বলপয়েন্টে আঁকা বঙ্গবন্ধু

আপডেট : ১২ আগস্ট ২০২১, ২০:১৬

মনটা খারাপ করে বসে আছে টুপুন। কাল জাতীয় শোক দিবস। জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের শাহাদত বরণের দিন। এ উপলক্ষে টুপুনদের ইশকুলে ছবি আঁকার প্রতিযোগিতা হবে। হেডস্যার সবাইকে বঙ্গবন্ধুর ছবি এঁকে নিয়ে যেতে বলেছেন। কিন্তু কীভাবে আঁকবে টুপুন? ওর তো রংতুলি নেই। রংপেনসিলও নেই। বাবাকে রংপেনসিল কিনে আনতে বলেছিল। কিন্তু আনেননি। হয়তো মনে নেই। মনে থাকলেও হয়তো বা টাকা ছিল না। হয়তো পরে কখনো আনবেন।

খুব কষ্টে দিন চলে টুপুনদের। বাবা রহমত মিয়া গ্রাম থেকে সবজি ক্রয় করে এনে হাটে-বাজারে বিক্রি করেন। এ থেকে যা কিছু আয় হয়, তা-ই দিয়ে টেনেটুনে সংসার চলে। ক্লাস ফাইভে পড়া টুপুন বাবার কষ্ট একটু হলেও বোঝে। এজন্য রংপেনসিলের কথাটা খুব জোর দিয়ে বলতে পারেনি। যদি বাবাটার মন খারাপ হয়ে যায়।

সময়মতো রংপেনসিল পাওয়া সম্ভব নয়। এটা বুঝে গেছে টুপুন। কারণ, বাবা হাটে গেছেন। ফিরতে ফিরতে অনেক রাত হবে। তখন ঘুমিয়ে পড়বে ও। বাবা রংপেনসিল নিয়ে এলেও ছবি আঁকার সময় পাওয়া যাবে না। কেননা, ইশকুলে যেতে হবে খুব সকালে।

ছবি যে আঁকতেই হবে টুপুনের। হেডস্যারের ভয়ে নয়, টুপুন জানে, বঙ্গবন্ধু আমাদের জাতির জনক। তাঁর কারণেই আমরা স্বাধীন বাংলাদেশ পেয়েছি। তাঁর মতো মহান মানুষ আর একজনও জন্ম হয়নি এদেশে। এত বড়ো মানুষ, এত শ্রদ্ধেয় মানুষ, তাঁর জন্য কিছুই করবে না টুপুন? তা কেমন করে হয়? যে যেখান থেকে, যেভাবে পারে, সেভাবেই স্বাধীনতার মহানায়ককে স্মরণ করা দরকার। শ্রদ্ধা জানানো দরকার। টুপুন ছবি আঁকতে পারে। ও মুজিবের ছবি এঁকে মুজিবকে শ্রদ্ধা জানাতে চায়। সেই সুযোগও এসেছে। কিন্তু টুপুন এখন কী করবে, ভেবে পায় না। খালি কান্না পায় ওর।

একসময় কলমদানির দিকে চোখ গেল টুপুনের। কয়েকটা বলপয়েন্ট আছে ওখানে। লিখে পরখ করে দেখল, মাত্র একটাতে কালি আছে। ভাবল, এই বলপয়েন্ট দিয়েই বঙ্গবন্ধুর ছবি আঁকব। কিন্তু তার আগে বঙ্গবন্ধুর মুখটা ভালো করে দেখে নেওয়া দরকার। টুপুন বই খুলে বঙ্গবন্ধুকে দেখে নিল। ওর মনে পড়ল আরো সুন্দর একটা ছবির কথা। ওদের বাড়ি থেকে একটু দূর দিয়ে ইটের যে রাস্তাটা চলে গেছে, সেই রাস্তার মোড়ে একটা দোকানঘর। সেই দোকানঘরের দেয়ালে শোক দিবসের পোস্টার লাগানো আছে। পোস্টারে রঙিন একটা ছবি আছে বঙ্গবন্ধুর। একদৌড়ে সেখানে চলে গেল টুপুন। অনেকক্ষণ ভরে দেখল ছবিটা।

বাড়ি এসে ঘরের মেঝেতে বসে ছবি আঁকা শুরু করল টুপুন। টুপুনের মা রাবেয়া বললেন, দুপুরের পর থাইকা তোরে কেমন জানি চুপচাপ মনে হইতাছে। কোথায় য্যানো দৌড়াইয়া গেলি, আবার ফিরা আইসা চুপচাপ বইসা বইসা কী করতাছস মা?

