বঙ্গবন্ধুকে সপরিবারে হত্যা—

সেনা বিদ্রোহে নয়, পরিকল্পিত খুন

আপডেট : ১১ আগস্ট ২০২১, ২১:১২

১৯৭৫ সালের ১৫ই আগস্ট অতিপ্রতুষ্যে জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে সপরিবারে নির্মম-বর্বরোচিত হত্যাকাণ্ডে দেশবাসী হতবিহ্বল ও কিংকর্তব্যবিমূঢ় হয়ে পড়েছিল। বিক্ষিপ্ত কিছু প্রতিবাদ হলেও কার্যকর কোনো প্রতিবাদ বা প্রতিরোধ গড়ে ওঠেনি—এটা সত্য ও বাস্তবতা।

২৬ সেপ্টেম্বর ’৭৫ দখলদার রাষ্ট্রপতি মোশতাক আহমেদ ‘ইনডেমনিটি অধ্যাদেশ, ১৯৭৫’ জারি করে বঙ্গবন্ধু ও তার পরিবারের অন্যান্য সদস্যসহ ১৫ আগস্ট সংঘটিত সব হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে জড়িত ব্যক্তিদের দায়মুক্তির পথ করে দেয়। পরবর্তী সময়ে জেনারেল জিয়া ক্ষমতা দখল করে খুনের সঙ্গে জড়িত প্রায় সবাইকে বিদেশের কূটনৈতিক মিশনে চাকরি প্রদান করে পুরস্কৃত করেন।

বঙ্গবন্ধুর ঘাতকেরা রাষ্ট্রীয় আনুকূল্য ও পৃষ্ঠপোষকতা পায় জিয়া-এরশাদ ও বেগম জিয়ার শাসনামল পর্যন্ত। ১৯৯৬ সালে বঙ্গবন্ধুকন্যা শেখ হাসিনার নেতৃত্বে সরকার গঠিত হলে ২ অক্টোবর ১৯৯৬ তারিখে বঙ্গবন্ধু ও তার পরিবারবর্গের হত্যাসংক্রান্তে ধানমন্ডি থানায় একটি মামলা দায়ের হয়।

মামলার তদন্ত শেষে মোট ২০ জন অভিযুক্তের বিরুদ্ধে ঢাকার দায়রা জজ আদালতে বিচারকার্য শুরু হয়। আসামিদের বিরুদ্ধে দণ্ডবিধির ১২০বি/৩০২/৩৪ এবং ২০১ ধারায় অভিযোগ গঠন করা হয়। এক আসামি মিসেস জোবাইদা রশিদ চার্জ গঠনের বিরুদ্ধে হাইকোর্টে রিভিশন দায়ের করে মামলা থেকে অব্যাহতি পান। রাষ্ট্রপক্ষ কর্তৃক আদালতে উপস্থাপিত সাক্ষ্য-প্রমাণের ভিত্তিতে ঢাকার বিজ্ঞ দায়রা জজ কাজী গোলাম রসুল ০৮/১১/১৯৯৮ইং তারিখের রায় ও আদেশে ১৯ জন আসামির মধ্যে ১৫ জনকে দোষী সাব্যস্ত করে সবাইকে ‘মৃত্যুদণ্ড’ প্রদান করেন। অন্য চার জন খালাস পান।

আইন অনুযায়ী ‘মৃত্যুদণ্ড’ আদেশ অনুমোদনের জন্য হাইকোর্টে রেফারেন্স পাঠানো হয়। নানান নাটকীয়তার পর হাইকোর্ট বিভাগের একটি বেঞ্চে ডেথ রেফারেন্সের শুনানি হয়। বেঞ্চের কনিষ্ঠ বিচারক জনাব এ বি এম খায়রুল হক সব দণ্ডিতের মৃত্যুদণ্ড বহাল রাখলেও জ্যেষ্ঠ বিচারক জনাব মো. রুহুল আমিন ১০ জনের মৃত্যুদণ্ডাদেশ বহাল রাখেন এবং ৫ জনকে খালাস প্রদান করেন। ফলে ডেথ রেফারেন্সটি তৃতীয় বেঞ্চে গড়ায়। তৃতীয় বেঞ্চের মাননীয় বিচারপতি জনাব ফজলুল করিম ১২ জনের মৃত্যুদণ্ডাদেশ অনুমোদন এবং ৩ জনকে খালাস প্রদান করেন।

