ইঞ্জিনচালিত রিকশা বন্ধে নৈবচ নৈবচ

আপডেট : ১৩ আগস্ট ২০২১, ২১:৩৩

সরকার ইঞ্জিনচালিত রিকশা-ভ্যান সারা দেশে চলাচলের ওপর নিষেধাজ্ঞা জারি করার সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেছে। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামাল জানিয়েছেন, রিকশার সামনের চাকায় ব্রেক আছে। পেছনের চাকায় ব্রেক নেই। এগুলোতে ইঞ্জিন লাগিয়ে চালানোর কারণে সড়ক দুর্ঘটনা ঘটছে। জনকল্যাণের সরকার নিশ্চয়ই বসে বসে দেখতে পারে না যে, দেশে এমন সব যানে জনগণ যাতায়াত করছে, যা প্রতিনিয়ত দুর্ঘটনা ঘটাচ্ছে এবং আরোহীরা মারা যাচ্ছে। ঢেউ খেলানো, ছাল তোলা, মাছ চাষের গর্তে ভরা আধুনিক সড়ক ব্যবস্থায় চলাচলের যোগ্যতা এসব যানের নেই। এমন সড়ক পথে চলার জন্য যে শক্তি ও সামর্থ্যের প্রয়োজন তা না থাকার কারণেই এরা দুর্ঘটনা ঘটিয়ে মানুষ মারছে। জেনে-শুনে জনকল্যাণের সরকার জনগণের মরণফাঁদ পেতে রাখতে পারে না। তবে সরকারের পক্ষ থেকে ব্যাটারিচালিত রিকশা-ভ্যান চলাচলে নিষেধাজ্ঞা নতুন কিছু নয়। অতীতে বেশ কয়েকবার সরকার উদ্যোগ গ্রহণ করেছে কিন্তু শেষ পর্যন্ত দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চল থেকে উঠে আসা আন্দোলনের কাছে নতি স্বীকার করতে দেখা গিয়েছে। তবে তাতেও রবার্ট দ্য ব্রুসদের চেষ্টা থেমে যাবে এমনটা ভাবা নিষ্প্রয়োজন।

খুব আনন্দ পাই জাতীয় বা অন্য যে কোনো নির্বাচনের সময় এসব যানের গুরুত্ব দেখে। সুলভ ও সহজলভ্য হওয়ার কারণে নির্ভরতার প্রতীক হয়ে উঠে এসব যান। সরকারের পক্ষ থেকে নিষেধাজ্ঞা বাস্তবায়নকারীরাও তখন মৃত্যু ভয় ভুলে যায়। দলে দলে তখন তারা দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলে চলেছেন, দায়িত্ব পালন করে আবার ফিরেও আসছেন।

দেশের অনক্ষর অনাহারী মানুষ বিশ্বাস করে জনকল্যাণের সরকার যে কারণে ইঞ্জিনচালিত রিকশা-ভ্যান বন্ধ করে দিতে চান তা মূল কারণ নয়। প্রকৃত কারণ তারা জনগণের সামনে প্রকাশ করতে পারছে না। আসলে দেশের শক্তিশালী পরিবহন সেক্টর চায় না এসব যান সড়ক পথে চলাচল করুক। এতে তারা ব্যাবসায়িকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়ে পড়েছে। পাঁচ-সাত মাইল দূরত্বের যাত্রীদের সঙ্গে অসৌজন্যমূলক আচরণের পরও বাধ্য হয়ে তারা পরিবহন ব্যবহার করত, কিন্তু আজ আর তা নেই। অল্প দূরত্বের যাত্রীরা পুরোপুরিভাবে পরিবহন থেকে মুখ ফিরিয়ে নেওয়ায় পরিবহন মালিকদের যে ক্ষতির সম্মুখীন হতে হচ্ছে, তা পূরণ করা সম্ভব হচ্ছে না। ক্ষমতাধর পরিবহন সেক্টরের জন্য এমন ক্ষতি মানা সম্ভব হচ্ছে না বলেই তারা সবচাইতে সোচ্চার ইঞ্জিনচালিত রিকশা-ভ্যানের প্রতি। অথচ আমাদের মর্যাদাপূর্ণ সমাজের কোনো অবদানই নেই এই যানগুলোর প্রতি? সাধারণ প্যাডেল করা রিকশাকে গতিসম্পন্ন করতে আমাদের শিক্ষিত শ্রেণির অবদান শূন্যের কোটায়! জনগণের করের টাকায় পরিচালিত প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর পরিবহন খাতে অবদান কী? সাধারণ মানুষকে আকাশ-পাতাল এক করে ফেলতে হবে অবদান খুঁজে দেখার জন্য। মিশুক ছাড়া কিছু খুঁজে পাওয়া যাবে বলে মনে হয় না। যে মিশুকে রাজধানীর মানুষ উঠতে ভয় পেত। এত অর্থ ব্যয়, এই মেধার ফলাফল যেখানে সাধারণ জনগণ খুঁজে পায় না। সেখানে গ্রামবাংলায় দাপিয়ে বেড়াচ্ছে ইঞ্জিনচালিত রিকশা-ভ্যানগুলো। দেশের হর্তা-কর্তা-বিধাতাদের খারাপ লাগাটা কী অস্বাভাবিক? এরা নিজেদের কথা বলতে পারেন না তাই অন্যের ঘাড়ে বন্দুক রেখেছে। জনকল্যাণের ব্যবসায়ী সরকারের ক্ষমতায় বলয়ের মধ্যে থাকা ব্যক্তিদের এখানে ব্যবসাটা ভালো হয়নি। স্থানীয়ভাবে মালামাল সংগ্রহ করে এসব যান তৈরি করা হয়েছে। যদি ইজিবাইকের মতো একটা ব্যবসা হতো তাহলে না হয় সহ্য করা যেত। বিদেশ থেকে লাখ লাখ ইজিবাইক আমদানি করে আনা হলো। সাধারণ মানুষ ঋণ করে, জমি বিক্রি করে ইজিবাইক কিনে যখন রাস্তায় এলো তখনই কর্তৃপক্ষের টনক নড়ে উঠল। যার যতটুকু ক্ষমতা আছে সবাই একযোগে ইজিবাইক বন্ধে সর্বশক্তি নিয়োজিত করল। এখন প্রশ্ন হলো দেশে আমদানি কি নিয়ন্ত্রণহীন? দেশ ও জনগণের প্রয়োজন এখানে বিবেচনা করা হয় না? রাস্তায় ইজিবাইক চলাচলে বাধা দেওয়া হয়েছে কিন্তু কোনো আমদানিকারকের শোরুমে কেউ উঁকি দেয়নি। আসল কথা হচ্ছে যে, কোনো কিছুতে ব্যবসা যতক্ষণ আছে ততক্ষণ আমরা আছি। এখন মাঝে মধ্যে নিষেধাজ্ঞা জারি করে তা চালু রাখার বাহানা করা হয় শুধুম ব্যবসার সুযোগ বা নতুন দ্বার খুলে দেওয়ার জন্য।

