গৃহসন্ন্যাসী কবি, থাকুন সৃজনের অমিয় বর্ষণে

আপডেট : ১২ আগস্ট ২০২১, ২০:৩৭

সেই কবে ছোট থাকতে পড়েছিলাম—

‘কবির কী আছে আর

ভালোবাসা ছাড়া,

সমস্ত উজাড় করে

হাতে একতারা!’

তখন মহাদেব সাহার কাব্যসমগ্র পড়ছি একটানা। পড়তে পড়তে এই চার লাইনে চোখ আটকে গিয়েছিল। এত সহজ কিন্তু কী প্রাণবন্ত কথাগুলো! পড়ামাত্রই ভেতর থেকে নাড়া খেয়েছিলাম। কবিকে কেমন হতে হয় এই সহজ চার লাইনের পদ্যে কবি বলে দিয়েছেন। মোদ্দাকথায় কবিমাত্রই ভোগী নন, যোগী। যারা ভোগী তাঁরা কবি হতে পারেন কি না, জানা নেই। কিন্তু কবিতার জীবন সে ফুলশয্যারও নয়, তবে কি সংগ্রামের, একাকীত্বের? কায়িকের চেয়ে চিন্তার সংগ্রাম বা একাকীত্বই এখানে অবশ্য মুখ্য। আর কে না জানে কবি মাত্রই সংবেদনশীল। তাই সমস্ত ছাড়ার সমূহ ঝুঁকি তো কবির বেলাতে থেকেই যায়! বাংলা কবিতার মূল স্রোতটি যত্নে-পরিচর্যায় যাঁর হাতে হয়ে উঠেছে শস্যময় ভূমি, সহজ-সুন্দর ও একইসাথে তাত্পর্যবাহী তিনি ষাটের দশকের অন্যতম পুরোধা কবি মহাদেব সাহা। ফুলের স্নিগ্ধ সৌরভে প্রাণচঞ্চল মৌমাছির অনুরাগের গাথামালা হয়ে ওঠে তাঁর লেখা একের পর এক স্তবক। গীতলধর্মিতা তাঁর কবিতার অন্যতম বৈশিষ্ট্য হলেও তিনি শব্দকে করে তোলেন সেলুলয়েডের ফিতের মতো জীবন্ত ও দৃশ্যগ্রাহ্য। এই দৃশ্যগ্রাহ্যতা যেন কবিতারই আরেক আশ্চর্য স্বনির্মিত ভূগোল। সন্ধ্যার আলো-ছায়ার মতো রহস্যঘেরা আর সৌন্দর্যকাতরতায় ভরা। হতাশাগ্রস্ত তরুণ বা সৌন্দর্যকাতর কবি বা পাঠকের এক নিবিড় পরিচর্যাকেন্দ্র হয়ে ওঠে এই নিঃসঙ্গ পূজারীর ভূগোল। ‘নিঃসঙ্গ পূজারী’ এই জন্য—নিঃসঙ্গ পূজারীর মতোই এই কবি কবিতার অন্তঃপ্রবেশের মূলে থাকেন নৈবেদ্য সাজিয়ে। ভেতর থেকে আহ্বান নিয়ে জাগায় পাঠতৃষ্ণা তাঁর নৈঃশব্দ্যমথিত কবিতা। বাংলার হাওয়া-মাটির গন্ধেই এই ভূগোলের কবিতাগুলো চিনতে হয়। কবিতার গায়ে গায়ে লেপ্টে থাকে আবহমানকালের ধ্বনি-সুর-তান। কবির হিরন্ময় অভিজ্ঞতায় নির্মল নিষ্কলুষতাকে শিকার করা এসব কবিতার ভবিষ্যত্ বাংলা কবিতার পাঠকের সঙ্গেই জুড়ে আছে। উইলিয়াম ব্লেকের একটি বিখ্যাত কবিতা ‘দ্য সিক রোজ’-এর কথা মনে পড়ছে। একটি গোলাপ অসুস্থ হওয়ার খবর বিষণ্ন করে তুলছে কবিচিত্ত। কবি দেখতে পাচ্ছেন রাতের হাহাকার। যার সারমর্ম হলো তীব্র অভিজ্ঞতাই নির্মল নিষ্কলুষতাকে শিকার করে। উইলিয়াম ব্লেকের দ্য সিক রোজ কবিতাটি যে মায়া আর ব্যথার ভাষায় উচ্চারিত মহাদেব সাহার কবিতায়ও এই মায়া আর ব্যথা ছুঁয়ে ছুঁয়ে থাকে। এদিকে কোথায় যেন উইরিয়াম ব্লেকের সঙ্গে তাঁর মিলও খুঁজে পাই—

