ট্রান্সফ্যাট নামক নীরব ঘাতকের হানা

আপডেট : ১৩ আগস্ট ২০২১, ২১:৩২

কিছু খাদ্য আমাদের স্বাস্থ্যের জন্য এতটাই ক্ষতিকর যে উহাদের এককথায় নীরব ঘাতক বলা যায়। এই নীরব ঘাতকদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য হইল ট্রান্সফ্যাট জাতীয় খাবার। এই ট্রান্সফ্যাট স্বাস্থ্যের জন্য এতটাই ক্ষতিকর যে, সম্প্রতি একটি গবেষণায় দেখা গিয়াছে, আমাদের দেশে প্রতি পাঁচ জন তরুণের মধ্যে একজন হূদেরাগ-ঝুঁকির মধ্যে রহিয়াছেন খাদ্যে উচ্চমাত্রার শিল্পোত্পাদিত ট্রান্সফ্যাটের কারণে। উল্লেখ করা যাইতে পারে, ডালডা বা বনস্পতি ঘি এবং ইহা দিয়া তৈরি বিভিন্ন খাবার, ফাস্টফুড ও বেকারি পণ্যে বিপুল পরিমাণে ট্রান্সফ্যাট থাকে। ইহা ছাড়াও ভাজাপোড়া খাবার তৈরিতে একই তেল বারংবার ব্যবহার করিলে ট্রান্সফ্যাট তৈরি হয়, যাহা হূদেরাগ ও হূদেরাগজনিত অকালমৃত্যুর ঝুঁকি বাড়াইয়া দেয়। ন্যাশনাল হার্ট ফাউন্ডেশন হসপিটাল অ্যান্ড রিসার্চ ইনস্টিটিউটের গবেষকগণ ঢাকার ডালডা নমুনার ৯২ শতাংশে ডব্লিউএইচও সুপারিশকৃত ২ শতাংশ মাত্রার চাইতে বেশি ট্রান্সফ্যাট পাইয়াছে।

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা ২০২৩ সালের মধ্যে বিশ্বের খাদ্য সরবরাহ শৃঙ্খল হইতে ট্রান্সফ্যাট নির্মূলের লক্ষ্য নির্ধারণ করিয়াছে। কিন্তু এই ব্যাপারে আমরা যে সম্পূর্ণই অসচেতন তাহা বুঝিতে বিশেষ সমীক্ষার প্রয়োজন পড়ে না। ইতিমধ্যে মেডিক্যাল পরিসংখ্যানে বাংলাদেশে তরুণদের মধ্যে হূদেরাগে আক্রান্ত হইবার উচ্চ প্রবণতা লক্ষ করা গিয়াছে। মানুষের শরীর অত্যন্ত সংবেদনশীল। খাবার হইল শরীরের জ্বালানি। সুতরাং সেই জ্বালানিতে যদি সমস্যা থাকে, তাহা হইলে মানুষের শরীর নামক ইঞ্জিনে সমস্যা দেখা দিবেই। ইতিমধ্যে জানা গিয়াছে, খাদ্যে ট্রান্সফ্যাটজনিত হূদেরাগে মৃত্যুর পরিসংখ্যান অনুযায়ী সর্বাধিক ঝুঁকিপূর্ণ ১৫টি দেশের মধ্যে বাংলাদেশ উল্লেখযোগ্য। ঝুঁকিপূর্ণ দেশগুলিতে প্রতি বত্সর এই সংক্রান্ত রোগে মারা যায় ৫ লক্ষাধিক মানুষ। তাত্পর্যপূর্ণ ব্যাপার হইল, বাংলাদেশে ‘নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষ’ রহিয়াছে, কিন্তু তাহারা এই সকল ব্যাপারে জনগণকে সচেতন করিতে কতখানি সদর্থক ভূমিকা রাখিতেছেন—তাহা আতশকাচ দিয়া খুঁজিতে হইবে। অথচ ট্রান্সফ্যাটজনিত সমস্যা রোধে তাহাদেরই দায়িত্ব লইবার কথা। ট্রান্সফ্যাটের ব্যাপারে তরুণ জনগোষ্ঠীর মধ্যে বিশেষ সচেতনতার বিকল্প নাই। তাহাদের জানিতে হইবে ট্রান্সফ্যাট আসলে কী? সংক্ষেপে ট্রান্সফ্যাট হইল ক্ষতিকর চর্বিজাতীয় খাবার। ইহা রক্তের ‘ভালো’ কোলেস্টেরলের মাত্রা কমাইয়া দেয় এবং ‘খারাপ’ কোলেস্টেরেলের মাত্রা বাড়াইয়া দেয়। মনে রাখিতে হইবে, রক্তে যেই সকল কোলেস্টেরল থাকে, সেইগুলির মধ্যে দুই ধরনের কোলেস্টেরল খুব গুরুত্বপূর্ণ। কম ঘনত্বের কোলেস্টেরলের বা এলডিএল, যাহা ‘খারাপ’ কোলেস্টেরল হিসেবে গণ্য। এই ধরনের কোলেস্টেরল হূিপণ্ডের রক্তনালির দেওয়ালে চর্বি জমাট বাঁধিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে এবং রক্তনালিগুলি সরু হইয়া রক্ত চলাচলে বাধাগ্রস্ত করে। ইহাতে হূদেরাগের ঝুঁকি বাড়িয়া যায়। অন্যদিকে, উচ্চ ঘনত্বের কোলেস্টেরলের বা এইচডিএল, যাহা ‘ভালো’ কোলেস্টেরল হিসাবে বিবেচিত, ইহা রক্তের ‘খারাপ’ কোলেস্টেরলকে রক্ত হইতে যকৃতে লইয়া যায় এবং রক্তনালির দেওয়ালে চর্বি জমিতে দেয় না।

তাত্পর্যপূর্ণ ব্যাপার হইল, ইতিমধ্যে ছয়টি দেশ খাদ্যে ট্রান্সফ্যাট নিষিদ্ধ করিয়াছে এবং ইউরোপীয় ইউনিয়নসহ আরো ২৫টি দেশ একই সিদ্ধান্ত লইয়াছে। এমনকি পার্শ্ববর্তী দেশ ভারতের ফুড সেফটি অ্যান্ড স্ট্যান্ডার্ড অথরিটি অব ইন্ডিয়া আরো ১২ বত্সর পূর্বেই আংশিকভাবে হাইড্রোজেনেটেড তেলে ট্রান্সফ্যাটের সর্বোচ্চ সীমা ১০ শতাংশ নির্ধারণ করিয়া দিয়াছিল। পরবর্তী সময়ে ছয় বত্সর পূর্বে ইহা কমাইয়া ৫ শতাংশে লইয়া আসা হয়। অন্যদিকে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা এই মাত্রা নির্ধারিত করিয়া দিয়াছে ২ শতাংশে। কিন্তু আমরাও এখনো পূর্বের তিমিরেই রহিয়া গিয়াছি। যেহেতু বাংলাদেশে বর্তমান জনগোষ্ঠীর প্রায় অর্ধেকই তরুণ, সেই জন্য দেশে তরুণদের অকালমৃত্যুর হাত হইতে বাঁচাইতে হইলে ট্রান্সফ্যাটের ব্যাপারে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে কঠোর অবস্থান গ্রহণ করিতেই হইবে।