গ্রামবাংলায় একটা কথা আছে, ‘বিড়াল নরম জায়গায় পায়খানা করে’ দেশের শক্তিশারী পরিবহন সেক্টরের হাত দেওয়ার ক্ষমতা কারো আছে বলে বিশ্বাস করতে পারা যায় না। তাই ফিটনেসবিহীন বাস-ট্রাক চলাচলে থাকবে বাধাহীন। চালকের দক্ষতা দেখার কেউ নেই, ভাড়ার নিয়ন্ত্রণ নেই, পরিবহন আইনের যথাযথ বাস্তবায়ন নেই। সাধারণ জনগণের দাবির মুখে কেউ কিছু করতে গেলেই মন্ত্রী ঢাল হয়ে দাঁড়িয়ে পড়েন। বিপরীতে গ্রামবাংলার পরিবহনের জন্য কে আছে? এদের পক্ষে দাঁড়ানোর জন্য মন্ত্রী নেই, জনপ্রতিনিধি নেই, সুশীল সমাজ নেই, তাই নরম মাটি বিবেচনায় মনে চাইলেই নিষেধাজ্ঞা জারি করা যায়। জনগণের প্রতি তীব্র ভালোবাসা থেকে তাদের জীবন রক্ষার তাগিদকে গুরুত্ব দিয়ে করোনা মহামারির মধ্যেও এ ধরনের সিদ্ধান্ত দিতে সরকার বাধ্য হয়েছে। কর্মহীন হয়ে মানুষ না খেয়ে মারা গেলে ক্ষতি নেই, কিন্তু এসব যানের কারণে মারা পড়লে ক্ষমতাসীনরা এ দুঃখ কোথায় রাখবে? গ্রামবাংলার এসব যানের চালকরা সরকারকে এমন দুঃখের হাত থেকে রক্ষা করবে এ প্রত্যাশা করতে পারি।

বাংলাদেশের যে কোনো নাগরিক, গবেষণা সংস্থা সামান্য আগ্রহী হয়ে যদি ইঞ্জিনচালিত রিকশা-ভ্যানের কারণে গ্রামীণ জনগোষ্ঠীর আর্থসামাজিক উন্নয়নে ভূমিকা বিষয়ে একটা সমীক্ষা করেন তবে আশা করা যায় এসব যান গুরুত্ব পাবে। এ যানবাহনগুলো গ্রামীণ জীবন কতটা সহজ করে দিয়েছে তা সহজে বোঝা যাবে, কতটা গতি এনে দিয়েছে জানা যাবে, মালামাল পরিবহনসহ যাত্রী পরিবহন এবং অসময়ে রোগী পরিবহন করে কত জীবন রক্ষা করছে তা জানা যাবে। সুতরাং হয় ঝেড়ে কাশতে হবে, নয়তো এসব যান যাতে আরো উন্নয়ন করা যায়, সামনের চাকার ব্রেকের কারণে উলটে না যায়, গতি নিয়ন্ত্রণ করে চালানো যায় তার ব্যবস্থা করতে হবে। তবে দেশে ইঞ্জিনচালিত রিকশা-ভ্যান বন্ধ নৈবচ নৈবচ।

n লেখক :প্রাবন্ধিক, সাবেক সভাপতি, ইনস্টিটিউশন অব ডিপ্লোমা ইঞ্জিনিয়ার্স, বাংলাদেশ (আইডিইবি)