‘অসুস্থতা আমার নির্জন শিল্প, আমি তাকে দুঃখভরা নকশীকাঁথার মতো

আমার শরীরে করেছি সেলাই,

বড়োই যাতনাময় তবু তার নিবিড় সান্নিধ্যে থেকে আমি

বুঝেছি কেমন এই প্রবাহিত তোমাদের জীবন

চারধারে, কেমন অসুস্থতা

তার মাঝে ক্রমাগত অন্তঃসারশূন্যতার কী গভীর ধস ও ফাটল

অসুস্থতা আমার নির্জন শিল্প তার কাছ থেকেই তো আমি

প্রথম শিখেছি তোমার মুখের সাথে গোলাপের কোথায় অমিল’

[অসুস্থতা আমার নির্জন শিল্প]

অসুস্থতা আমার নির্জন শিল্প থেকে তিনি আবার চলে যান ‘জুঁইফুলের চেয়ে শাদা ভাতই অধিক সুন্দর’-এর দিকে—

‘যেকোনো বিষয় নিয়েই হয়তো এই কবিতাটি লেখা যেতো

পিকনিক, মর্নিংস্কুলের মিসট্রেস

কিংবা স্বর্ণচাপার কাহিনী, হয়তো পাখির প্রসঙ্গ

গত কয়েকদিন ধরে টেলিফোনে তোমার কথা না শুনতে

পেয়ে জমে থাকা মেঘ,

মন ভালো নেই তাই নিয়েও ভরে উঠতে পারতো এই

পঙিতগুলো

অর্কিড কিংবা উইপিঙ উইলোও হয়ে উঠতে পারতো

স্বচ্ছন্দে এই কবিতার বিষয়;

কিন্তু তৃতীয় বিশ্বের দরিদ্রতম দেশের একজন কবির

মনু মিয়ার হাঁড়ির খবর ভুললে চলে না,

আমি তাই চোয়াল ভাঙা হারু শেখের দিকে তাকিয়ে

আন্তর্জাতিক শোষণের কথা ভাবি,

পেটে খিদে এখন বুঝি কবিতার জন্য কী অপরিহার্য

জুঁইফুলের চেয়ে কবিতার বিষয় হিসেবে আমার কাছে

তাই

শাদা ভাতই অধিক জীবন্ত...

...  ...  ...  ...  ...  ... ... ... ...

 

তাই এই কবিতার অক্ষরগুলো লাল, সঙ্গত কারণেই লাল

আর কোনো রঙ তার হতেই পারে না

অন্য কোনো বিষয়ও নয়

তাই আর কতোবার বলবো জুঁ্ইফুলের চেয়ে শাদা ভাতই অধিক সুন্দর’

[জুঁইফুলের চেয়ে শাদা ভাতই অধিক সুন্দর]