হাইকোর্টের রায়ের বিরুদ্ধে দণ্ডিত ৫ জন আপিল বিভাগে ‘লিভ পিটিশন’ দাখিল করে। আপিল বিভাগ দণ্ডিতদের উত্থাপিত ৫টি আইনি প্রশ্ন নিষ্পত্তির জন্য লিভ মঞ্জুর করে। দণ্ডিতদের অন্যতম একটি আইনগত প্রশ্ন ছিল, ‘যেহেতু সেনা বিদ্রোহের ফলশ্রুতিতে রাষ্ট্রপতি ও তার পরিবারের সদস্যরা নিহত হয়েছিলেন, সুতরাং এটা সাধারণ বা প্রচলিত কোনো খুন নয়; এবং সে কারণে প্রচলিত আদালতে এ খুনের বিচার ছিল এক্তিয়ারবহির্ভূত, যা সমগ্র বিচার কার্যক্রমকে কলুষিত (vitiate) করেছে।’

অপর আরো একটি ছিল, ‘রাষ্ট্রপক্ষ কর্তৃক উত্থাপিত সাক্ষ্যসমূহ প্রমাণ করে না যে, তর্কিত হত্যাকে সংঘটিত করার জন্য আপিলকারীরা কোনো ‘অপরাধমূলক ষড়যন্ত্র’ (criminal conspiracy) করেছিল, বরং সামরিক বিদ্রোহ হয়েছিল মুজিব সরকারের পরিবর্তনের জন্য। সুতরাং দণ্ডবিধির ১২০ বি ধারা অনুযায়ী দণ্ডিতরা কোনো অপরাধ করেনি।’

আপিলকারীদের পক্ষে বিজ্ঞ আইনজীবীগণ যুক্তি উপস্থাপন করেন যে, উত্থাপিত সাক্ষ্য-প্রমাণ থেকে প্রকাশ পায় যে, ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট রাষ্ট্রপতি ও তার পরিবার-পরিজনদের হত্যাকাণ্ড এবং ক্ষমতার পট পরিবর্তন ছিল কিছুসংখ্যক সেনা অফিসারের বিদ্রোহের ফল, সে কারণে এই বিচারকার্য ১৯৫২ সালের সেনা আইনের বিধান অনুযায়ী ‘কোর্ট মার্শালে’ অনুষ্ঠিত হওয়া উচিত ছিল; কেননা, ঘটনার উত্পত্তি ছিল ঢাকা সেনানিবাসে।

আপিলকারীগণের আইনজীবীরা আরো যুক্তি দেখান যে, ১৯৭৫ সালের ১৪ আগস্ট দিবাগত রাতের ঘটনায় কোনো অবসরপ্রাপ্ত সেনা অফিসার কিংবা সেনা আইনের অধীন নয় এমন অপর কোনো ব্যক্তি যোগ দিয়ে থাকলেও সেনা আইনের ৩১ ধারার পরিসীমার মধ্যে সেটাও হবে বিদ্রোহ এবং তদনুযায়ী তাদেরও সেনা আইনের অধীনে কোর্ট মার্শালে বিচার করা উচিত ছিল। যেহেতু ১৪ আগস্ট রাতে ঢাকা সেনানিবাস থেকে তাত্ক্ষণিকভাবে ঘটনাটির উত্পত্তি হয়েছিল, সেহেতু স্পষ্টত প্রতীয়মান হয় যে, ঘটনাটি ছিল একটা সহজ-সরল সেনা বিদ্রোহ এবং তদুপরি দণ্ডবিধির ৩৪ ধারা কিংবা ১২০ খ ধারার আওতাধীন কোনো চুক্তি বা অপরাধমূলক ষড়যন্ত্র বা পূর্বপরিকল্পিত বা পূর্ব আয়োজিত পরিকল্পনার অস্তিত্ব ছিল না। উপরন্তু, রাষ্ট্রপতি সশস্ত্র বাহিনীর সর্বাধিনায়ক হওয়ায় তার হত্যাকাণ্ডের বিচার কোর্ট মার্শালে হওয়া উচিত ছিল। যুক্তির সমর্থনে বিজ্ঞ আইনজীবীগণ জামিল হক বনাম বাংলাদেশ, ৩৪ ডিএলআর (এডি), পৃষ্ঠা-১২৫ মামলাটি, অর্থাত্ জিয়াউর রহমানের হত্যার বিষয়ে কোর্ট মার্শালে বিচার বিষয়ে আপিল বিভাগের সিদ্ধান্তের ওপর নির্ভর করেন।

