‘এখন যৌবন যার যুদ্ধে যাবার তার শ্রেষ্ঠ সময়’

আপডেট : ১১ আগস্ট ২০২১, ২১:১৩

আজ আন্তর্জাতিক যুব দিবস। তারুণ্যের বিকাশ ও উন্নয়নে ১৯৯৮ সালে পর্তুগালের রাজধানী লিসবনে অনুষ্ঠিত জাতিসংঘের ‘ওয়ার্ল্ড কনফারেন্স অব মিনিস্টার রেসপনসিবল ফর ইয়ুথ’ ১২ আগস্টকে ‘আন্তর্জাতিক যুব দিবস’ হিসেবে উদ্যাপনের প্রস্তাব করে। পরের বছর ১৯৯৯ সালে জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদে দিনটিকে ‘আন্তর্জাতিক যুব দিবস’ হিসেবে পালনের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। সেই থেকে বিশ্বের বিভিন্ন দেশে দিনটি পালন করা হচ্ছে। আন্তর্জাতিক যুব দিবস ২০২১ সালের প্রতিপাদ্য হলো—‘Transforming Food Systems: Youth Innovation for Human’.

বাংলাদেশের ‘জাতীয় যুবনীতি’ অনুসারে ১৮ থেকে ৩৫ বছর বয়সিদের ‘যুব’ বলে চিহ্নিত করা হয়েছে। এ হিসাবে মোট জনসংখ্যার এক-তৃতীয়াংশই যুব জনতা। আমরা যে ধর্মীয় উগ্রবাদিতা কিংবা মাদকাসক্তি থেকে তাদের রক্ষার জন্য প্রচেষ্টা চালাচ্ছি, সেখানে সাংস্কৃতিক জাগরণের গুরুত্ব এখনো প্রতিষ্ঠিত হয়নি। অতীতে এ দেশের তরুণরা জাতীয় জীবনে গুরুত্বপূর্ণ প্রভাব রেখে গেছেন। সূর্য সেন-প্রীতিলতার ব্রিটিশবিরোধী আন্দোলন থেকে শুরু করে বঙ্গবন্ধুর নেতৃত্বের জয়গান কিংবা বায়ান্নর ভাষা আন্দোলন, বাষট্টির শিক্ষা আন্দোলন, উসত্তরের গণ অভ্যুত্থান, একাত্তরের মহান মুক্তিযুদ্ধে উল্লেখযোগ্য ভূমিকা রয়েছে এ দেশের যুবসমাজের। আবার আন্তর্জাতিক অঙ্গনে বিশেষত আরব বসন্তের নেতৃত্ব ছিল তরুণসমাজের হাতে। মিশর, লিবিয়া, ইয়েমেন, তিউনিসিয়া, বাহরাইনে বেকারত্ব, অর্থনৈতিক মন্দা আর স্বৈরশাসকের দুঃশাসনের বিরুদ্ধে আন্দোলনে তরুণরাই মূল ভূমিকা রেখেছে। এ জন্য আন্তর্জাতিক যুব দিবসের তাত্পর্য অনেক বিশদ।

বিংশ শতাব্দী ছিল বিশ্বব্যাপী যুবসমাজের অঢেল অর্জন আর অধিকার আদায়ের স্মরণীয় যুগ। এ কারণে এই একবিংশ শতাব্দীর বিশ্বায়নের যুগে দাঁড়িয়ে ঐ শতাব্দীর তরুণদের নিজ নিজ যোগ্যতা ও মেধার মাধ্যমে জাতীয় রাজনীতিতে ব্যাপক প্রভাব বিস্তার করার বিষয়টি আমরা উপলব্ধি করতে পারছি। শুধু রাজনীতি নয়, পরিবেশ, অর্থনীতি ও সমাজ পরিবর্তনের নানা ক্ষেত্রে তারা পাঠসূচির বাইরে অবদান রেখেছে। শিক্ষা পরিকল্পনা থেকে শুরু করে জলবায়ু পরিবর্তন, উষ্ণায়ন বা গ্লোবাল ওয়ার্মিং, শান্তির পক্ষে উচ্চকণ্ঠ হতে দেখা গেছে তরুণদের। আফ্রিকা জুড়ে জাতিগত দাঙ্গার প্রসঙ্গে তারা মানবতার পক্ষে কথা বলেছে। বিশ্বব্যাপী নিজেদের অধিকারের কথা বলার সঙ্গে সঙ্গে মাদকদ্রব্যের বিরুদ্ধে দাঁড়িয়েছে বর্তমান প্রজন্ম, বর্ণবাদবিরোধী হয়ে উঠেছে, অসাম্প্রদায়িক শক্তির জয়গান গাইছে, পরিবেশ রক্ষায় ও দূষণ মুক্তিতে নিবেদিত হয়েছে।

