বিচার বিভাগ রাষ্ট্রের তিনটি স্তম্ভের মধ্যে একটি অন্যতম স্তম্ভ। আদালত কখনোই চলতে পারে না আইনজীবী ছাড়া। আদালত পরিচালনা করেন বিচারকগণ, আর আইনজীবীরা হচ্ছেন আদালতের আইন কর্মকর্তা। সে কারণেই আদালতের বিচারক এবং আদালতের আইন কর্মকর্তারা একে অপরের পরিপূরক। যেমন, একটি কাঁচির দুটি ফালির মধ্যে একটি ফালি না থাকলে অপর ফালিটি যত ধারালোই হোক না কেন, সেটি দিয়ে কোনো কাপড় কাটা তো দূরের কথা, একটি কাগজও কাটা সম্ভব হবে না। ঠিক তেমনি আদালত ও বিচারব্যবস্থায় আইনজীবী ছাড়া কোনো অবস্থাতেই আদালত ও বিচার কার্যক্রম পরিচালনা করা সম্ভব নয়।
একজন বিচারক তার চাকরিকালীন রাষ্ট্রের কাছ থেকে কী কী সুযোগ ও সুবিধা পান তা অনেকের অজানা নয়। অবসরের পর তারা পেনশন পান এমনকি তার মৃত্যুর পরও তার উত্তরাধিকারী রাষ্ট্রের কাছ থেকে এই সুবিধা পেতেই থাকেন। কিন্তু ঐ আদালতের একজন আইন কর্মকর্তা অর্থাত্ অ্যাডভোকেট রাষ্ট্রের কাছ থেকে কী কী সুযোগ পাচ্ছেন এবং সমস্ত কর্মময় জীবন শেষে অসুস্থ ও অকর্মণ্য থাকাবস্থায় এবং তার মৃত্যুর পরে তিনি ও তার বিধবা স্ত্রী কী কী সুবিধা পান, সেটা কি কেউ জানেন?
বিচারকরা যেসব সুযোগ ও সুবিধা পাচ্ছেন এবং পাবেন তাতে আমাদের কোনো হিংসা বা ক্ষোভ নেই। আমরা চাই ন্যায়বিচারের স্বার্থে বিচারকগণ আরো বেশি সুযোগসুবিধা লাভ করুন। কিন্তু বিচারক এবং বিচারব্যবস্থায় যারা পরিপূরক তারা রাষ্ট্রের কাছ থেকে কী পাচ্ছেন এবং তাদের মৃত্যুর পর তাদের উত্তরাধিকারীরা কী পাবেন—এটা কি রাষ্ট্রের দেখার, বোঝার ও করার কিছুই নেই? একজন আইনজীবী ৪০ বছর বা আরো অধিককাল ওকালতি করার পর বাংলাদেশ বার কাউন্সিলে তার জমানো প্রভিডেন্ট ফান্ডের অর্থ কবে পাবেন—সেটা জনগণ শুনলে না হেসে অথবা আশ্চর্য না হয়ে পারবেন না। কেননা, এটির পরিমাণ একজন চতুর্থ শ্রেণির সরকারি কর্মচারীর এক-চতুর্থাংশেরও কম। বিচারকদের কথা বাদই দিলাম। একজন চতুর্থ শ্রেণির সরকারি কর্মচারী অবসরে গেলে তিনি পাবেন—পেনশন, গ্র্যাচুয়েটি, প্রভিডেন্ট ফান্ড, বেনাভোলেন্ট ফান্ড, গ্রুপ ইনসিওরেন্সসহ আরো অনেক সুবিধা—যা সর্বসাকুল্যে ৩০ লাখ টাকা ছাড়িয়ে যাবে। তারপর তো পেনশনের হিসাবটা তার অতিরিক্ত। অর্থাত্ তিনি যত দিন বেঁচে থাকবেন তত দিন তিনি তো পেনশন পাবেনই, তার মৃত্যুর পর তার স্ত্রী যত দিন বেঁচে থাকবেন তত দিন তিনি পেতেই থাকবেন। কিন্তু কোর্ট অফিসার অর্থাত্ একজন অ্যাডভোকেট তার সারা জীবনের জমানো প্রভিডেন্ট ফান্ডের কত টাকা এককালীন পান? প্রভিডেন্ট ফান্ডের অর্থ তার স্বামী উত্তোলন করে নিলে তার মৃত্যুর পর তার স্ত্রী আর একটি টাকাও পান না।