অপরদিকে রাষ্ট্রপক্ষের বিজ্ঞ আইনজীবীদের যুক্তি ছিল যে, আপিলকারীরা সর্বোচ্চ আদালতে ইনডেমনিটি অধ্যাদেশ (বাতিল) আইন চ্যালেঞ্জ করলেও বিচারিক আদালতের এক্তিয়ার নিয়ে বিচার চলাকালে কখনো কোনো আপত্তি বা প্রশ্ন উত্থাপন করেনি। সুতরাং বর্তমান পর্যায়ে এ ধরনের প্রশ্ন উত্থাপন অসত্ ও উদ্দেশ্যপ্রণোদিত। হত্যাকাণ্ডটি যেহেতু পূর্বপরিকল্পিত, সেহেতু ফৌজদারি কার্যবিধির অধীনে প্রচলিত আদালতে বিচার সম্পন্ন করায় আইনগতভাবে কোনো ব্যত্যয় ঘটেনি; এবং সেনা আইন, নৌবাহিনী অধ্যাদেশ ১৯৬১ এবং ফৌজদারি কার্যবিধির ধারা ৫৪৯-এর সঙ্গে সাংঘর্ষিক কোনো অবস্থান তৈরি হয়নি।

আপিল বিভাগ উভয় পক্ষের বিজ্ঞ আইনজীবীদের যুক্তি, সেনা আইন, নৌবাহিনী অধ্যাদেশ ও ফৌজদারি কার্যবিধি, দণ্ডবিধি ও উপস্থাপিত সাক্ষ্য-প্রমাণ পর্যালোচনাক্রমে আপিলকারীগণ কর্তৃক প্রচলিত ফৌজদারি আদালতে বিচার প্রক্রিয়ার বৈধতা সম্পর্কে উত্থাপিত আপত্তি নাকচ করেন অন্যতম এই কারণে যে, বিচারিক আদালতের এক্তিয়ার নিয়ে আসামিপক্ষে বিচার চলাকালীন কখনোই কোনো আপত্তি বা প্রশ্ন উত্থাপন করা হয়নি; এমনকি আসামিগণের ফৌজদারি কার্যবিধির ৩৪২ ধারা অনুযায়ী পরীক্ষার সময়েও এ বিষয়ে তাদের কোনো বক্তব্য ছিল না; সুতরাং এই পর্যায়ে এ ধরনের প্রশ্ন উত্থাপনের কোনো সুযোগ নেই। আপিল বিভাগ অভিমত প্রদান করে যে, সেনা আইনের ৩১ ধারায় ‘বিদ্রোহের’ শাস্তির বিধান উল্লেখ থাকলেও ঐ আইনে বিদ্রোহের কোনো সংজ্ঞা দেওয়া হয়নি, সেক্ষেত্রে নৌবাহিনীর অধ্যাদেশ, ১৯৬১-এর ৩৫ ধারায় ‘বিদ্রোহের’ যে সংজ্ঞা দেওয়া হয়েছে, সেনা আইনের ক্ষেত্রেও তা প্রযোজ্য হবে।

‘বিদ্রোহ’ তখনই হবে যখন সশস্ত্র বাহিনীর আইনের অধীন দুই বা ততোধিক ব্যক্তি কিংবা মিলিত ব্যক্তিদের মধ্যে সশস্ত্র বাহিনীর আইনের অধীন অন্তত দুই ব্যক্তি একত্রিত হয়ে—ক. বাংলাদেশের সশস্ত্র বাহিনীসমূহের অথবা সেই বাহিনীসমূহের সঙ্গে সহযোগিতাকারী যে কোনো বাহিনীর কিংবা উক্ত বাহিনীসমূহের যে কোনো একটির যে কোনো অংশের আইনসম্মত কর্তৃপক্ষকে উত্খাত করে বা প্রতিহত  করে; খ. অবাধ্যতার দ্বারা যদি বাহিনীর শৃঙ্খলা ধ্বংস করা হয় কিংবা কোনো কর্তব্য বা দায়িত্ব (সার্ভিস) এড়িয়ে যাওয়ার লক্ষ্যে অথবা শত্রুর বিরুদ্ধে কার্যক্রমের বিষয়ে কর্তৃপক্ষকে অমান্য করে; কিংবা গ. সশস্ত্র বাহিনীতে অথবা সেই বাহিনীর সঙ্গে সহযোগিতাকারী যে কোনো বাহিনীতে কিংবা সশস্ত্র বাহিনীসমূহের যে কোনো বাহিনীর যে কোনো অংশে যে কোনো কর্তব্য বা দায়িত্ব সম্পাদনে বাধা সৃষ্টি করে।