কবিতাটি পড়ার সঙ্গে সঙ্গে পুঁজিবাদী ভোগবিলাসী জীবনের উল্টো দিকে প্রবাহিত ক্ষুধার্ত জীবনের গভীর সত্যটি উদ্ঘাটিত হয়ে ওঠে চোখের সামনে। সৌন্দর্য সচেতন কবি ক্ষুধাকেও শিল্পেরই নিরীখে পাঠকের দরবারে হাজির করেন এভাবে। কবিতার কাজ কী? সে তো ক্ষুধা নিবারণ করে না। কিন্তু  চিত্তের ক্ষুধাকে যদি মৌলিক হিসেবে ধরি, তবে সেই ক্ষুধাকে নিবৃত্ত করতেই তো শিল্প বা কবিতার সৃষ্টি। পাঠক যখন তার নিজের কথাগুলোই প্রকাশিত হতে দেখে—তখন সে আর ভেবে দেখে না এটা কার দ্বারা লিখিত হলো। তাকে নির্বিচারে গ্রহণ করতেই মন তার অবচেতনেই তাকে প্রস্তুত করে তোলে। মহাদেব সাহা নামটি উহ্য রেখে যদি পাঠককে তাঁর কোনো কবিতা পড়তে দেওয়া হয়, সেক্ষেত্রে পাঠক খুঁজবে কবিতার সঙ্গে তার সেতুবন্ধনটি রচিত হলো কি না! কারণ মনের কথামালাসূত্রেই একজন কবি পাঠকের আত্মীয় হয়ে ওঠেন। মহাদেব সাহা ষাটের দশক থেকে এ পর্যন্ত কবিতা লিখে এরকম কবিতার অনেক আত্মীয় তৈরি করেছেন। শুধু রাজধানী বা শহরের ভেতর আটকে না থেকে বাংলা কবিতাকে পৌঁছাতে পেরেছেন মফস্বল কি প্রান্তিক পর্যায়ে। এখানে পাঠকপ্রিয়তাকে সন্দেহের চোখে দেখবার কিছু নেই। কারণ কিছু কিছু পাঠকপ্রিয়তা সন্দেহাতীত। প্রথম কবিতাগ্রন্থ ‘এই গৃহ, এই সন্ন্যাস’ (১৯৭২) প্রকাশের মধ্য দিয়ে মহাদেব সাহা বাংলা কবিতার জগতে তাঁর আগমনকে জোরালোভাবে জানান দিতে সক্ষম হয়েছিলেন। তারপর একে একে বের হয় তাঁর অনেকগুলো কবিতাগ্রন্থ, প্রতিটি কবিতাগ্রন্থের জন্য দিয়েছেন চমকপ্রদ সব নাম। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো—মানব এসেছি কাছে (১৯৭৩), চাই বিষ অমরতা (১৯৭৫), কী সুন্দর অন্ধ (১৯৭৮), তোমার পায়ের শব্দ (১৯৮২), লাজুক লিরিক (১৯৮৪), মানুষ বড় ক্রন্দন জানে না (১৯৮৯), অন্ধের আঙুলে এত জাদু (২০০৯)। কবিতাগ্রন্থের পাশাপাশি কিছু গদ্যগ্রন্থও তিনি লিখেছেন। গরিমাহীন গদ্য (২০০৯), আনন্দের মৃত্যু নেই (২০১১), ভাবনার ভিন্নতা (২০১১) ইত্যাদি।

সাংবাদিকতা থেকে অবসর নিয়ে পুরোপুরি গৃহসন্ন্যাসীর জীবনযাপন করছেন এখন মহাদেব সাহা। কবিতায় এখনো পুরোদমে সক্রিয়। ক্রমশ লিখে চলেছেন জীবনের সব রূপ-রস-গন্ধকে এক করে। এই লেখা না থামুক, স্রোতস্বিনী হয়ে মিলাক গভীর অনুভূতির সমুদ্রে। ৫ আগস্ট, ১৯৪৪ কবির জন্মতিথি। তাঁকে প্রণতি জানাই।

 

মহাদেব সাহা

৫ আগস্ট ১৯৪৪

স্কেচ : সোহেল আশরাফ