সময়োপযোগী ও বাস্তবমুখী পরিকল্পনা গ্রহণ করে তরুণসমাজকে দায়িত্ববান নাগরিক হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করা রাষ্ট্রেরই দায়িত্ব। সরকারের চিন্তাচেতনা হলো কীভাবে বাংলাদেশকে সমৃদ্ধিশালী ও বঙ্গবন্ধুর স্বপ্নের সোনার বাংলা প্রতিষ্ঠা করা যায়। সরকারের চিন্তাচেতনা ও কর্মসূচির সঙ্গে তরুণসমাজের চিন্তাচেতনার একটা গভীর মিল রয়েছে। ২০৩০ সালের মধ্যে টেকসই উন্নয়নের অভীষ্ট (এসডিজি) লক্ষ্য অর্জনে যুবসমাজের অবদানও অনস্বীকার্য হয়ে উঠেছে। দুর্নীতিবিরোধী আন্দোলন ও সুশাসন প্রতিষ্ঠায় তরুণদের সক্রিয় অংশগ্রহণ জরুরি। বর্তমান তরুণসমাজকে দুর্নীতির বিরুদ্ধে কথা বলতে হবে, সুশাসন প্রতিষ্ঠায় নিবেদিত থাকতে হবে আর এসডিজি অর্জনে তারুণ্যের উদ্দীপনাকে কাজে লাগাতে হবে।

সরকার ও সরকারের উচ্চপর্যায়ের ব্যক্তিরা দুর্নীতি দমন ও সুশাসন প্রতিষ্ঠায় অঙ্গীকারগুলো পালন করলে তরুণসমাজকে সহজেই ইতিবাচক কাজে সম্পৃক্ত করা যাবে। সরকারি ও বেসরকারি সব ক্ষেত্রে চাকরিতে নিয়োগপ্রক্রিয়া দুর্নীতিমুক্ত করে মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় বিশ্বাসী প্রকৃত মেধা ও যোগ্যতাসম্পন্নকে প্রতিযোগিতার মাধ্যমে নিয়োগ দিতে হবে। যুবসমাজের মধ্যে মানবিক ও নৈতিক মূল্যবোধের বিকাশ ও চর্চার সম্প্রসারণ করতে হবে, যেন অশিক্ষা, অপশিক্ষা, কুসংস্কার ও ধর্মীয় ভ্রান্ত ধারণায় বিপথগামী হওয়া থেকে তারা রক্ষা পায়।

‘এখন যৌবন যার যুদ্ধে যাবার তার শ্রেষ্ঠ সময়’—এই যুদ্ধ এখন জঙ্গিবাদী চেতনার বিরুদ্ধে, এই যুদ্ধ এখন মাদকাসক্তির বিরুদ্ধে, সব অকল্যাণের বিরুদ্ধে, ন্যায়ের পক্ষে আর নিজেকে সুস্থ-স্বাভাবিক রাখার জন্য সংগ্রাম করে যাওয়া। দেশের অর্থনীতির চালিকাশক্তি যুবসমাজ। দেশের অর্থনীতিকে গতিশীল করার জন্য যুবসমাজকে গুরুত্ব দিয়ে প্রণীত হওয়া দরকার সব কর্মপরিকল্পনা। তাদের সৃজনশীলতাকে সুরক্ষা দিতে হবে। উত্সাহী করতে হবে জ্ঞানচর্চায়। ব্যবসায়-বাণিজ্য কিংবা বিনিয়োগে এগিয়ে এলে সরকারি তদারকি রেখে নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হবে। বেকারত্ব, চাকরিতে তদবিরবাণিজ্য, শিক্ষাজীবনের সেশনজট আর বিনোদনের অভাব এখনকার তরুণসমাজকে ফেসবুককেন্দ্রিক মোবাইল বৃত্তের মধ্যে আবদ্ধ করেছে। এসব নেতিবাচক অনুষঙ্গ থেকে মুক্ত করে তরুণসমাজকে আলোর পথে পরিচালিত করাই হোক আন্তর্জাতিক যুব দিবসের মূলমন্ত্র।

n লেখক :শিক্ষার্থী, জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়, ঢাকা।