আশির দশকের বিশিষ্ট কথাশিল্পী মিলা মাহফুজা। গল্পকার হিসেবে তিনি সুপরিচিত বটে, তবে উপন্যাস, শিশুসাহিত্য, অনুবাদ, নিবন্ধ রচনায় রয়েছে উল্লেখযোগ্য অবদান। সম্প্রতি প্রকাশিত তাঁর মুক্তিযুদ্ধভিত্তিক গল্পের গুরুত্বপূর্ণ গ্রন্থটির বিষয়ে যিকঞ্চিত আলোচনা।
গ্রন্থের প্রথম গল্প ‘না পুরুষ’ পড়তে গিয়ে খানিকক্ষণ চুপচাপ ভাবতে হয়। আনিস, মূল চরিত্রের জটিল মনঃস্তাত্ত্বিক টানাপোড়েন, অন্যরকম অন্ধকারে আলোর প্রক্ষেপণ। আনিসকে বাধ্য করতে চেয়েছিল পাক ক্যাপ্টেন তার উপস্থিতিতে বাঙালি নারীর সম্ভ্রম বিনাশ করতে। রাজি না হওয়ায় চরম নির্যাতনের শিকার হয়েছে আনিস। জীবনের পড়ন্ত বেলায় রোকেয়া এসেছে সংসারে। ‘কিন্তু তারপরেও আধো আঁধারে রোকেয়ার মদির আহ্বানে সহসাই ফিরে আসে সেই অসহায় কিশোরী, বিকৃতরুচি ক্যাপ্টেন, ফিরে আসে পুরনো সেই গ্লানি, সেই ব্যর্থতার লজ্জা।’ গল্পটি পাঠককে নিয়ে যাবে যুদ্ধের আরো এক অন্ধকার কোণে।
দ্বিতীয় গল্প ‘কাপুরুষ’। মা জাহানারা আর বাবা রেজানুলের ছায়া দাম্পত্য আর পুত্র মঈন পুত্রবধূ নাহিদের নড়বড়ে ভালোবাসার গল্প। উত্তরা থেকে ফেরার পথে ঘটনাচক্রে মঈনের প্রাইভেট কারটি বিকল হয়। একপর্যায়ে নাহিদ ধর্ষিতা হয়ে হাসপাতালে ভর্তি হয়। মা বারবার মঈনকে অনুরোধ করেন নাহিদকে দেখতে যেতে। পুত্র অনড়, ‘ও নোংরা হয়ে গেছে। ওকে স্পর্শ করার কথা ভাবতেও ঘেন্না লাগছে। আমি এ কদিন ধরে ওর মৃত্যু কামনা করছি, মা। ও মরল না কেন?’ মরলেন জাহানারা, রেজানুল হূদয়ের এক অবরুদ্ধ কপাট খুলে বসলেন। জাহানারা একাত্তরে সম্ভ্রম হারানো নারী। কিন্তু কোনোদিন তা প্রকাশের সাহস করেননি। রেজানুল জানতেন। তিনি সাহস জোগাননি তাঁকে। শোকার্ত পুত্রকে বললেন, ‘আমি একটা কাপুরুষ। আমার সন্তান তুমিও কাপুরুষ!’
আরো একটি চমত্কার গল্প ‘রসা ফয়েজ’। গল্পে এক হতদরিদ্র কৃষকের অন্তর্জ্বালা বয়ে বেড়ানোর কথা বিবৃত হয়েছে।
‘লজ্জা’ গল্পে মেঘনা আর জাবীন দুই নারী চরিত্রের কথোপকথনে মূলত আখ্যান পল্লবিত।
লেখক মিলা মাহফুজার লেখার বৈশিষ্ট্য সহজ অথচ বেগবান স্রোতের বিস্তার। ভাষাভঙ্গি সহজ সাবলীল। পাঠককে যা আনন্দ দেয়। মনোযোগ বাড়িয়ে তোলে। তিনি জোছনার বর্ণনা করেন এভাবে—‘বরফের উপর যখন জ্যোস্না গলে গলে পড়ে সে অপরূপ রূপের কোনো বর্ণনা হয় না। আমিও যেন সেই সফেদ সৌন্দর্যের অংশ হয়ে বিলীন হয়ে যেতাম। ওমর একদিন ভয় পেয়েছিল। ওর নাকি মনে হয়েছিল জ্যোত্স্নার আলো আমার শরীর টুকরো টুকরো করে বরফের মাঝে লুকিয়ে ফেলেছে। কী অদ্ভুত ভাবনা বলো তো?’
‘ঠিকানা বত্রিশ নম্বর’ এ গ্রন্থের শেষ গল্পটি।
বিদেশের পার্কে ওক গাছের পাতাঝরার গান দিয়ে শুরু। ভাগ্যহত দুই নারীর মর্মবেদনা যেন একই সুরে বাঁধা। শীতের দেশ কানাডায় তাদের পরিচয়। ডিভোর্সি জিনিয়া দুই বছরের পুত্রের হাত ধরে কানাডায় পাড়ি জমিয়েছে। সারাহ মাইকেল ওয়ার্ড ও এলিসা ওয়ার্ডের দত্তক কন্যা।
কীথের সাথে চমত্কার কাটছিল জীবন। কিন্তু মা-বাবার মৃত্যুর পর জানতে পারে সে যুদ্ধশিশু। কীথ মুখ ঘুরিয়ে নেয়। ওদিকে জিনিয়ার মা বীরাঙ্গনা বিধায় তারও সংসার ভেঙেছে। সারাহ বাংলাদেশে এসে হন্যে হয়ে খুঁজছে তার জননীকে। বাংলার হাজার হাজার বীরাঙ্গনার ঠিকানা-ঠিকুজির নথি একসময় পুড়িয়ে ফেলে ছাইভস্ম ভাসিয়ে দেওয়া হয় বুড়িগঙ্গায়। বিফল সারাহ তাই শেষপর্যন্ত সান্ত্বনা খোঁজে—‘চলো, জিনি একবার বুড়িগঙ্গা দেখে যাই।’
মিলা মাহফুজা মূলত গল্পকার। তাঁর ভাষাভঙ্গি মেদহীন, বেগবান, সহজ। উপমা, রূপকল্প ইত্যাদির ব্যবহারে মনোযোগী। শব্দচয়নে অভিজ্ঞ। মুক্তিযুদ্ধের রক্তাক্ত জখম ভিন্ন অনুসন্ধানে পরস্ফুিট হয়েছে এই গ্রন্থে। নতুন প্রজন্মের এই বইটি অবশ্যপাঠ্য।
বইটির চমত্কার প্রচ্ছদ এঁকেছেন ধ্রুব এষ। প্রকাশকাল জানুয়ারি ২০২১। দাম ১৬০ টাকা। প্রকাশক : ঝুমঝুমি প্রকাশন।
