সমস্যার উেসর দিকে নজর দিতে হইবে

আপডেট : ১২ আগস্ট ২০২১, ২১:২৪

পুলিশ ছাড়া আধুনিক সমাজে সুস্থ-সুন্দরভাবে ও শান্তিতে বসবাসের কথা চিন্তাই করা যায় না। কিন্তু কোনো পুলিশ সদস্য যখন রক্ষক হইয়া ভক্ষকের ভূমিকায় অবতীর্ণ হন, তখন তাহা সমাজের জন্য ভয়ংকর ক্ষতির কারণ হইয়া দাঁড়ায়। বাংলাদেশে অনেক দিন ধরিয়াই এই বাহিনীর কিছু সদস্যের অপকর্মে লিপ্ত হইবার কথা শুনা যায়। সত্যিকার অর্থে, ঢাকাসহ সারা দেশের থানা ও ইউনিটগুলিতে কঠোর নজরদারি সত্ত্বেও পুলিশের অপরাধমূলক কর্মকাণ্ড তাত্পর্যপূর্ণ মাত্রায় নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব হইতেছে না। কিন্তু কেন? পুলিশের নীতিনির্ধারকগণও বলিয়াছেন—বর্তমানে যেই কয়েকটি চ্যালেঞ্জ লইয়া তাহারা কাজ করিতেছেন তাহার মধ্যে একটি হইল—বাহিনীর সদস্যদের অপরাধ-অনিয়ম ও দুর্নীতি হইতে দূরে রাখা। ইহার পাশাপাশি মাদক-সংশ্লিষ্টতা হইতে পুলিশকে মুক্ত করাটাও বড় চ্যালেঞ্জ। কারণ মাদকের দুষ্টচক্রে রহিয়াছে কাঁচা টাকার স্রোত। এই লোভের ফাঁদে অনেক পুলিশ সদস্যই পা রাখিতে দ্বিধা করেন না। এখন এই দুষ্টচক্র হইতে পুলিশকে দূরে রাখিতে অপকর্মে জড়াইয়া পড়া সদস্যদের ‘দৃষ্টান্তমূলক’ শাস্তি নিশ্চিত করিবার উপর জোর দিয়াছেন অনেকে। কারণ, অপকর্ম করিয়া শাস্তি পাইলে বাহিনীর অন্য সদস্যদের মধ্যে একটি কঠোর বার্তা যায়। ইহার গুরুত্ব অপরিসীম।

আমরা স্বস্তির সহিত লক্ষ করিয়াছি, বর্তমানে কোনো পুলিশ সদস্যের বিরুদ্ধে অপকর্মের অভিযোগ পাওয়া গেলে তাহার তদন্ত হইতেছে। তবে বদলি, প্রত্যাহার বা সাময়িক বরখাস্তের মতো ব্যবস্থাও নেওয়া হইলেও দুঃখজনকভাবে পুলিশের অপরাধ অনেক ক্ষেত্রেই হ্রাস পাইতেছে না। প্রায় সোয়া দুই লক্ষ সদস্য লইয়া পুলিশ বাহিনী গঠিত। ইহার মধ্যে প্রতি বত্সর গড়ে ২৫ হাজার পুলিশ সদস্যের বিরুদ্ধে বিভিন্ন অভিযোগ আসে। তদন্ত শেষে অভিযোগ প্রমাণিত হইলে শাস্তিমূলক ব্যবস্থাও নেওয়া হয়। সম্প্রতি স্বামীর নির্যাতনের শিকার হইয়া সরকারি জরুরি সেবা ৯৯৯ নম্বরে ফোন করিয়াছিলেন রাজশাহী নগরীর এক গৃহবধূ। কিন্তু বিচারপ্রার্থী গৃহবধূকে উলটা যৌন নির্যাতন করিয়াছেন পুলিশের দায়িত্বপ্রাপ্ত এক কর্মকর্তা। এই ঘটনায় অভিযুক্ত সহকারী উপ-পরিদর্শককে প্রত্যাহার করা হইয়াছে। ফেনীতে বুধবার স্বর্ণ ডাকাতির মামলার আসামি ফেনী ডিবির পরিদর্শকসহ ছয় কর্মকর্তাকে রিমান্ডে নেওয়া হইয়াছে। ইত্তেফাকে প্রকাশিত একটি প্রতিবেদন হইতে জানা গিয়াছে, নানা অপরাধে প্রতি বত্সর গড়ে প্রায় ২ হাজার পুলিশ সদস্যের চাকরি যাইতেছে। চাঁদাবাজি, মাদক ব্যবসা, ধর্ষণ ও ধর্ষণচেষ্টা, অপহরণ, খুন, ছিনতাই, নির্যাতন, ভয় দেখাইয়া অর্থ আদায়, মিথ্যা মামলায় ফাঁসিয়ে দেওয়া, যৌন হয়রানিসহ বিভিন্ন অপরাধে জড়াইয়া পড়িবার অভিযোগ প্রমাণিত হওয়ায় পুলিশ সদস্যদের চাকরিচ্যুত করা হইতেছে। অনেককে নানা লঘুদণ্ড দেওয়া হইতেছে।

পূর্বে যেমন মনে করা হইত কোনো পুলিশ সদস্যকে তাহার অপরাধের জন্য সাজা দিলে বাহিনীর বদনাম হইবে, বাহিনীর মনোবলে আঘাত আসিতে পারে। বড় ধরনের অপরাধেও যখন ছোট সাজা দেওয়া হইত, তখন আশা করা হইত ঐ ব্যক্তি ইহাতে সংশোধিত হইবেন। কিন্তু প্রকৃতপক্ষে সংশোধিত হইতেছে না। ইহা তাত্পর্যপূর্ণ যে, অপরাধ করিলে পুলিশ সদস্যকে অতিরিক্ত বেনিফিটও দেওয়া হয় না। এখন মাদক লইয়া কোনো পুলিশ সদস্য ধরা পড়িলে নিয়মিত মামলায় তাহাকেও আসামি করা হইতেছে। কিন্তু প্রশ্ন হইল, পূর্বের তুলনায় এখন পুলিশ সদস্যদের অপরাধের শাস্তি অধিক হারে দেওয়া হইলেও অপরাধের প্রবণতা কেন দূর হইতেছে না? এই ক্ষেত্রে অনেকেই মনে করেন, পুলিশের কোনো সাধারণ স্তরের সদস্য অর্থ বিনিয়োগ করিয়া বাহিনীতে ঢুকিলে সেই টাকা তোলার জন্য একটা মনস্তাত্ত্বিক চাপ তাহার মধ্যে থাকে। অনেকে প্রশিক্ষণকালে নৈতিক শিক্ষার দিকে আরো জোর দেওয়ার কথা বলিয়া থাকেন। তবে নৈতিকতার পাঠ নিয়োগ-প্রশিক্ষণ-কর্মজীবন সকল ক্ষেত্রেই থাকিতে হইবে। রোগীর চিকিত্সার ওপর জোর দিতে হইবে বটে, তবে তাহার চাইতে অধিক জোর দিতে হইবে রোগটির উেসর দিকে।