সাক্ষ্য-প্রমাণাদি বিশ্লেষণে আপিল বিভাগ সুস্পষ্ট অভিমত দেয় যে, আলোচ্য মামলার ক্ষেত্রে সামরিক বিদ্রোহের উপরোক্ত উপাদানসমূহ সম্পূর্ণ অনুপস্থিত, অর্থাত্ আপিলকারী ও অন্যান্য আসামি যৌথভাবে সেনা কর্তৃপক্ষের অবাধ্য হয়েছে বা উত্খাতের চেষ্টা করেছে বা কর্মে অস্বীকৃতি জানিয়েছে বা কর্তব্যে অবহেলা করেছে বা আদেশ পালনে অস্বীকৃতি জানিয়েছে এমন উপাদান পরিলক্ষিত হয়নি।

আপিল বিভাগ আরো অভিমত দিয়েছে যে, ‘সেনা আইনের ৫ম অধ্যায়ে হত্যা’ অপরাধের সংজ্ঞা প্রদান করা হয়নি। দণ্ডবিধির ৩০০ ধারায় হত্যার অপরাধকে সংজ্ঞায়িত করা হয়েছে। যখন সেনা আইন অনুসারে কোনো বিদ্রোহের অপরাধ সংঘটিত হয়, তখন এটা শুধু ‘কোর্ট মার্শাল’ দ্বারা বিচার্য। সেনা আইনের ৫৯(১) ধারায় বলা আছে যে, উপধারা (২)-এর বিধানাবলি সাপেক্ষে সেনা আইনের অধীন কোনো ব্যক্তি যদি কোথাও ‘সিভিল অপরাধ’ সংঘটিত করে, তাহলে সে সেনা আইনের অধীনে অপরাধের জন্য দোষী বলে গণ্য হবে; এবং সেনা আইনের ৮(২) ধারায় প্রদত্ত সংজ্ঞা অনুযায়ী ‘সিভিল অপরাধ’ বলতে এমন অপরাধকে বোঝায়, যা বাংলাদেশে সংঘটিত হলে ফৌজদারি আদালত কর্তৃক বিচার্য। এই আইনের ৮(৭) ধারা অনুযায়ী বাংলাদেশে অবস্থিত অথবা সরকারের অনুমতিক্রমে অন্য কোথাও প্রতিষ্ঠিত সাধারণ ফৌজদারি বিচারব্যবস্থার আদালতকে ফৌজদারি আদালত বলা হয়েছে। কাজেই এ ব্যাপারে কোনো বিরোধ বা বিতর্কের অবকাশ নেই যে, আপিলকারীদের কার্যকলাপ ‘সিভিল অপরাধের’ মতো দুষ্কর্মের মধ্যে পড়ছে। ফৌজদারি কার্যবিধির অধীনে গঠিত একটি ফৌজদারি আদালতে আপিলকারীদের বিচারের ব্যাপারে কোনো আইনগত বাধা ছিল না। অবশ্য সেনা আইনের ৫৯(২) ধারায় উল্লেখ আছে যে, সেনা আইনের আওতাধীন কোনো ব্যক্তি যদি সেনা আইনের বহির্ভূত কোনো ব্যক্তিকে হত্যা করে (ভিকটিম) তাহলে সে সেনা আইনের অধীনে বিচারযোগ্য হবে না যদি না সে ক. ‘সক্রিয় কর্মে’ (active service) থাকাকালীন অবস্থায় অথবা খ. বাংলাদেশের বাহিরে কোনো জায়গায় অথবা গ. সীমান্তবর্তী কর্মস্থলে এই অপরাধ করে। অর্থাত্, ক্ষতিগ্রস্ত ব্যক্তি (ভিকটিম) যদি সেনা আইন দ্বারা বাধ্য না হন এবং অপরাধ সংঘটনের সময় অপরাধীরা যদি ‘সক্রিয় কর্মে’ থেকে সেনা আইন দ্বারা বাধ্য না হন। সেনা আইনের ৮(১) ধারা অনুযায়ী ‘সক্রিয় কর্মে’ বলতে সেই সময়কে বোঝায়, যে সময়ে এই রকম ব্যক্তি সামরিক অভিযানে অথবা শত্রুর বিরুদ্ধে অভিযানে নিয়োজিত কোনো বাহিনীতে সংযুক্ত থাকে, অথবা শত্রু দ্বারা দখলকৃত একটি বাহিনীর একটি অংশ হয়। . . . . .। আলোচ্য মামলায় আপিলকারীদের কেউ সেনা আইনের ৮(১) ধারায় সংজ্ঞায়িত ‘সক্রিয় কর্মে’ নিয়োজিত ছিল না; এবং যেহেতু, ধারায় উল্লিখিত তিনটি বিকল্প শর্তের কোনোটাই পূরণ হয়নি, সেহেতু ৫৯ ধারায় (২) উপধারা অনুযায়ী অভিযুক্ত ব্যক্তিগণের বিচার সেনা আইনের অধীনে হতে পারে না। উপরন্তু, আপিলকারী ও অন্য আসামিদের বিরুদ্ধে এমন অভিযোগ আনা হয়নি যে, ‘সক্রিয় কর্মে’ থাকাকালীন অবস্থায় তারা হত্যাপরাধ করেছে এবং আপিলকারীরাও দাবি করেনি যে, তাদের ‘সক্রিয় কর্মে’ থাকাকালীন অবস্থায় ঐ হত্যাকাণ্ড সংঘটিত হয়েছিল। রেকর্ডভুক্ত এমন উপকরণও নেই, যা থেকে প্রমাণিত হয় যে আপিলকারীরা শত্রুর বিরুদ্ধে অভিযানে নিয়োজিত থাকাকালে কিংবা সামরিক অভিযানে নিয়োজিত থাকাকালে অথবা শত্রু কর্তৃক সম্পূর্ণরূপে বা আংশিকভাবে অধিকৃত কোনো দেশ বা স্থান অভিমুখে অগ্রসরমাণ থাকাকালে ঘটনাটি সংঘটিত হয়েছিল।’

