আম খেতে ভীষণ ভালোবাসি। অথচ সেই আম নিয়ে এখন হরে-কৃষ্ণ হরে-রাম অবস্থা। আমার স্ত্রী মৌলি কিছুতেই আমাকে আম খেতে দেবে না। তার লজিকটা অবশ্য গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু আমি নাছোড়বান্দা। ছোটবেলার অভ্যাস, বদলাতেও কষ্ট লাগে। তাই মনমরা হয়ে ডাইনিংয়ে বসে থাকি। আমার ছেলেমেয়ে দাঁত বের করে আম খায়। মৌলি নিজেও কামড়িয়ে খায়। তিনজনের কামড়ানো দেখে আমার দাঁত কামড়ায়। ঠোঁটের কোণায় লালা জমে। মেয়েটি বলে, দাও না আম্মু একটা আম। আব্বু কেমন করে তাকিয়ে আছে—।
মৌলি ধমক দিয়ে বলে, চুপ থাক? জেনেশুনে তোর আব্বুকে তো আর বিষ দিতে পারি না—।
আম কি বিষ হলো? কঠিন প্রশ্ন। কিন্তু মৌলিকে প্রশ্নটা করার সাহস নেই। আমি মনে করি, জাতীয় ফল কাঁঠাল না হয়ে আম হলে ভালো হতো। আমের স্থান হওয়া দরকার ছিল ইলিশ আর শাপলার পাশে। আমার কাঁচুমাচু ভাব অথবা লোভী-লোভী মুখ দেখে মৌলির একটু মায়া হয়। সে খুব দয়াপরবশ হয়ে একটা আমের পিঠ কেটে টুকরোটা আমার দিকে বাড়িয়ে দেয়। আমি দৃষ্টি বাড়িয়ে দিই প্লেটে রাখা বাড়তি অংশটুকুর দিকে। ওটা আছে আঁটিসমেত। আঁটি চেটে খাওয়ার মজাই আলাদা। টুকরোটি নিয়ে দুই কামড়ে শেষ করি। তখন ছেলেটি বলে, বাকিটাও দাও না আম্মু। দেখছ না, আব্বুর মুখের জিওগ্রাফি—।
খুব তো জিওগ্রাফি শিখে জ্ঞান দিচ্ছিস। একবার মেডিক্যাল সাইন্সটা ভেবে দেখ। বিফোর মিল তার ডায়াবেটিস মেপে থার্টিন পয়েন্ট সিক্স পেয়েছি।
আমি সাহস করে বলি, একগ্লাস উচ্ছের রস খেয়ে নেব।
তুমি চুপ থাকো? কোনো কিছু কন্ট্রোল করবে না, একটু হাঁটাচলা করবে না, আবার লম্বা লম্বা কথা।
মৌলির সঙ্গে তর্কে যেতে চাই নে। আবার মনের রাগ মনে পুষেও রাখি না। পরদিন অফিসে গিয়ে পিয়ন রনজুকে দিয়ে রাজভোগ কিনে আনাই। দুটো রাজভোগ একসঙ্গে চালান করে দিই পেটের মধ্যে। দেখি শালার ডায়াবেটিস কোথায় থাকে। এবার আম খাওয়ার ক্ষেত্রে আমার মনটারও লকডাউন অবস্থা। তবু রাজশাহী-চাঁপাইনবাবগঞ্জ যেন আমাকে ডাকে, তুই এসে আম খেয়ে যা। ল্যাংড়া, হিমসাগর, আম্রপালি যেন বুকের মধ্যে খচরমচর করে।
একদিন অফিসে বসে মিষ্টি খাচ্ছি। মৌলি এসে হাজির। স্বভাববশত সে হুটহাট করে অফিসে চলে আসে। সন্দেহ বাতিকটা এখনো রয়ে গেছে। কবে একবার এক অফিস সহকারী মেয়ের সুনজরে নাকি কুনজরে পড়ে গিয়েছিলাম, সেই থেকে সন্দেহটা। এখন আবার অফিস এক্সিকিউটিভ সোভিকা রিমঝিমের সঙ্গে জড়িয়ে পড়েছি কি না, চেক করতে আসে। মৌলির দিকে হা করে তাকিয়ে থাকি। মুখে মিষ্টি, গিলে ফেলব নাকি বাইরে আনব বুঝতে পারি না। দ্রুত কলিং বেল টিপি। রনজু ঢুকতেই মিষ্টি গিলতে গিলতে বললাম, আমার উচ্ছের রস কই?
রনজু আমতা আমতা করে। চোখ-টিপ মারাও বোঝে না। ও বলল, স্যার আপনি তো কিছু কন নাই।
কেন, তুই জানিস না আমি মিষ্টি খাওয়ার পর উচ্ছের রস খাই? শিগগির যা, উচ্ছে নিয়ে আয়।
যাকে দেখে এত ভয়, সেই মৌলি আজ আমাকে বড় আশ্চর্য করে দিল। সপ্তমাশ্চার্যের চেয়েও বেশি কিছু। সে আমার জন্য এক গামলা আম কেটে দিয়েছে। যত পারো খাও। আমের সিজন চলে গেছে। শক্ত শক্ত একরকম আম, আশ্বিনীও হতে পারে। দেখেই বোঝা যাচ্ছে স্বাদ হবে না। ছেলেমেয়ে একটু মুখে দিয়ে রেখে দিয়েছে। মৌলি নরম সুরে বলল, আমি জানি আম তোমার খুব পছন্দ। টক আমও তোমার পছন্দ।
আমি তার কথা বুঝে উঠতে পারি না। ফ্যালফ্যাল করে তাকিয়ে থাকি। সে তার কথার জের টেনে বলে যায়, আম সত্যিই পছন্দের জিনিস। শুধু সুস্বাদু নয়, আম সত্যিকার অর্থে অক্সিজেন। ব্যাপারটা বুঝিয়ে দিচ্ছি। আমাদের মাননীয় প্রধানমন্ত্রী মোদী সাহেব আর মমতা দিদিকে ভালোবেসে আম পাঠিয়েছিলেন। আমরা উপহার পেয়েছি লিকুইড অক্সিজেন। এটা আমাদের দেশের জন্য বড় গৌরবের ব্যাপার। যদিও উপহারের ক্ষেত্রে কোনো বিনিময় চলে না।
আমি মৌলির দিকে অবাক হয়ে তাকিয়ে থাকি। সে শুধু আমাকে আর আমার আম খাওয়া নিয়েই ভাবে না, দেশ নিয়েও ভাবে।
