কৃত্রিম বৃষ্টি বর্ষণে ক্লাউড সিডিং

আপডেট : ১১ আগস্ট ২০২১, ২১:১৩

মানুষ নিজেদের বিবেক-বুদ্ধি, বিচার-বিশ্লেষণ, মেধা ও প্রায়োগিক দক্ষতা কাজে লাগিয়ে মানুষ প্রকৃতির বৈরী পরিস্থিতিকে ধীরে ধীরে নিয়ন্ত্রণ করতে শিখেছে। প্রচণ্ড দাবদাহ? তাতে কী! শীতল পরশদানকারী ফ্যান কিংবা এসি তো আছেই। সমুদ্রপথে যাতায়াতের সুবিধার্থে বানিয়েছে সুবিশাল জাহাজ। পাখির মতো আকাশে ওড়ার স্বপ্ন থেকে তৈরি হয়েছে অত্যাধুনিক উড়োজাহাজ, হেলিকপ্টার ও রকেটের মতো উড়ন্ত বাহনগুলো। প্রকৃতির হাজার হাজার উপাদান নিয়ন্ত্রণের পাশাপাশি সম্প্রতি মানুষ নিয়ন্ত্রণ করতে শিখেছে বৃষ্টিকেও। কৃত্রিম বৃষ্টিপাত সেরকমই একটি প্রযুক্তি। কৃত্রিম বৃষ্টিপাত বলতে প্রকৃতির ওপর বিজ্ঞানের আশীর্বাদ কাজে লাগিয়ে নামানো বৃষ্টিবর্ষণকে বোঝায়।

কৃত্রিমভাবে বৃষ্টিপাতের বিষয়টি সর্বপ্রথম মাথায় আসে পরিবেশবিজ্ঞানী লুই গাথমানের। তিনিই প্রথম প্রকৃতির মেঘকে মানুষের নিয়ন্ত্রণাধীন বৃষ্টিতে রূপান্তর করতে তরল কার্বন ডাই-অক্সাইড ব্যবহারের প্রস্তাব রাখেন। ১৯৩০ সালে বিজ্ঞানী বার্গারন ফাইন্ডিসেন ‘বরফের স্ফটিক কণার উপস্থিতিতে অতীব ঠান্ডা পানির কণা জমে যায় এবং শেষ পর্যন্ত বৃষ্টি হয়ে নামে’—এ ধারণার ওপর ভিত্তি করে একটি তত্ত্ব উপস্থাপন করেন। এই তত্ত্ব বাস্তবে রূপদান করেন জেনারেল ইলেকট্রিক কোম্পানির গবেষক ভিনসেন্ট শিফার। তিনি ১৯৪৬ সালের জুলাইয়ে কৃত্রিম বৃষ্টিপাতের মূলনীতি আবিষ্কার করেন। পরে নোবেল বিজয়ী বিজ্ঞানী আরভিং ল্যাংমুরের সঙ্গে যৌথভাবে কৃত্রিম বৃষ্টি সৃষ্টির কৌশল নিয়ে গবেষণা করেন এবং বর্তমান ক্লাউড সিডিং প্রযুক্তির উদ্ভাবন করেন।

ক্লাউড সিডিং প্রযুক্তিতে অতিসাধারণ রাসায়নিক পদার্থসমূহ যেমন—শুষ্ক বরফ, কঠিন কার্বন ডাই-অক্সাইড, সিলভার আয়োডাইড, পটাশিয়াম আয়োডাইড ইত্যাদি ব্যবহার করা হয়। এছাড়া তরল প্রোপেন গ্যাসও ব্যবহার করা হয় এই প্রযুক্তিতে। এই গ্যাস সিলভার আয়োডাইডের চেয়ে অধিক তাপমাত্রায় বরফের স্ফটিক তৈরি করতে সক্ষম। এতে মেঘের দ্রুত ঘনীভবন হয় এবং তা পতনশীল অবস্থায় পৌঁছায়। তবে অনেক সস্তা ও বেশ কার্যকর প্রমাণিত হওয়ায় এই প্রযুক্তিতে এখন সোডিয়াম ক্লোরাইড বা খাওয়ার লবণের ব্যবহার বৃদ্ধি পেয়েছে। ক্লাউড সিডিংয়ের সময় মেঘের ভেতরের তাপমাত্রা  ৭ ডিগ্রি থেকে ২০ ডিগ্রি সেলসিয়াসে নেমে আসে। সে সময় তুষারপাতের আশঙ্কা তৈরি হয়। আর তাই এ রকম পরিস্থিতি থেকে পরিত্রাণ পেতে ব্যবহার করা হয় সিলভার আয়োডাইডের মতো রাসায়নিক পদার্থ।