আপিল বিভাগ পর্যবেক্ষণে উল্লেখ করে যে, বিচারিক আদালত সেনা আইনের ধারা ৯৪ এবং ফৌজদারি কার্যবিধির ধারা ৫৪৯-এর বিধান অনুযায়ী সংশ্লিষ্ট সেনা কর্তৃপক্ষকে আসামিদের বিরুদ্ধে বিচারের বিষয়টি অবহিত করলে সেনা সদর দপ্তর থেকে আদালতে জানানো হয় যে, সেনা আইনের ৯৪ ধারা অনুযায়ী প্রচলিত ফৌজদারি আদালতে অবসরপ্রাপ্ত সেনা কর্মকর্তাদের বিচার কার্যক্রমে কোনো বাধা নেই। সুতরাং আপিলকারীদের বিচার প্রচলিত ফৌজদারি আদালতে অনুষ্ঠানে কোনো পদ্ধতিগত ক্রটি হয়নি এবং আদালত সম্পূর্ণ এক্তিয়ারসম্পন্ন ছিল।

আপিল বিভাগ আরো অভিমত দেন যে, বর্তমান মামলায় উপস্থাপিত সাক্ষ্য-প্রমাণ থেকে এমন কিছু প্রমাণিত হয় না যে, সেনাবাহিনীর যথাযথ কর্তৃপক্ষ আপিলকারী ও অন্যান্য আসামির বিরুদ্ধে কর্তৃপক্ষের নির্দেশ লঙ্ঘন বা অবাধ্যতা বা শৃঙ্খলা ভঙ্গের দায়ে তাদের বিরুদ্ধে মামলা রুজু করেছিল, যার জন্য ‘কোর্ট মার্শাল’ হতে পারত।

