অর্থনীতিতে রূপালী আলোর ঝিলিক এনেছে ইলিশ

আপডেট : ১৩ আগস্ট ২০২১, ১৯:৪৭

রেজাউল করিম খোকন

 

সাগরে ধরা পড়ছে প্রচুর রূপালী ইলিশ মাছ। এতে করে উপকূলের হাজার হাজার জেলে ও মত্স্যজীবীদের মুখে ফুটে উঠেছে হাসি। প্রতিদিন শত শত নৌকা সাগর থেকে হাজার হাজার রূপালী ইলিশ নিয়ে মত্স্য অবতরণ কেন্দ্রে আসছে। গত কয়েক দিনে কক্সবাজার মত্স্য অবতরণ কেন্দ্রে গিয়ে এই অবস্থাই দেখা গেছে। গত ২৩ জুলাই সাগরে ৬৫ দিন মাছ ধরার নিষেধাজ্ঞা শেষ হয়েছে। ইলিশসহ অন্যান্য সামুদ্রিক মাছের প্রজননকাল হওয়ায় বঙ্গোপসাগর ও সংশ্লিষ্ট নদীর মোহনায় এ নিষেধাজ্ঞা দেওয়া হয়েছিল। এই সময়ে দেশের সামুদ্রিক জলসীমায় সব ধরনের মাছ ধরা, পরিবহন ও সংরক্ষণ নিষিদ্ধ করে প্রজ্ঞাপন জারি করে মত্স্য ও প্রাণিসম্পদ মন্ত্রণালয়। কিন্তু নিষেধাজ্ঞা শেষ হলেও লঘুচাপে সাগর উত্তাল থাকায় জেলেরা মাছ ধরতে যেতে পারেনি। পরবর্তী সময়ে সাগর শান্ত হলেও লকডাউনের কারণে তাদের সাগর থেকে আহরিত মাছ কম দামে বিক্রি করতে হয়েছে। বাজারে এখন ইলিশ মাছের বেশ ছড়াছড়ি লক্ষ্য করা যাচ্ছে। ইলিশ মাছের দাম এখনো  সাধারণ  মানুষের নাগালের মধ্যে আসেনি। তবে আগামী কয়েক দিনের মধ্যে সরবরাহ বাড়লে দাম কমবে তেমন আশায় আছেন সবাই। জেলেদের মতে, ৬৫ দিন নিষেধাজ্ঞা শেষে সাগরে মাছের প্রজনন বেড়েছে এবং আকার বড় হয়েছে। এখন তারা বেশি মাছ পাচ্ছে। এতে করে লকডাউন এবং নিষেধাজ্ঞার ক্ষতি পুষিয়ে উঠতে পারবে বলে তারা আশা করছেন। এদিকে লকডাউন উঠে যাওয়ায় মত্স্যজীবীরা খুশি। তারা আশা করছেন কষ্টের বিনিময়ে সাগর থেকে আহরিত মাছের যথাযথ মূল্য পাবেন।

ইলিশ গবেষক ও মত্স্যসম্পদ সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা বলছেন, এবার নিষেধাজ্ঞা খুব ভালোমতো পালন করা হয়েছে। গবেষকেরা দেখেছেন, নদীর যেসব স্থানে ইলিশের বিচরণ ও প্রজনন ক্ষেত্র, সেখানে পানির গুণগত মান আগের চেয়ে ভালো। এসব স্থানে এসে ইলিশ স্বস্তি পাবে। পানির মান ভালো হওয়ার জন্য এখানে মিলবে ইলিশের জন্য পর্যাপ্ত খাবার। তাতে ইলিশের স্বাদ বাড়বে, বাড়তে পারে সংখ্যাও। পানিতে ইলিশের জন্য এ সুখবর পাওয়া গেছে মত্স্য গবেষণা ইনস্টিটিউট, নদী কেন্দ্র চাঁদপুরের পানির মান পরীক্ষায়। করোনাকালের পর থেকে ইলিশের এসব বিচরণ ক্ষেত্রে পানির গুণগত মান বেড়েছে। গত বছর থেকেই উন্নতি দেখা গিয়েছিল। এবার তা আরো বেড়েছে। এ বছর এবং আগের বছর করোনার কারণে বিভিন্ন সময় নৌযান চলাচলের নিষেধাজ্ঞা নদীর পানির মান বাড়াতে সহায়তা করেছে।

বাংলাদেশে বিগত বছরগুলোয় ইলিশের উত্পাদন বেড়েছে। ২০১৭-১৮ অর্থবছরে উত্পাদিত ইলিশ ছিল ৫ দশমিক ১৭ লাখ মেট্রিক টন। পরের বছর হয় ৫ লাখ ৩৩ হাজার মেট্রিক টন। সর্বশেষ ২০১৯-২০ অর্থবছরে এর পরিমাণ ছিল সাড়ে ৫ লাখ মেট্রিক টন। পানির মান ভালো হলে শুধু যে উত্পাদন বাড়ে, তাই না, বাড়ে এর প্রজনন সফলতা। ইলিশের ডিম ছাড়ার হারকে বলে প্রজনন সফলতা। গত বছর প্রজনন সফলতা ৫১ শতাংশ ছিল। আগের বছর এটি ছিল প্রায় ৪৯ শতাংশ। এবার এ হার আরো বাড়বে বলেই ধারণা সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের। অক্টোবর মাসে প্রজনন মৌসুমে এ সফলতার হার দেখা হয়। তবে পানির মানের সঙ্গে মাছের খাবার বৃদ্ধি পেয়েছে কি না, তা একটি বড় বিচার্য বিষয়। পানির মান দেখার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা বলেছেন, পানির মানের পাশাপাশি ইলিশের বিচরণ ক্ষেত্রগুলোয় খাবারও বেড়েছে।

