়ে ওঠে যে তারা এই মোহ কাটিয়ে উঠতে পারে না। নিজেকে ভালোবাসা অবশ্যই দোষের কিছু নয়, তবে আত্মপ্রেম যখন কারো জন্য সর্বগ্রাসী হয়ে ওঠে তখনই তা সাইকোলজিক্যাল ডিজঅর্ডারে পরিণত হয়।

এইচ এম নাজমুল আলম