আপিলকারীগণের বিজ্ঞ আইনজীবীবৃন্দ কর্তৃক নির্ভরকৃত ‘জামিল হক বনাম বাংলাদেশ সরকার’ মামলার বিষয়ে আপিল বিভাগ অভিমত দেয় যে, ঐ মামলায় রিট আবেদনকারীদের ১৯৮১ সালের ২৯ মার্চ দিবাগত রাতে সংঘটিত বিদ্রোহের অপরাধের জন্য সেনা আইনের অধীনে কোর্ট মার্শালে বিচার ও দোষী সাব্যস্ত করা হয়েছিল। ঐ বিদ্রোহের পরিণতিতে তদানীন্তন রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান প্রাণ হারিয়েছিলেন। অভিযুক্তরা সেনা আইনের অধীনে গঠিত ‘কোর্ট মার্শালের’ সিদ্ধান্ত চ্যালেঞ্জ করে রিট করেছিলেন। হাইকোর্ট বিভাগ রিট পিটিশনটি  রক্ষণীয় নয় মর্মে খারিজ করে, যা আপিল বিভাগ বহাল রাখে। সুতরাং বর্তমান মামলাটির প্রকৃত ঘটনা ও সমগ্রিক পরিস্থিতি বিচারে উল্লেখিত মামলার কোনো যোগসূত্র নেই।

আপিলকারীদের বিরুদ্ধে বঙ্গবন্ধুকে সপরিবারে হত্যায় ‘অপরাধমূলক ষড়যন্ত্র (criminal conspiracy)-এর অভিযোগ প্রমাণিত হয়নি মর্মে যুক্তির বিপরীতে আপিল বিভাগ অভিমত দিয়েছে যে, “ষড়যন্ত্র অপরাধের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ উপাদান হচ্ছে একটা বেআইনি কাজ করতে দুই বা ততোধিক ব্যক্তির ‘মতৈক্য’। মতৈক্য অনুসারে বেআইনি কাজটি করা হতেও পারে, না-ও হতে পারে, তথাপি ‘মতৈক্যটাই’ হলো অপরাধ এবং তা শাস্তিযোগ্য। কোনো বেআইনি কাজ কিংবা বেআইনি নয় এমন কাজ বেআইনি পন্থায় করা বা করার কারণ ঘটানোর জন্য দুই বা ততোধিক ব্যক্তির স্রেফ একমত হওয়াটাই হলো ‘অপরাধমূলক ষড়যন্ত্র’। ষড়যন্ত্রে সহযোগিতাকারীকে অপরাধ সংঘটনকারী ব্যক্তির সঙ্গে অপরাধ কর্মে শারীরিকভাবে বা প্রত্যক্ষভাবে অংশ নিতে হবে এমন কোনো কথা নেই, ষড়যন্ত্র অনুযায়ী অপরাধ সংঘটিত হয়েছে এবং তাতে সে যে কোনো পর্যায়ে লিপ্ত থাকলে সেটাই যথেষ্ট। ‘ষড়যন্ত্র’ যেহেতু গোপনে সংঘটিত হয়, সেহেতু এর প্রত্যক্ষ সাক্ষ্য থাকে না। ষড়যন্ত্র প্রমাণে পারিপার্শ্বিক সাক্ষের ওপর নির্ভর করতে হয়।....। আপিলকারীরা সেনাবাহিনী থেকে বরখাস্ত/অব্যাহতিপ্রাপ্ত কর্মকর্তা হওয়া সত্ত্বেও ১৯৭৫ সালের ১৪ আগস্ট মধ্যরাতে সেনাবাহিনীর প্যারেডে সাদা পোশাকে উপস্থিত ছিল, যা থাকার কথা নয়। নাইট প্যারেডে অংশ নিয়েছিল এবং তাদের উদ্দেশ্য পূরণ ও বাস্তবায়নের জন্য পরিকল্পিতভাবে এই নাইট প্যারেডের ব্যবস্থা করা হয়েছিল।

আপিল বিভাগের মতে, উপরোক্ত ঘটনাসমূহ প্রমাণ করে, আপিলকারীরা ‘অপরাধমূলক ষড়যন্ত্রের’ অপরাধ সংঘটিত করেছে বঙ্গবন্ধু ও তার পরিবারের সদস্যবৃন্দকে হত্যার উদ্দেশ্যে, সেনা বিদ্রোহ সংঘটিত করার জন্য নয়।

n  লেখক: বিচারপতি, বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্ট, হাইকোর্ট বিভাগ; সাবেক চেয়াম্যান, আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-১, বাংলাদেশ