মনুষ্য জাতির ইতিহাসে কুষ্ঠ হচ্ছে অতি প্রাচীন একটি রোগ। কুষ্ঠ জন্মগত বা বংশগত কোনো রোগ নয় এবং কোনো পাপের ফলে এই রোগ হয় না। মাইকোব্যাকটেরিয়াম লেপ্রি নামক এক প্রকার জীবাণু দ্বারা কুষ্ঠ রোগ হয়। কুষ্ঠ একটি মৃদু সংক্রামক ও দীর্ঘমেয়াদি রোগ, কিন্তু ছোঁয়াচে নয়। আরোগ্য লাভের জন্য কুষ্ঠরোগীকে ছয় থেকে ১২ মাস চিকিত্সা নিতে হয়। নরওয়ের চিকিত্সাবিজ্ঞানী ডা. আর্মার হ্যানসেন প্রথম ১৮৭৩ সালে কুষ্ঠরোগের জীবাণু আবিষ্কার করেন এবং প্রমাণ করেন যে, অতি ক্ষুদ্র একটি ব্যাকটেরিয়া এই রোগের জন্য দায়ী। কুষ্ঠ নিয়ে কর্মরত প্রতিষ্ঠান ‘দ্য লেপ্রসি মিশন ইন্টারন্যাশনাল-বাংলাদেশ (টিএলএমআই-বি)’-এর তথ্যমতে, আমাদের দেশে সাম্প্রতিক সময়ে প্রতি বছর প্রায় ৩ হাজার ৫০০ কুষ্ঠরোগী শনাক্ত হচ্ছে এবং এর মধ্যে প্রায় ৪০০ রোগী সময়মতো ও সঠিক চিকিত্সার অভাবে প্রতিবন্ধী হয়ে যাচ্ছে।
আক্রান্ত ব্যক্তিরা প্রতিবন্ধিতাসহ নানান সামাজিক বৈষম্য, অপবাদ ও কুসংস্কারের শিকার হচ্ছেন। আমাদের উচিত, তাদের চিকিত্সা থেকে শুরু করে আর্থসামাজিকভাবে নিজ পরিবারে ও সমাজে পুনর্বাসিত করার জন্য বিভিন্ন কর্মসূচি হাতে নেওয়া। প্রতিবন্ধিতাই হচ্ছে কুষ্ঠরোগের প্রধান ও মূল সমস্যা। কুষ্ঠরোগে সাধারণত হাত, পা ও চোখের স্নায়ুসমূহ ক্ষতিগ্রস্ত হয়, যার ফলে এগুলির অনুভূতি ও মাংসপেশির কার্যক্ষমতা নষ্ট হয় এবং স্বাভাবিক গঠনের বিকৃতি ঘটে ও বাইরের যে কোনো আঘাত বা ঘর্ষণের ফলে ফোসকা পড়ে পরবর্তী সময়ে অঙ্গগুলি নষ্ট হয়।
কুষ্ঠ সম্বন্ধে সমাজে প্রচলিত ভ্রান্ত ধারণা, কুসংস্কার ও কুষ্ঠ আক্রান্ত ব্যক্তিদের প্রতি সমাজের নানা বৈষম্যমূলক আচরণের ফলে ব্যক্তিজীবন, পারিবারিক জীবন এমনকি সামাজিক জীবনেও নানা বিপত্তির সৃষ্টি হয়। কুষ্ঠরোগীদের প্রতি যুগ যুগ ধরে বৈষম্যমূলক আচরণ ও তাদেরকে সমাজচ্যুত, পরিবারচ্যুত করার মতো ঘটনা অহরহ ঘটে আসছে। যার ফলে অনেক কুষ্ঠ আক্রান্ত ব্যক্তিই সমাজের ভয়ে কুষ্ঠরোগ লুকিয়ে রাখতে বাধ্য হন এবং পরিণামে অকাল প্রতিবন্ধিতার সম্মুখীন হন।
রোগ নিয়ন্ত্রণের পাশাপাশি কুষ্ঠ সম্পর্কে সামাজিক সচেতনতা সৃষ্টিও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এই রোগ নির্মূল করা জরুরি, কিন্তু এই বিষয়ে প্রধান বাধা হচ্ছে এর জন্য স্বল্প বাজেট। কারণ কুষ্ঠ ইস্যুটি নীতিনির্ধারকদের কাছে এখনো গুরুত্ব পায়নি বিধায় কুষ্ঠ নির্মূল কর্মসূচির জন্য প্রয়োজনের তুলনায় অনেক কম আর্থিক বরাদ্দ রাখা হয় বলে জানা গেছে। বিগত পাঁচ বছরের ইতিহাসে জাতীয় বাজেটে এমনই চিত্র ফুটে উঠেছে।
