মহাবিপদের অশনিসংকেত!

আপডেট : ১১ আগস্ট ২০২১, ২১:০৪

আগামী ১৫ বত্সরেই পৃথিবীর তাপমাত্রা বৃদ্ধি পাইবে ১.৫ ডিগ্রি সেলসিয়াস! সম্প্রতি এমনই আশঙ্কার কথা জানাইয়াছে জলবায়ু পরিবর্তনবিষয়ক জাতিসংঘের বিশেষ প্যানেল আইপিসিসি। গবেষণায় জানা গিয়াছে—এই শতকের শেষ নাগাদ পৃথিবীর উপরিভাগের তাপমাত্রা ১.৫ ডিগ্রি সেলসিয়াস বৃদ্ধির যেই লক্ষ্যমাত্রা ধারণা করা হইয়াছিল—তাহা আগামী দেড় দশকেই পূর্ণ হইবে। অর্থাত্ ৮০ বত্সর ধরিয়া ক্রমশ যেই বিপদ দেখা দেওয়ার কথা, তাহা ১৫ বত্সরের মধ্যেই দেখা দিবে। উল্লেখ করা যাইতে পারে, আইপিসিসি এমন একটি সময় তাহাদের এই গবেষণার ফল প্রকাশ করিয়াছে, যখন পৃথিবীর অনেক দেশেই রেকর্ড তাপমাত্রা দেখা যাইতেছে, দাবদাহে পুড়িতেছে বিশ্বের বিভিন্ন অংশের ভিন্ন ভিন্ন বনাঞ্চল। ইহা ছাড়া পৃথিবীর অনেক অঞ্চলেই দেখা দিতেছে অতিবৃষ্টি, বন্যা।

প্রায় সকল বিজ্ঞানী এই একটি বিষয়ে একমত যে, এখনই সংযত না হইলে ধ্বংসের আর বেশি বাকি থাকিবে না। এইভাবে চলিতে থাকিলে বিশ্বের কোনো দেশই রক্ষা পাইবে না। সকলেরই কমবেশি ক্ষতি হইবেই। আইপিসিসি রিপোর্টে স্পষ্ট করিয়া বলা হইয়াছে, ২০০৮ সালে বিজ্ঞানীরা যাহা আঁচ করিয়াছিলেন, তাহার চাইতে এক দশক পূর্বেই বিশ্ব উষ্ণায়ন বিপজ্জনক জায়গায় পৌঁছাইয়া যাইতে পারে এবং ২০৩০ সালের মধ্যে ১.৫ ডিগ্রি সেলসিয়াস বৃদ্ধি পাইবে। এইখানে আরো উল্লেখ করা যাইতে পারে যে, বিশ্ব উষ্ণায়নের কারণে ১৯০১ হইতে ১৯৭১ সাল পর্যন্ত সমুদ্রের জলস্তর যেইখানে প্রতি বত্সর ১.৩ মিলিমিটার করিয়া বাড়িতেছিল, ২০০৭ হইতে ২০১৮ সালে তাহা বত্সরে ৩.৭ মিলিমিটারে গিয়া ঠেকিয়াছে। সামগ্রিকভাবে ১৯০১ হইতে ২০১৮ সাল পর্যন্ত গোটা বিশ্বে জলস্তরের গড় বৃদ্ধি ছিল ০.২০ মিটার। মনে রাখিতে হইবে, কোনো নির্দিষ্ট অঞ্চলের মধ্যে এই উষ্ণতা বৃদ্ধি সীমাবদ্ধ নাই। বিশ্বের সর্বত্রই লাগাতার এই বৃদ্ধি ঘটিতেছে। দ্রুত গতিতে উষ্ণতা বাড়িলেও, তাহা শীতল হইতে সময় লাগিয়া যাইতেছে অনেক বেশি—এত দিন যাহা লক্ষ করা যায় নাই। অর্থাত্ বিশ্ব উষ্ণায়ন ঘটিতেছে অধিক মাত্রায়, যাহার কারণেই জলবায়ু সহনশীলতার মাত্রা পার হইয়া যাইতেছে। এই জন্যই ১৯৫০ সালের পর হইতে তাপপ্রবাহের তীব্রতা লাগাতার বাড়িয়া চলিতেছে এবং পূর্বের তুলনায় ঘন ঘন তাপপ্রবাহ সৃষ্টি হইতেছে।

তাত্পর্যপূর্ণ ব্যাপার হইল, প্রতি ডিগ্রি তাপমাত্রা বৃদ্ধির কারণে অতিবৃষ্টির হার বৃদ্ধি পায় ৭ শতাংশ। সেই সঙ্গে বাড়ে শক্তিশালী সাইক্লোনের হার। অন্যদিকে পৃথিবীর তাপমাত্রা আর ৩ ডিগ্রি সেলসিয়াস বাড়িলে প্রতি শতকে দুই হইতে তিন বার ভয়ংকর অতিবৃষ্টির কবলে পড়িবে পৃথিবী। প্রতি দশকে একবার প্রচণ্ড খরায় অধিকাংশ জমি শুকাইয়া যাইবে এবং চার বার উর্বরতা হারাইবে। হিট ওয়েভ বা তাপপ্রবাহের ঘটনা ইতিমধ্যেই বাড়িয়াছে ২.৮ গুণ। আর একটি ডিগ্রি সেলসিয়াস তাপমাত্রা বাড়িলে তাহা ৯.৪ গুণ বাড়িবে। সারা বিশ্বের সকল সচেতন মানুষই স্বীকার করিতেছেন যে, মানুষের কর্মকাণ্ড পরিবেশের উপর যেই ক্ষতিকর প্রভাব ফেলিতেছে তাহা মানবসমাজের জন্য একটি ‘লাল সংকেত’। এই অবস্থায় বিজ্ঞানীরা আশঙ্কা করিতেছেন, এই শতাব্দীর শেষ নাগাদ সমুদ্রের পানির স্তরের উচ্চতা বৃদ্ধির পরিমাণ দুই মিটারের কাছাকাছি চলিয়া যাইতে পারে। দুঃখজনকভাবে, অতীতে যেই গ্রিনহাউজ গ্যাস নির্গমন ঘটিয়াছে এবং ভবিষ্যতে ঘটিবে—তাহার ফলে জলবায়ুতে এমন সকল পরিবর্তন হইয়া যাইতেছে যাহা আর ঠেকানো যাইবে না। ইহার প্রভাবে কয়েক শতাব্দী বা সহস্রাব্দ ধরিয়া পৃথিবীর মহাসাগর, জমিয়া থাকা বরফের স্তর ও সাগরের পানির স্তরের উপর এর প্রভাব দেখা যাইবে।

আমাদের একটাই পৃথিবী। যেহেতু প্লানেট-বি নাই, তাই প্লান-বি বলিয়া কোনো বিকল্প নাই। সুতরাং কার্বন ডাইঅক্সাইড ও মিথেনের মতো গ্রিনহাউজ গ্যাস নির্গমন বড় আকারে কমাইতে পারিলে তাপমাত্রা বৃদ্ধিকে হয়তো স্থিতিশীল অবস্থায় আনা যাইবে। আগামী নভেম্বরে স্কটল্যান্ডের গ্লাসগোতে অনুষ্ঠিতব্য বিশ্ব জলবায়ু সম্মেলনে এই মহাবিপদ হইতে রক্ষা পাইবার বৃহত্তর পরিকল্পনা করিতেই হইবে।