অথচ রাষ্ট্র পরিচালনার অনেক কর্ণধাররাই অ্যাডভোকেট। বর্তমান রাষ্ট্রপতি, আইনমন্ত্রীসহ এক ডজনের বেশি মন্ত্রী এবং জাতীয় সংসদের অর্ধশতাধিক সংসদ সদস্য অ্যাডভোকেট। তারা কিন্তু অ্যাডভোকেটদের বার্ধক্য ও মৃত্যুর পর তাদের পরিবারের কথা কখনোই ভাবেন না। আজ পর্যন্ত মহান জাতীয় সংসদে অ্যাডভোকেটদের পক্ষে এই প্রস্তাব উত্থাপিত হতে শোনা যায়নি। কেন শোনা যায়নি? এ প্রশ্নের উত্তরটা খুবই সহজ। যারা এই প্রশ্ন উত্থাপন করার কথা, তাদের উত্তরসূরিদের ভূতভবিষ্যত্ নিয়ে চিন্তার যেন কোনো কারণ নেই। কেননা, আলাদিনের চেরাগের মতো এই পদগুলো এমনই পদ, এসব পদে একটিবারের জন্য অধিষ্ঠিত থাকতে পারলে তার কয়েক প্রজন্ম সারা জীবন শুয়ে-বসে চরম সুখে ও অনাবিল শান্তিতে জীবন যাপন করতে আর কোনো চিন্তাই করতে হয় না। সে কারণেই তাদের চিন্তা ও চেতনায় কখনোই দেশের শতকরা ৯৫ ভাগ অ্যাডভোকেটদের কথা ভাবার সময় তাদের নেই বললেই চলে। অবশ্য এসব পদে দু-একজন ব্যতিক্রম নেতা তো আছেনই।
বাংলাদেশ বার কাউন্সিল পরিচালনা করেন নির্বাচিত অ্যাডভোকেটরাই। যারা অনেক অর্থশালী তারাই এসব পদে সম্মান কুড়ানোর জন্য প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেন এবং লাখো টাকা থেকে কোটি টাকা খরচও করে থাকেন। তারা আর্থিকভাবে অনেক স্বাবলম্বী ও সচ্ছল হওয়ায় কারণেই অ্যাডভোকেটদের আর্থিক বিষয়টি কখনোই তারা ভাবেন না। কেননা, তারা মোটেও অসচ্ছল নন। সে কারণে এ ব্যাপারে তাদের ভাবার বা করার যেন কিছুই নেই।
সেনাবাহিনী ও পুলিশ বাহিনীসহ অনেক সরকারি দপ্তরের কর্মচারী, কর্মকর্তা এবং তাদের পরিবারের সদস্যদের চিকিত্সা ও বিভিন্ন অনুষ্ঠানের জন্য কতই না সুযোগ-সুবিধা রয়েছে! কিন্তু বিজ্ঞ আইনজীবীদের চিকিত্সাসেবা বা অন্য কোনো সেবা পাওয়ার কোনো ব্যবস্থা কি আছে? এসবের জন্য আজ পর্যন্ত কোনো আইনজীবীদের প্রতিনিধি বা রাষ্ট্র কখনো কি কিছু ভেবেছেন, বলেছেন বা করেছেন?
আইনজীবীগণ দেশের গুরুত্বপূর্ণ নাগরিক। অনেকে মনে করতে পারেন, অ্যাডভোকেটদের ভূতভবিষ্যত্, চিকিত্সা, মৃত্যুর পর স্ত্রী ও সন্তানসন্ততির কী হবে, এসব কথা ভেবে কী লাভ? কেননা, অ্যাডভোকেটরা বিজ্ঞ আইনজীবী, তাদের শরীরে তো নবাব এবং লর্ডদের কালো গাউন শোভা পাচ্ছে। তাই তাদের ও পরিবারবর্গের জন্য কোনো কিছুরই প্রয়োজন হয় না। হায়, অ্যাডভোকেট প্রতিনিধিদের চাওয়া-পাওয়া! হায়, রাষ্ট্রীয় বিচারব্যবস্থায় অ্যাডভোকেটদের ভবিষ্যত্! এই করোনাকালে তাদের দুর্গতি যে কোনো সময়ের চেয়ে যে বেড়েছে, তাতে কোনো সন্দেহ নেই।
n লেখক :বীর মুক্তিযোদ্ধা, বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্টের অ্যাডভোকেট এবং ওয়ার্ল্ড পিস অ্যান্ড হিউম্যান রাইটস সোসাইটির চেয়ারম্যান।