সংশ্লিষ্ট সূত্রমতে, কুষ্ঠ নির্মূল কাজের জন্য আলাদা কোনো বাজেট হয় না। স্বাস্থ্য খাতের বাজেট থেকে যক্ষ্মা ও কুষ্ঠর জন্য সম্মিলিতভাবে একটি আর্থিক বরাদ্দ রাখা হয়, সেখান থেকে কুষ্ঠর জন্য একটি অংশ আসে। দেখা গেছে, বিগত পাঁচ বছর বার্ষিক কুষ্ঠ নির্মূল কর্মসূচিতে সারা দেশের একটি জাতীয় কার্যক্রম পরিচালনায় মাত্র গড়ে ৪৫ লাখ থেকে ৫০ লাখ টাকা বরাদ্দ হয়ে আসছে। একটি দেশের জাতীয় কর্মসূচি পরিচালনার জন্য এই অর্থ খুবই অপ্রতুল বলে জানা গেছে।
প্রাথমিক অবস্থায় রোগী শনাক্তকরণ; কুষ্ঠবিষয়ক দক্ষতা বৃদ্ধি ও এই রোগের জটিলতা ব্যবস্থাপনার উদ্যোগ নেওয়া; স্বাস্থ্যকর্মীদের কুষ্ঠের ওপর প্রশিক্ষণ; দেশের সর্বত্র নিরবচ্ছিন্ন এমডিটি সরবরাহ নিশ্চিত করা; কর্মসূচির মূল্যায়ন; ঘনবসতিপূর্ণ এলাকায় বসবাসরত মানুষের মধ্যে বিশেষভাবে সচেতনতা ও জরিপ কার্যক্রম পরিচালনা করা; কুষ্ঠ নির্মূল কর্মসূচিকে সাধারণ স্বাস্থ্যসেবার সঙ্গে একীভূতকরণ এবং পারস্পরিক আস্থা ও শ্রদ্ধার ভিত্তিতে বিভিন্ন বেসরকারি প্রতিষ্ঠানকে কুষ্ঠ নির্মূল কর্মসূচিতে সম্পৃক্তকরণ করা প্রভৃতি বিষয়গুলো কুষ্ঠ নির্মূল কাজের অংশ। এগুলো সম্পাদনের জন্য জাতীয় বাজেটে প্রয়োজনীয় অর্থ বরাদ্দ থাকা উচিত বলে সংশ্লিষ্টরা মনে করেন। বাজেটে জেলাভিত্তিক অর্থ বরাদ্দ থাকা দরকার, এতে জেলার সংশ্লিষ্ট সিভিল সার্জনরা তাদের জেলার প্রয়োজন অনুযায়ী অর্থ ব্যয় করতে পারবেন।
জাতীয় বাজেটে আলাদাভাবে পর্যাপ্ত অর্থ বরাদ্দ থাকলে কাজগুলো সুসম্পন্ন করা সম্ভব হবে। অন্যথায়, পর্যাপ্ত অর্থের অভাবে কুষ্ঠ নির্মূল কার্যক্রম বাধাগ্রস্ত হবে। তাই, জাতীয় স্বার্থেই কুষ্ঠ নির্মূলের জন্য দ্রুত পদক্ষেপ নেওয়া উচিত। কুষ্ঠজনিত কারণে যে সমস্যাগুলো তৈরি হয়েছে সেগুলো জাতীয় অগ্রগতির পথে অন্তরায়।
আমাদের জাতীয় সংবিধানে ও মানবাধিকারের সর্বজনীন ঘোষণাপত্রে সকলের সমান অধিকারের নিশ্চয়তা প্রদানের কথা বলা হয়েছে। তাই কোনো কারণেই মানবাধিকার লঙ্ঘনের ঘটনা গ্রহণযোগ্য হতে পারে না। আমরা আশাবাদী হতে পারি যে, সমাজে সচেতনতা বৃদ্ধির মাধ্যমে কুষ্ঠ সম্পর্কে ভ্রান্ত ধারণা দূর হবে, রোগীরা সর্বত্র মানসম্মত চিকিত্সা-সুবিধা পাবে এবং তাদের মানবাধিকার সুরক্ষিত হবে। আমাদের উচিত কুষ্ঠরোগে আক্রান্ত ব্যক্তিরা যেন সমাজের অন্য মানুষের সঙ্গে সমান অধিকার ও মর্যাদা নিয়ে বাস করতে পারে তার জন্য কাজ করা। তাই কুষ্ঠমুক্ত বাংলাদেশ গড়ার লক্ষ্যে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ গ্রহণ করা হবে, এটাই এখন সকলের প্রত্যাশা।
n লেখক :সাংবাদিক