উড়োজাহাজ অথবা রকেটের মাধ্যমে মেঘের চারপাশে ছড়িয়ে দেওয়া হয় ক্লাউড সিডিংয়ের উপাদানগুলো। মেঘের ওপর দিয়ে যখন উড়োজাহাজটি অগ্রসর হয়, তখন সিলভার আয়োডাইডও ছড়িয়ে দেওয়া হয়। এই রাসায়নিকের ক্ষুদ্র স্ফটিক দানাগুলোই মূলত মেঘের সিড হিসেবে কাজ করে। অর্থাত্, এসব দানায় ভাসমান জলীয়বাষ্পে পানির কণাগুলো জড়ো হয়ে বড় ফোঁটায় পরিণত হয়। এর জন্য প্রথমে মেঘ সৃষ্টি করতে হয়। দ্বিতীয় পর্যায়ে এই মেঘকে ঘনীভূত করে বৃষ্টিপাতের উপযোগী অবস্থায় নিয়ে আসতে হয়। ঘনীভূত মেঘ একসময় ওজন বেড়ে গিয়ে মহাকর্ষের টানে বৃষ্টি হয়ে ঝরে পড়ে। তবে সচরাচর আকাশে ভাসমান মেঘকেই পানির ফোঁটায় পরিণত করে কৃত্রিম বৃষ্টিপাত ঘটানো হয়।

কৃত্রিম বৃষ্টিপাত প্রযুক্তি ব্যবহার করে ভারী বর্ষণ, বন্যা, ঘূর্ণিঝড় ও হারিকেনের মতো প্রাকৃতিক দুর্যোগ মোকাবিলার প্রয়াসও বেশ ফলপ্রসূ। সম্প্রতি এই প্রযুক্তি ব্যবহারের মাধ্যমে ইন্দোনেশিয়ান সরকার সে দেশের ঘূর্ণিঝড় পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে সফলতা দেখিয়েছে। এছাড়া ২০০৮ সালে বেইজিং অলিম্পিক শুরুর দিন বেইজিং এলাকায় ভারী বর্ষণের আবাস দেয় চীনের আবহাওয়া অধিদপ্তর। এ সময় অলিম্পিক এলাকায় মেঘ প্রবেশের আগেই ক্লাউড সিডিংয়ের মাধ্যমে বৃষ্টি ঝরিয়েছিল চীন, যাতে পুরো আয়োজক কমিটির মধ্যে ফিরে এসেছিল স্বস্তির নিঃশ্বাস। ভারতও ইতিমধ্যে ক্লাউড সিডিং প্রযুক্তি নিয়ে পরীক্ষা-নিরীক্ষা শুরু করেছে।

শুধু প্রাকৃতিক দুর্যোগ মোকাবিলা করাই নয়, বরং বৃষ্টি বর্ষণের এই প্রযুক্তি কাজে লাগিয়ে কোনো নির্দিষ্ট এলাকার বার্ষিক গড় বৃষ্টিপাত ১০ থেকে ২০ শতাংশ বাড়ানো সম্ভব। বৃষ্টিহীন ও খরাপ্রবণ এলাকায় ফসল উত্পাদনে এই প্রযুক্তি বেশ কার্যকর। চীন, ইন্দোনেশিয়া, ইসরাইল, সংযুক্ত আরব আমিরাত, যুক্তরাজ্য, যুক্তরাষ্ট্র, কানাডা, ফ্রান্স, স্পেন, রাশিয়া, জার্মানি, অস্ট্রেলিয়া, সেনেগালসহ বেশ কয়েকটি দেশ ক্লাউড সিডিং প্রযুক্তি ব্যবহার করে অধিক পরিমাণে ফসল ফলাতে সক্ষমতা দেখিয়েছে। বৈশ্বিক উষ্ণায়ন বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে ভূপৃষ্ঠের তাপমাত্রাও বাড়ছে সমানুপাতে। আর তাই মরুকরণ রোধে বিশ্বের অন্যান্য দেশও এই প্রযুক্তির দিকে হাত বাড়াবে। ফলাফল হিসেবে গরমের দেশ ও দুর্যোগপূর্ণ আবহাওয়ার দেশগুলোর কাছেও ক্লাউড সিডিং প্রযুক্তির ব্যবহার ছাড়া অন্য কোনো বিকল্প পদ্ধতি থাকবে না!

বিজ্ঞানী নিউটনের ভাষায়, প্রতিটি ক্রিয়ারই একটি সমান ও বিপরীত প্রতিক্রিয়া আছে। তাই এক জায়গায় কৃত্রিম বৃষ্টিপাত করা হলে অন্য জায়গায় এর প্রভাব পড়বেই। অর্থাত্, অন্য এলাকায় সৃষ্টি হবে বৃষ্টির তীব্র অভাব। তা ছাড়া সিলভার আয়োডাইডের মাত্রাতিরিক্ত ব্যবহার দূষিত করবে মাটির গুণগত মান। সেই সঙ্গে পৃাণিকুল, উদ্ভিদকুলও হবে ক্ষতিগ্রস্ত। সে কারণে খুবই সাবধানে অভিজ্ঞ বিজ্ঞানীদের দ্বারা এই প্রযুক্তির কর্মযজ্ঞ চালাতে হবে। আধুনিক বিজ্ঞানের এই আশীর্বাদের উত্তম ব্যবহার নিশ্চিতকল্পে সংশ্লিষ্টদের একযোগে কাজ করতে হবে।

n লেখক : শিক্ষার্থী, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়