টুপুন বলল, বঙ্গবন্ধুর ছবি আঁকতাছি মা। কাল ইশকুলে নিয়া যাইতে হইব।

রাবেয়া হেসে বললেন, কয় কী আমার টুপুনে! অনেক খুশির কথা! তিনি মেলা বড়ো মানুষ আছিলেন। সুন্দর কইরা আঁইকো মা।

ঘণ্টাখানেক পর রাবেয়া ঘরে গিয়ে দেখলেন, মেঝেতে ঘুমিয়ে আছে টুপুন। পাশেই বঙ্গবন্ধুর ছবি আঁকা খাতার পাতা আর বলপয়েন্ট পড়ে আছে। ছবিটা খুব সুন্দর লাগল রাবেয়ার। তিনি ছবিটা টেবিলে রেখে টুপুনকে খাটে শুইয়ে দিলেন।

আজ আর ফিরতে দেরি করেননি রহমত মিয়া। বেলা ডোবার আগেই মালপত্র গুছিয়ে হাট থেকে চলে এসেছেন। মেয়ের জন্য রংপেনসিলও নিয়ে এসেছেন সাথে। ততক্ষণে ঘুম থেকে জেগে উঠেছে টুপুন। রহমত মিয়া টুপুনকে বলল, এই দেখো মা, রংপেনসিল এনেছি তোমার জন্য!

রংপেনসিলের প্যাকেট হাতে নিয়ে টুপুন বলল, আমার তো ছবি আঁকা হয়ে গেছে বাবা। পাশে দাঁড়ানো রাবেয়া হেসে বললেন, তোমার মাইয়ার আবার রংপেনসিল লাগে? কলম দিয়াই কী সুন্দর একখান ছবি আঁইকা ফালাইছে!

—কই, দেখি, দেখি! রহমত মিয়ার যেন বিলম্ব সইছে না।

রাবেয়া টেবিলের ওপর থেকে ছবির খাতাটা এনে রহমত মিয়ার হাতে দিলেন। খাতা খুলে ছবি দেখে ভীষণ অবাক হলেন তিনি। বলপয়েন্ট দিয়ে এত সুন্দর করে ছবি আঁকা যায়, তার জানাই ছিল না। তাও আবার জাতির জনকের ছবি। আনন্দে আপ্লুত হয়ে বললেন, তুই কি বঙ্গবন্ধুরে এতই ভালোবাসছ মা? ভালো না বাসলে কি এত সুন্দর কইরা তাঁর ছবি আঁকা যায়? আমি কইয়া দিলাম, দেখিস, কাল এই ছবিটাই সেরা হইব।

প্রতিযোগিতায় ছবিটা সেরা হোক বা না হোক, বাবা-মায়ের খুশিতে টুপুনও খুশি হলো খুব। রুপার মতো ঝকমকে দাঁত বের করে হাসল। বিন্তু হঠাত্ করেই টুপুনের মুখটা কেমন ফ্যাকাশে হয়ে গেল। জলে ভরে গেল দু চোখ। কাঁদোকাঁদো গলায় বলল, এই সুন্দর মানুষটারে যারা মাইরা ফালাইছে, তারা কেমন মানুষ, বাবা?

রহমত ও রাবেয়া কোনো কথা বলতে পারলেন না। নির্বাক হয়ে টুপুনের আঁকা বঙ্গবন্ধুর ছবির দিকে তাকিয়ে রইলেন।

 

অলংকরণ :

সায়মা আহাদ খান

অষ্টম শ্রেণি

মনসিজ আর্ট একাডেমি