নানা পদক্ষেপের কারণে ইলিশের হারানো ঐতিহ্য ফিরে পেতে যাচ্ছে বাংলাদেশ। আশা করা যায়               আগামী বছর উত্পাদন ৬ লাখ টন ছাড়িয়ে যাবে। পদ্মা, মেঘনা, যমুনা ও বঙ্গোপসাগরে ২০০৯-১০ অর্থবছরে  ইলিশ ধরা পড়েছিল ২ লাখ টন। এরপর ইলিশ সংরক্ষণে নানা পদক্ষেপ নেওয়ায় ইলিশ উত্পাদন প্রায় তিন গুণ বেড়েছে।

বিশ্বে বিভিন্ন দেশের ইলিশের নতুন বাজার তৈরির সম্ভাবনাও দেখা দিয়েছে। ইলিশ উত্পাদনে নতুন রেকর্ড তো বটেই, বাংলাদেশ হতে যাচ্ছে আধুনিক উত্পাদন পদ্ধতি অনুসরণকারী অন্যতম দেশও। কেননা ইলিশ পাওয়া যায় বিশ্বের এমন ১১টি দেশের মধ্যে ১০টিতেই যেখানে ইলিশের উত্পাদন কমছে, সেখানে একমাত্র বাংলাদেশেরই ইলিশের উত্পাদন প্রতি বছর ৮-১০ শতাংশ হারে বাড়ছে। ইতিমধ্যেই দেশে ইলিশের উত্পাদন বাড়ার কৌশল অনুসরণ করতে শুরু করেছে ভারত ও মিয়ানমার। আর কৌশল বুঝতে বাংলাদেশের মত্স্য গবেষণা ইনস্টিটিউটের সঙ্গে যোগাযোগ শুরু করেছে  কুয়েত ও  বাহরাইন। ফলে শুধু রসনাবিলাসই নয়, রূপালী ইলিশ হতে যাচ্ছে দেশের অর্থনীতির অন্যতম মাধ্যমও।

দেশে মোট দেশজ উত্পাদনে (জিডিপি) ইলিশের অবদান ১ দশমিক ৫ শতাংশ। দেশের মোট মাছের ১২ শতাংশের উত্পাদন আসে ইলিশ থেকে, যার অর্থমূল্য আনুমানিক সাড়ে ১০ হাজার কোটি টাকা। উত্পাদিত ইলিশের যেটুকু রপ্তানি হয় তাতে ১৫০ থেকে ৩০০ কোটি টাকার বৈদেশিক মুদ্রা অর্জিত হয়। প্রায় ৫ লাখ লোক ইলিশ আহরণে সরাসরি নিয়োজিত এবং ৩০-৩৫ লাখ লোক পরিবহন, বিক্রয়, জাল ও নৌকা তৈরি, বরফ উত্পাদন, প্রক্রিয়াজাতকরণ, রপ্তানি ইত্যাদি কাজে প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে জড়িত। তবে ইলিশ নিয়ে নতুন করে শঙ্কা দেখা দিয়েছে। দেশে ইলিশের উত্পাদন বাড়লেও আগামী ১০ বছর পর এ ধারা অব্যাহত থাকবে না। জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে বাংলাদেশের ইলিশ মিয়ানমারের দিকে চলে যেতে পারে। এ কারণেই ইলিশ মাছের বংশ বৃদ্ধি, উত্পাদন ও সংরক্ষণে গ্রহণ করা হয়েছে ত্রিদেশীয় উদ্যোগ। বাংলাদেশ, ভারত এবং মিয়ানমার এ লক্ষ্যে পরস্পরের সঙ্গে সহযোগিতার অঙ্গীকার করেছে। ইলিশ উত্পাদন অব্যাহত রাখতে দেশের ইলিশ মাছ বিশেষজ্ঞরা সরকারকে বেশকিছু পরামর্শ দিয়েছেন। এখনো দেশে ইলিশের মাইগ্রেশন পথ, অর্থাত্ আসা-যাওয়ার পথ চিহ্নিত করা যায়নি। এ নিয়ে কোনো গবেষণাও নেই। ফলে কখন ইলিশ আসে, কখন যায়, কোন পথ দিয়ে যায়, তা জানা না গেলে জাটকা নিধন ও মা-ইলিশ ধরা বন্ধ করা যাবে না। সুতরাং সঠিক গবেষণা প্রয়োজন।